১৯৬৬ সালের সেই সোনালি বিকেল, ঘরের মাঠ ওয়েম্বলিতে ববি চার্লটন-ববি মুরদের বিশ্বজয়ের মহাকাব্য রচনা—ইংল্যান্ড ফুটবলের প্রাপ্তির খাতাটি ঠিক ওখানেই থমকে আছে। এরপর কেটে গেছে দীর্ঘ ৬০টি বছর, পেরিয়েছে প্রজন্মের পর প্রজন্ম, কিন্তু কাঙ্ক্ষিত সেই সোনালি ট্রফি আর জাদুকরী ‘ফুটবল কামিং হোম’ স্লোগানকে বাস্তবে রূপ দিতে পারেনি থ্রি লায়ন্সরা।
কাতার বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ফ্রান্সের কাছে সেই হৃদয়ভাঙা বিদায়ের পর, ইউরোপের এই পরাশক্তি দলটি এবার বুক ভরা আশা নিয়ে পা রাখছে উত্তর আমেরিকার বিশ্বমঞ্চে। মহাদেশীয় মঞ্চে টানা দুটি ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে রানার্স-আপ হয়ে ট্রফির খুব কাছ থেকে ফিরে আসার যে যন্ত্রণা, এবার আমেরিকার সবুজ গালিচায় হ্যারি কেইন-জুড বেলিংহামরা নামবেন সেই আক্ষেপ ধুয়েমুছে চিরতরে অমর হয়ে যেতে।
ডাগআউটে জার্মান চ্যান্সেলর টমাস টুখেল
গ্যারেথ সাউথগেটের বিদায়ের পর ইংল্যান্ড ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (এফএ) দলের হাল তুলে দিয়েছে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা জার্মান স্ট্র্যাটেজিস্ট টমাস টুখেলের হাতে। থ্রি লায়ন্সদের ইতিহাসে মাত্র তৃতীয় বিদেশি ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব নিয়েই টুখেল বুঝিয়ে দিয়েছেন তিনি কেন স্পেশাল।
চেলসিকে চ্যাম্পিয়ন্স লীগ জেতানো কিংবা পিএসজি ও বায়ার্ন মিউনিখকে ঘরোয়া শিরোপা এনে দেওয়া এই খুরধার মস্তিস্কের কোচই এখন ইংলিশ ভক্তদের স্বপ্নপূরণের মূল কাণ্ডারি।
বাছাইপর্বে অপ্রতিরোধ্য ইংল্যান্ড
উয়েফা অঞ্চলের বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে সার্বিয়া, আলবেনিয়া ও লাটভিয়ার গ্রুপে প্রতিপক্ষকে নিয়ে রীতিমতো ছেলেখেলা করেছে ইংল্যান্ড। একটি গোলও হজম না করে প্রথম ছয় ম্যাচের সবকটিতে জয় এবং শেষ ম্যাচে লাটভিয়াকে ৫-০ গোলে বিধ্বস্ত করে ইউরোপের প্রথম দল হিসেবে বিশ্বকাপের টিকিট নিশ্চিত করেছে টুখেলের শিষ্যরা।
২০২৬ বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের ম্যাচ সূচি
গ্রুপ পর্বে ইউরোপ ও আফ্রিকার গতিশীল ফুটবলের মুখোমুখি হতে হবে ইংল্যান্ডকে। ১৭ জুন ডালাস স্টেডিয়ামে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে বিশ্বকাপ অভিযান শুরু করবে ইংল্যান্ড। ২৩ জুন বোস্টন স্টেডিয়ামে তাদের প্রতিপক্ষ আফ্রিকার দেশ ঘানা। ২৭ জুন নিউ ইয়র্কের নিউ জার্সি স্টেডিয়ামে পানামার বিপক্ষে গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচ খেলবে ইংলিশরা।
পজিশনভিত্তিক স্কোয়াডের গভীরতা
বাছাইপর্বে শতভাগ জয়ের রেকর্ড ধরে রাখা দলটির ওপরই আস্থা রেখেছেন টমাস টুখেল। সঙ্গে যোগ করেছেন কিছু বিকল্প শক্তি। বিশ্বমঞ্চে এভারটনের অভিজ্ঞ গোলরক্ষক জর্ডান পিকফোর্ডই থাকবেন পোস্টের নিচে প্রথম ভরসা হিসেবে। বিগত বড় টুর্নামেন্টগুলোতে ইংল্যান্ডের ত্রাতা হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করেছেন তিনি।
ম্যানচেস্টার সিটির অভিজ্ঞ ডিফেন্ডার জন স্টোন্স এবং মার্ক গুয়েহির সেন্ট্রাল ডিফেন্স জুটি টুখেলের রক্ষণভাগের মূল স্তম্ভ। চোট কাটিয়ে রিস জেমসের ফেরা রাইট-ব্যাক পজিশনে বাড়তি শক্তি জোগাবে।
রিয়াল মাদ্রিদের পোস্টার বয় জুড বেলিংহাম এবং আর্সেনালের ডেকলান রাইসের মাঝমাঠ জুটি বর্তমান বিশ্বের অন্যতম সেরা। আক্রমণভাগে অধিনায়ক হ্যারি কেইনের গোল করার দক্ষতার সঙ্গে উইংয়ে বুকায়ো সাকা ও মার্কাস র্যাশফোর্ডের গতি প্রতিপক্ষের রক্ষণ চূর্ণ করতে প্রস্তুত। ব্যাক-আপ স্ট্রাইকার হিসেবে কেইনের ছায়া হয়ে আছেন টোনি ও ওয়াটকিন্স।
স্কোয়াডের শক্তি ও দুর্বলতা
বাছাইপর্বের প্রথম ৬ ম্যাচে একটি গোলও না খাওয়ার রেকর্ড প্রমাণ করে টুখেল ইংলিশ ডিফেন্সকে কতটা নিরেট করে তুলেছেন। এর সঙ্গে বায়ার্ন মিউনিখে কেইনের গোলবন্যা এবং রিয়ালে বেলিংহামের মাঝমাঠ নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা দলের সবচেয়ে বড় শক্তির জায়গা। এছাড়াও ২০১৮ বিশ্বকাপে কলম্বিয়াকে টাইব্রেকারে হারানোর পর থেকে নকআউট পর্বের পেনাল্টি শুটআউট নিয়ে ইংলিশদের মানসিক ভয় অনেকটাই কেটে গেছে। গোলবারের নিচে পিকফোর্ডের জুড়ি মেলা ভার।
সাম্প্রতিক সময়ে দুটি ইউরোর ফাইনাল এবং কাতার বিশ্বকাপে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে পেনাল্টি মিস করার মতো মানসিক চাপ সামলাতে না পারার অতীত ইতিহাস এখনো বড় ভয়ের কারণ। অন্যদিকে, ক্লাব ফুটবলে টুখেল সফল হলেও, জাতীয় দলের হয়ে একটি মেগা টুর্নামেন্টে নকআউট পর্বের কৌশল সাজানোর পরীক্ষায় তিনি কতটা সফল হন, তা দেখার বিষয়।
ইতিহাস ও ঐতিহ্যের রেকর্ড বুক
১৯৬৬ সালের ফাইনালে পশ্চিম জার্মানির বিপক্ষে জিওফ হার্স্টের সেই বিখ্যাত ও বিতর্কিত ‘লাইন ড্রপ’ গোল এবং বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথম ফাইনালে হ্যাটট্রিক করার গৌরব আজও ইংল্যান্ড ফুটবলের সবচেয়ে বড় রূপকথা।
স্মরণীয় যত রেকর্ড
সর্বোচ্চ গোলদাতা : ১৯৮৬ ও ১৯৯০ বিশ্বকাপ মিলিয়ে মোট ১০টি গোল করে ইংল্যান্ডের হয়ে বিশ্বকাপে সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা গ্যারি লিনেকার। বর্তমান অধিনায়ক হ্যারি কেইন ৮টি গোল নিয়ে লিনেকারের চেয়ে মাত্র ২ গোল পিছিয়ে আছেন। এবারের আসরে লিনেকারকে ছাড়িয়ে যাওয়ার সুবর্ণ সুযোগ রয়েছে কেইনের সামনে।
লৌহমানব পিটার শিলটন : দেশের হয়ে রেকর্ড ১২৫ ম্যাচ খেলা গোলরক্ষক পিটার শিলটন ৩২ বছর বয়সে প্রথম বিশ্বকাপ খেললেও ৩টি আসর মিলিয়ে দেশের পক্ষে সর্বোচ্চ ১৭টি ম্যাচ খেলার রেকর্ডের মালিক তিনি।
সবচেয়ে বড় জয় : ২০১৮ সালে রাশিয়া বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্বে পানামাকে ৬-১ ব্যবধানে উড়িয়ে দিয়েছিল ইংল্যান্ড। প্রথমার্ধেই ৫ গোল দেওয়ার সেই ম্যাচটিই আজ পর্যন্ত বিশ্বমঞ্চে থ্রি লায়ন্সদের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় জয়।
২০২৬ বিশ্বকাপে লক্ষ্য
টমাস টুখেলের ক্ষুরধার ট্যাকটিক্স আর হ্যারি কেইনের বুটের ধার— এই দুইয়ের মেলবন্ধনে ইংল্যান্ড এবার ট্রফি জয়ের অন্যতম হট ফেভারিট। ৬০ বছরের দীর্ঘ খরা কাটিয়ে উত্তর আমেরিকার মাটিতে শিরোপা পুনরুদ্ধারের লক্ষ্য ইংলিশদের।
ইংল্যান্ডের বিশ্বকাপ স্কোয়াড
গোলকিপার : জর্ডান পিকফোর্ড, ডিন হেন্ডারসন এবং জেমস ট্রাফোর্ড।
ডিফেন্ডার : রিস জেমস, টিনো লিভরামেন্টো, মার্ক গুয়েহি, এজরি কনসা, জন স্টোন্স, জ্যারেল কোয়ানসাহ, নিকো ও’রাইলি, ড্যান বার্ন এবং দজেড স্পেন্স।
মিডফিল্ডার : ডেকলান রাইস, এলিয়ট অ্যান্ডারসন, জুড বেলিংহাম, জর্ডান হেন্ডারসন, মরগান রজার্স, কোবি মাইনো এবং এবারিচি এজে।
ফরোয়ার্ড : হ্যারি কেন, ইভান টোনি, অলি ওয়াটকিন্স, বুকায়ো সাকা, ননি মাদুয়েকে, মার্কাস রাশফোর্ড এবং অ্যান্থনি গর্ডন।