স্মার্টফোনের স্ক্রিনে দ্রুত আঙুল নাড়ছেন এক তরুণ। চোখেমুখে চরম উত্তেজনা। পাশে বসা আরও কয়েকজন উৎসুক দৃষ্টিতে তাকিয়ে। জিতলেই উল্লাস, হারলেই কপালে চিন্তার ভাঁজ। এটি কোনো ভিডিও গেমের দৃশ্য নয়, বরং যশোরের কেশবপুর উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলের চায়ের দোকান থেকে শুরু করে হাট-বাজারের নিত্যদিনের চিত্র। প্রযুক্তির অপব্যবহার আর দ্রুত বড়লোক হওয়ার মোহকে পুঁজি করে কেশবপুরে মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়েছে অনলাইন জুয়া। আর এই মরণনেশার খপ্পরে পড়ে একের পর এক পরিবার হচ্ছে নিঃস্ব, বাড়ছে সামাজিক অপরাধ, এমনকি ঘটছে আত্মহত্যার মতো মর্মান্তিক ঘটনাও।
একসময় জুয়ার আসর বসত নির্দিষ্ট কোনো নির্জন স্থানে বা মেলায়। কিন্তু ডিজিটাল যুগের হাওয়া লেগেছে এই অন্ধকার জগতেও। এখন জুয়া চলে হাতে থাকা স্মার্টফোনে। ইন্টারনেট ও স্মার্টফোনের সহজলভ্যতাকে কাজে লাগিয়ে ওয়ানএক্সবেট, বাজি, স্টেক, বেট ৩৬৫-এর মতো শত শত আন্তর্জাতিক বেটিং অ্যাপ ও সাইট ছড়িয়ে পড়েছে গ্রামেগঞ্জে। বিকাশ, রকেট বা নগদের মতো মোবাইল ব্যাংকিং সেবার মাধ্যমে সহজেই টাকা আদান-প্রদান করা যাচ্ছে, যার ফলে প্রশাসন বা অভিভাবকদের চোখ ফাঁকি দিয়ে সহজেই এই চক্রে জড়িয়ে পড়ছে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী ও বেকার যুবকেরা।
অনলাইন জুয়া যে শুধু আর্থিক ক্ষতিই করছে না, বরং মানুষের প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে তার জ্বলন্ত প্রমাণ উপজেলার গৌরীঘোনা ইউনিয়নের কাশীমপুর গ্রাম। এই গ্রামের মতলেব গাজীর ৩৮ বছর বয়সী ছেলে মিজানুর রহমান সম্প্রতি অনলাইন জুয়ার নীল দংশনের শিকার হয়েছেন। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দ্রুত লাভের আশায় জুয়ার সাইটে টাকা খাটাতেন মিজানুর। একপর্যায়ে সব হারিয়ে এবং ঋণের জালে জর্জরিত হয়ে তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। উপায়ান্তর না দেখে শেষ পর্যন্ত কীটনাশক পান করে আত্মহত্যার পথ বেছে নেন তিনি।
মিজানুরের এই করুণ মৃত্যু পুরো এলাকায় এক থমথমে পরিবেশ ও তীব্র আতঙ্কের সৃষ্টি করেছে। কাশীমপুর গ্রামের কৃষক মুনসুর আলী আক্ষেপ করে বলেন, ‘অনলাইন জুয়ার কারণে অনেক পরিবার নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে। মানুষ দ্রুত লাভের আশায় টাকা বিনিয়োগ করে শেষ পর্যন্ত সব হারাচ্ছে। মিজানুরের ঘটনাটি আমাদের সমাজের জন্য একটা বড় সতর্কবার্তা। এখনই এটা না থামালে আরও বহু মায়ের কোল খালি হবে।’
অনুসন্ধানে জানা যায়, এই জুয়া ছড়িয়ে পড়ার পেছনে কাজ করছে এক ধরনের ‘চেইন রিঅ্যাকশন’ বা নেটওয়ার্কিং। উপজেলার গড়ভাঙ্গা বাজারের একজন ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে আসল রহস্যটি ফাঁস করেন। তিনি জানান, বাজারে বসে প্রকাশ্যে বা গোপনে অনেকেই মোবাইলে জুয়া খেলে। এদের মধ্যে কেউ হঠাৎ সামান্য কিছু টাকা জিতলে, সেটার স্ক্রিনশট বা গল্প অন্যদের দেখায়। এই সাময়িক লাভ দেখে প্রলুব্ধ হয়ে পাশে থাকা আরও পাঁচজন নতুন করে এই নেশায় টাকা ঢালতে শুরু করে। এভাবেই একজন থেকে অন্যজনে ক্যানসারের মতো ছড়াচ্ছে এই আসক্তি।
অনলাইন জুয়ার এই ভয়াল থাবায় ভেঙে পড়ছে গ্রামীণ অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাঠামো। চুরি, ছিনতাই এবং পারিবারিক কলহ আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।
কেশবপুর উপজেলার নাগরিক সমাজের সভাপতি অ্যাডভোকেট আবু বক্কর সিদ্দিকী তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, ‘গ্রামাঞ্চলে অনলাইন জুয়া ও মাদকের সঙ্গে যুবসমাজ যেভাবে জড়িয়ে পড়ছে, তাতে আমাদের সামাজিক ভারসাম্য পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এর ফলে যেমন আর্থিক ও মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে একেকটি পরিবার, তেমনি ধংসের মুখে পতিত হচ্ছে দেশের ভবিষ্যৎ যুবসমাজ। একে রুখতে শুধু আইন নয়, সামাজিক আন্দোলনের প্রয়োজন।’
অনলাইন জুয়ার এই বিস্তার রোধ করা প্রশাসনের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ, কারণ এর কোনো নির্দিষ্ট দৃশ্যমান আস্তানা নেই। তবে বিষয়টি নিয়ে কঠোর অবস্থানে যাওয়ার কথা জানিয়েছে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন।
কেশবপুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) রোকসানা খাতুন এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘অনলাইন জুয়া আইনত একটি দণ্ডনীয় অপরাধ। আমরা প্রযুক্তির এই অপব্যবহার রোধে অত্যন্ত তৎপর। ইতোমধ্যেই উপজেলার বিভিন্ন হাট-বাজার, চায়ের দোকান ও ফাঁকা মাঠগুলোতে পুলিশের নিয়মিত নজরদারি ও টহল জোরদার করা হয়েছে।’
রোকসানা খাতুন আরও বলেন, ‘যেহেতু এটি গোপনে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে হয়, তাই সাধারণ মানুষের সচেতনতা ও সহযোগিতা আমাদের খুব প্রয়োজন। কোথাও অনলাইন জুয়ার সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া গেলে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আমরা সাধারণ নাগরিকদের অনুরোধ করব, এই চক্রের সন্ধান পেলেই পুলিশকে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করুন।’
কেশবপুরের সচেতন নাগরিকরা জানান, কেবল পুলিশি অভিযান দিয়ে এই ব্যাধি নির্মূল করা সম্ভব নয়। এজন্য প্রয়োজন সন্তান মোবাইলে কী করছে এবং তার টাকার উৎস বা খরচ কোথায় হচ্ছে, সে বিষয়ে অভিভাবকদের কঠোর নজরদারি। জুয়ার সাইটগুলোতে লেনদেনের জন্য ব্যবহৃত মোবাইল ব্যাংকিং নম্বরগুলো চিহ্নিত করে দ্রুত ব্লক করা। তরুণদের খেলাধুলা ও সুস্থ সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে ফিরিয়ে আনা।
কেশবপুরকে জুয়ামুক্ত করতে না পারলে মিজানুরের মতো আরও অনেক প্রাণ অকালে ঝরে যাবে এমনটাই আশঙ্কা করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। প্রশাসনের কঠোর পদক্ষেপের পাশাপাশি এখন প্রয়োজন একটি সমন্বিত সামাজিক প্রতিরোধ।