ব্যঙ্গধর্মী সিনেমা ‘দ্যা ইউনিভার্সিটি অফ চানখাঁরপুল’ দিয়ে বড় পর্দায় অভিষেক হয়েছে অভিনেতা দেবদ্যুতি আইচের। সিনেমাটিতে তিনি অভিনয় করেছেন ‘হর্সম্যান’ চরিত্রে। আকাশ হকের পরিচালনায় নির্মিত এ সিনেমা লেখক রনো আনোয়ারের ছোটগল্প ‘ঝরা পাতার দুঃখ বিলাস’ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে নির্মিত। গত ১২ই জুন মুক্তি পেয়েছে সিনেমাটি। প্রথম সিনেমা, রাজনৈতিক ব্যঙ্গ, চরিত্র প্রস্তুতি ও অভিনয়ের দর্শন নিয়ে এনটিভি অনলাইনের এর সঙ্গে কথা বলেছেন দেবদ্যুতি আইচ।
অভিনয়ের স্বপ্ন থেকে প্রথম সিনেমা—পথচলাটা কেমন ছিল?
দেবদ্যুতি আইচ: আমার বাড়ি ময়মনসিংহে। নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় থেকেই অভিনেতা হওয়ার স্বপ্ন দেখি। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের থিয়েটার দলে যুক্ত হই। সেখান থেকেই অভিনয়ের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শুরু। পরে থিয়েটার বিষয়ে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করি। প্রায় সাত বছর থিয়েটারে কাজ করেছি। পাশাপাশি বাংলাদেশ ও কলকাতার বিভিন্ন স্বল্পদৈর্ঘ্য সিনেমায় অভিনয় করেছি। প্রায় ১৭ বছরের অপেক্ষা, প্রস্তুতি আর পরিশ্রমের পর ‘দ্যা ইউনিভার্সিটি অফ চানখাঁরপুল’ আমার প্রথম কেন্দ্রীয় চরিত্রের সিনেমা।
অভিনেতা হিসেবে আপনাকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করেছেন কারা?
দেবদ্যুতি আইচ: প্রথম অনুপ্রেরণা শাহরুখ খান। এরপর রাজকুমার রাও, ইরফান খান, ক্রিশ্চিয়ান বেল, হিথ লেজার, লিওনার্দো ডি ক্যাপ্রিও, মনোজ বাজপেয়ী, অনির্বাণ ভট্টাচার্যসহ অনেক অভিনেতার কাজ আমাকে প্রভাবিত করেছে।
প্রথম সিনেমা মুক্তির পর এখন কী অনুভূতি কাজ করছে?
দেবদ্যুতি আইচ: ভেবেছিলাম খুব উত্তেজিত থাকব। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে যেন হিমালয়ের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। ভেতরে এক ধরনের গভীর, শান্ত এবং একই সঙ্গে ভয়ংকর সুন্দর অনুভূতি কাজ করছে। এখন অপেক্ষা দর্শকের প্রতিক্রিয়ার।
‘হর্সম্যান’কে এক বাক্যে কীভাবে পরিচয় করাবেন?
দেবদ্যুতি আইচ: হর্সম্যান খুব সাধারণ একজন তরুণ, যে পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখে। সে বিশ্বাস করে, ভালো কিছু করতে হলে ক্ষমতার কাছাকাছি যেতে হবে। কিন্তু গল্প যত এগোয়, দর্শক বুঝতে পারবেন চরিত্রটি আসলে কতটা জটিল।
চরিত্রটিকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে কতটা গবেষণা করতে হয়েছে?
দেবদ্যুতি আইচ: স্ক্রিপ্ট পড়ার পর বাস্তব অভিজ্ঞতা নেওয়ার চেষ্টা করেছি। প্রায় দুই মাস ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় সময় কাটিয়েছি। সহশিল্পীদের সঙ্গে হলে থেকেছি, ছাত্ররাজনীতির নানা অভিজ্ঞতা শুনেছি। গণরুম, গেস্টরুম সংস্কৃতি কাছ থেকে দেখেছি। ধীরে ধীরে নিজেকে একজন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রের জীবনের সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছি। এই প্রস্তুতিই চরিত্রটিকে বুঝতে সবচেয়ে বেশি সাহায্য করেছে।
শুটিংয়ের সবচেয়ে কঠিন অভিজ্ঞতা কোনটি ছিল?
দেবদ্যুতি আইচ: কোনো নির্দিষ্ট দৃশ্য নয়। সবচেয়ে কঠিন ছিল অনিশ্চয়তা। পরিচালক অনেক সময় পুরো পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করতেন না। ফলে চরিত্রটি সেই মুহূর্তে কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে, সেটি নিজেকেই খুঁজে বের করতে হয়েছে। একজন অভিনেতা হিসেবে এটিই ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
হর্সম্যানের সঙ্গে নিজের কোনো মিল খুঁজে পেয়েছেন?
দেবদ্যুতি আইচ: অবশ্যই। আমি যেমন অভিনয়ের স্বপ্ন পূরণ করতে অনেক লড়াই করেছি, হর্সম্যানও নিজের স্বপ্নের জন্য লড়াই করেছে। এই জায়গায় আমাদের মিল আছে। পরে চরিত্রটির সঙ্গে আরও কিছু মিল আবিষ্কার করেছি। তবে সবটা এখনই বলতে চাই না। এটুকু বলতে পারি, হর্সম্যান আর আমার—দুজনেরই এখন একটি করে সাদা ঘোড়া আছে।
এমন রাজনৈতিক ব্যঙ্গধর্মী সিনেমায় অভিনয়ের সিদ্ধান্ত নিতে ভয় কাজ করেছিল?
দেবদ্যুতি আইচ: সত্যি বলতে, প্রথমে ভয় পেয়েছিলাম। স্ক্রিপ্ট পড়ে মনে হয়েছিল এটি খুব সাহসী একটি সিনেমা। যখন জানলাম আমাকে কেন্দ্রীয় চরিত্রের জন্য ভাবা হচ্ছে, তখন এক মুহূর্তের জন্য মনে হয়েছিল—প্রথম সিনেমা করেই না আবার জেলে যেতে হয়! কিন্তু যে কাজ করতে আমি ভয় পাই সেই কাজ আমি আরও আগ্রহ নিয়ে করি।
আপনার দৃষ্টিতে এই সিনেমা কতটা বাস্তব?
দেবদ্যুতি আইচ: চরিত্র নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে এবং পরিচালকের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে যেটুকু বুঝেছি, সিনেমার অনেক ঘটনাই বাস্তব অনুভূতি থেকে অনুপ্রাণিত। দর্শক সিনেমাটি দেখলে বিষয়টি আরও ভালোভাবে উপলব্ধি করতে পারবেন।
হর্সম্যান—ব্যবস্থার শিকার, নাকি সেই ব্যবস্থারই অংশ?
দেবদ্যুতি আইচ: এই প্রশ্নের উত্তর আমি দিতে চাই না। দর্শক পুরো সিনেমা দেখার পর নিজেরাই সিদ্ধান্ত নেবেন। এটাই সিনেমার সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য।
এই সিনেমায় সুযোগ পাওয়ার গল্পটা কেমন?
দেবদ্যুতি আইচ: ফেসবুকে একটি অডিশনের পোস্ট দেখে কাস্টিং কোঅর্ডিনেটরের সঙ্গে যোগাযোগ করি। পোর্টফোলিও পাঠানোর পর তারা আমাকে স্ক্রিপ্ট পড়ে মতামত জানাতে বলেন। এরপর অডিশনের জন্য ডাকেন। অডিশন দেওয়ার পরই আমি নির্বাচিত হই।
প্রথমবার নিজেকে বড় পর্দায় দেখে কী মনে হয়েছিল?
দেবদ্যুতি আইচ: আমি নিজেকে অভিনেতা হিসেবে নয়, দর্শক হিসেবেই দেখি। পর্দায় অভিনয়টা ঠিক হয়েছে কি না, দৃশ্যের আবেগ পৌঁছাচ্ছে কি না—এসবই আগে ভাবি। তবে যখন মনে হয় আমার কাজ একটি সিনেমা হিসেবে প্রেক্ষাগৃহে চলছে, তখন অন্যরকম ভালো লাগে।
অভিনেতা আপনার কাছে কী?
দেবদ্যুতি আইচ: আমার কাছে একজন অভিনেতা শুধু বিনোদন দেন না। তিনি একজন পর্যবেক্ষক, গবেষক, দার্শনিক এবং মনস্তত্ত্বের অনুসন্ধানীও। তাই মানুষ, সমাজ, দর্শন ও মনোবিজ্ঞান নিয়ে নিয়মিত পড়াশোনা করা জরুরি বলে আমি মনে করি।