ফ্রান্সে বিক্ষোভ, অর্থনৈতিক অচলাবস্থার ঝুঁকিতে ইউরোপ?

ফ্রান্সে অভাবনীয়ভাবে ছড়িয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ দেশের ক্রমবর্ধমান আর্থিক চাপকে প্রকাশ্যে হাজির করেছে। ইউরোপের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশটি যখন তার আকাশচুম্বী বাজেট ঘাটতি কমানোর চেষ্টা করছে, তখন এই আর্থিক সংকট মোকাবিলা করা আরও কঠিন হয়ে উঠবে।

ফ্রান্সের রাষ্ট্রীয় অর্থব্যবস্থা বর্তমানে অত্যন্ত নড়বড়ে অবস্থায় রয়েছে। দেশটির পরিসংখ্যান সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, জুনে তাদের সরকারি ঋণ ৪ ট্রিলিয়ন ডলার অতিক্রম করেছে—যা পুরো অর্থনীতির আকারের চেয়েও বেশি। বন্ডের সুদের হার হঠাৎ বৃদ্ধি পাওয়ায় গত বছরের তুলনায় এই ঋণ পরিশোধের খরচ শত শত কোটি ডলার বেড়ে গেছে।

একই সাথে সরকারি তহবিলের ওপর বিভিন্ন খাত থেকে দাবি ও চাপ বাড়ছে। দেশের জনসংখ্যা বয়োবৃদ্ধ হতে থাকায় পেনশনের খরচ লাফিয়ে বেড়েছে, অন্যদিকে সরকার প্রতিরক্ষা খাতে আরও বেশি অর্থ বরাদ্দের পরিকল্পনা করছে। অন্যদিকে, হাইস্কুলের শিক্ষার্থীরা কর্মী সংকট দূর করা, গাদাগাদি ক্লাসরুমের সমস্যা সমাধান এবং ভঙ্গুর স্কুল অবকাঠামো মেরামতের জোর দাবি জানিয়েছে।

ফ্রান্সের এই আর্থিক সমস্যার সমাধান অতীতেও তীব্র সামাজিক অসন্তোষ সৃষ্টি করেছে। ২০২৩ সালে অবসরের বয়স বাড়ানোর উদ্যোগ সারা দেশে ব্যাপক প্রতিবাদ ছড়িয়ে দিয়েছিল।

গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘ক্যাপিটাল ইকোনমিক্স’-এর প্রধান ইউরোপীয় অর্থনীতিবিদ অ্যান্ড্রিউ কেনিংহাম বলেছেন, গত সপ্তাহে ফরাসি সরকার বাজেট ঘাটতি কমানোর উদ্দেশ্যে খরচ ব্যাপক ছাঁটাই এবং কর বাড়ানোর প্রস্তাব করেছিল। তবে আগামী বছরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে সামনে রেখে আইনপ্রণেতারা এসব রাজস্ব সংস্কার পদক্ষেপকে শিথিল করে ফেলতে পারেন বলে বন্ড ক্রেতা ও বিনিয়োগকারীরা উদ্বেগ প্রকাশ করছেন।

ফ্রান্সের নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ উগ্র-ডানপন্থী বা উগ্র-বামপন্থী যে কোনো উত্তরসূরির কাছে ক্ষমতা হারাতে পারেন, যা দেশের রাজস্ব শৃঙ্খলা বজায় রাখার প্রতিশ্রুতির ওপর বড় প্রশ্নচিহ্ন এঁকে দিচ্ছে। কেনিংহাম উল্লেখ করেন, মেরি লি পেনের ডানপন্থী দল সম্প্রতি সরকারি অর্থব্যবস্থায় স্থিতিশীলতা আনতে বড় ধরনের খরচ ছাঁটাইয়ের প্রস্তাব করলেও, তাদের দলটি এখনও চড়া খরচের কর ছাড়ের প্রতিই জোর দিয়ে যাচ্ছে।

বন্ড সুদের হারে মারাত্মক ধস

ফ্রান্সে সম্ভাব্য ঋণ সংকট নিয়ে তৈরি হওয়া আশঙ্কা গত সপ্তাহে চূড়ান্ত রূপ ধারণ করে, যার ফলে ফরাসি বন্ড বাজারে ঢালাও বিক্রির ধস নামে এবং সুদের হার হু হু করে বাড়তে থাকে। ফরাসি ও জার্মান বন্ডের সুদের হারের ব্যবধান বেড়ে ২০১২ সালের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। ইয়েল্ড বা সুদের এই বিশাল ব্যবধানের মানে হলো—নিরাপদ বিকল্প হিসেবে বিবেচিত জার্মানির তুলনায় ফ্রান্সের ঋণ গ্রহণ করার জন্য বিনিয়োগকারীরা এখন অনেক বেশি রিটার্ন বা ক্ষতিপূরণ দাবি করছেন।

ফরাসি বন্ডের এই মন্দা ইউরোপের অন্যান্য উচ্চ-সুদের বন্ড বাজারগুলোতেও ছড়িয়ে পড়ার ভয় তৈরি করেছে। কিছু বিশ্লেষক একে ২০১০-এর দশকের শুরুর দিকে ইউরোপীয় ঋণ সংকটের সাথে তুলনা করছেন।

পরামর্শক প্রতিষ্ঠান অক্সফোর্ড ইকোনমিক্স-এর প্রধান ইউরোপীয় অর্থনীতিবিদ অ্যাঞ্জেল তালাভেরা সিএনএন-কে বলেন, ফ্রান্সের অর্থনীতির আকার এবং এর কাঠামোগত গুরুত্বের কারণে অন্যান্য দেশ তথা পুরো ইউরোজোনে এই সংকট ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি এবং তা সম্ভাব্যভাবে পুরো অঞ্চলের জন্য এক মারাত্মক সংকট তৈরি করতে পারে।

এসব উদ্বেগের ফলশ্রুতিতেই সোমবার ডলারের বিপরীতে ইউরোর মান কমে ২০২৫ সালের মে মাসের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২১টি দেশের ব্যবহৃত এই যৌথ মুদ্রাটির মান সাময়িকভাবে ১.১২ ডলারের নিচে নেমে যাওয়ার পর বর্তমানে ওই সীমার কাছাকাছি অবস্থান করছে।

ফ্রান্সের গণ্ডি ছাড়িয়ে যাওয়ার ঝুঁকি

বাজারের সাম্প্রতিক এই চরম অস্থিরতা ইউরোপের ভঙ্গুর অর্থনৈতিক পুনরুত্থানকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। এই অর্থনৈতিক উত্থান কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় বিনিয়োগ, ইউরোপীয় রপ্তানির ক্রমবর্ধমান চাহিদা এবং জার্মানিতে বর্ধিত প্রতিরক্ষা খরচের ওপর ভর করে গতি পাচ্ছিল।

সাম্প্রতিক এক জরিপ অনুযায়ী, গত মাসে ইউরো অঞ্চলে ম্যানুফ্যাকচারিং এবং সেবা খাতের গতিশীলতা বিগত সাড়ে তিন বছরের মধ্যে দ্রুততম হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। সেপ্টেম্বরের শেষের দিকে এক নোটে মার্গান স্ট্যানলির অর্থনীতিবিদরা লিখেছিলেন, ‘অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ঘুরে দাঁড়াচ্ছে এবং ইউরোপ আশ্চর্যজনকভাবে শক্ত প্রতিরোধ ক্ষমতা দেখিয়েছে।’

তবে উচ্চ বন্ড সুদের হার সেই প্রবৃদ্ধির জন্য স্পষ্ট এক হুমকি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

ওলন্দাজ ব্যাংক আইএনজি-র ম্যাক্রোইকোনমিক্স প্রধান কারস্টেন ব্রজেস্কি সিএনএন-কে বলেছেন, সরকারগুলো যদি খরচ না কমায়, তবে সুদের হার বাড়তেই থাকবে। চড়া বন্ড সুদের হার পুরো অর্থনীতিতে ঋণ নেওয়ার খরচ বাড়িয়ে দেয়, যার ফলে বাড়িঘর ও গাড়ি কেনা আরও ব্যয়বহুল হয়ে পড়ে এবং সামগ্রিক বিনিয়োগ কমে যায়। এতে সরকারগুলোর জন্যও ঋণ নেওয়া ব্যয়বহুল হয় এবং সুদের হার আরও বৃদ্ধি পাওয়া ঠেকাতে সরকার নির্দিষ্ট মাত্রায় কৃচ্ছ্রসাধন গ্রহণে বাধ্য হয়।

সরকারি ঋণের স্থায়িত্ব নিয়ে উদ্বেগ বাড়ায় সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ফ্রান্স, জার্মানি এবং যুক্তরাজ্যের সরকারি বন্ডের সুদের হার বিগত কয়েক বছরের সব রেকর্ড ভেঙেছে।

ক্যাপিটাল ইকোনমিক্সের ডেপুটি চিফ ইউরোজোন বিষয়ক অর্থনীতিবিদ জ্যাক অ্যালেন-রেনল্ডস সিএনএন-কে সতর্ক করে বলেছেন, ইউরোপের সরকারি অর্থব্যবস্থা ইউরোজোনের আর্থিক বাজার এবং সার্বিক অর্থনীতির জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *