একসময় খাবারের অনিশ্চয়তা নিয়েই দিন কেটেছে তার! তিন বেলা ঠিকঠাক মতো খেতেও পারতেন না! তবে সীমিত সেই জীবনেও স্বপ্ন ছিল অসীম! তাইতো লক্ষ্য অটুট রেখে হাল ছাড়েননি কখনো! লড়ে গেছেন, প্রতিটা মুহূর্ত। তার পথ ধরেই তো আজ সেই ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো বিশ্বের সবচেয়ে পরিচিত ক্রীড়া ব্যক্তিত্বদের একজন। ছোটবেলায় পরিবারের আর্থিক সীমাবদ্ধতা, সংগ্রাম আর অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাওয়া এই ফুটবলার নিজের ইচ্ছাশক্তি, কঠোর পরিশ্রম এবং দূরদর্শিতার মাধ্যমে এমন এক অবস্থানে পৌঁছেছেন, যেখানে তিনি শুধু একজন ফুটবলার নন-একটি বৈশ্বিক ব্র্যান্ড। বিশাল বাণিজ্যিক সাম্রাজ্যের মালিক!
শৈশবে পর্তুগালের মাদেইরা দ্বীপে বেড়ে ওঠার সময় রোনালদো কখনো কখনো ম্যাকডোনাল্ডসের বাইরে অপেক্ষা করতেন, যাতে অবশিষ্ট বার্গার পাওয়া যায়। সেই ছেলেটিই পরবর্তী সময়ে বিলিয়ন ডলারের ক্যারিয়ার গড়ে এখন বনে গেলেন বিশ্বের অন্যতম ধনী খেলোয়াড়।
তার এই উত্থানের পেছনে ছিল কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত, যা তাকে সাধারণ প্রতিভাবান খেলোয়াড় থেকে কিংবদন্তিতে পরিণত করেছে।
রোনালদোর শুরুটা ছিল একেবারেই সাধারণ। মাদেইরার একটি শ্রমজীবী পরিবারে জন্ম নেওয়া রোনালদোর বাবা ছিলেন একজন বাগানকর্মী এবং স্থানীয় ফুটবল ক্লাবের কিট ম্যানেজার। পারিবারিক জীবন খুব সহজ ছিল না; বাবার অ্যালকোহলের সমস্যাও ছিল। কিন্তু রোনালদো নিজের অতীতকে কখনো শুধু কষ্টের গল্প হিসেবে দেখেননি, ‘এটাই ছিল আমাদের জানা জীবন, আর আমরা সুখী ছিলাম।’
কিন্তু এই অভিজ্ঞতাগুলো তাকে ভেঙে দেয়নি। বরং এগুলো তার ভেতরে তৈরি করেছিল জেতার ক্ষুধা। রোনালদো তার শৈশবকে শুধুই কষ্টের সময় হিসেবে দেখেননি। তার কাছে সেটি ছিল জীবনের স্বাভাবিক অংশ, যেখানে কম সুযোগের মধ্যেও আনন্দ খুঁজে নিতে শিখেছিলেন। অভাবকে তিনি দুর্বলতা না বানিয়ে শক্তিতে পরিণত করেছিলেন।
ছোট বয়সেই তিনি বুঝেছিলেন, ফুটবলই তার পথ। স্কুলের চেয়ে মাঠকেই বেশি গুরুত্ব দিতে শুরু করেন। মাত্র ১৪ বছর বয়সে একটি ঘটনার পর তিনি পড়াশোনা ছেড়ে পুরোপুরি ফুটবলে মনোযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এরপর ১৫ বছর বয়সে তার হৃদযন্ত্রের সমস্যা ধরা পড়ে। অস্ত্রোপচারের পরও তিনি থেমে থাকেননি; কয়েক দিনের মধ্যেই আবার অনুশীলনে ফিরে আসেন।
রোনালদোর সাফল্যের সবচেয়ে বড় রহস্য ছিল তার কাজের প্রতি অস্বাভাবিক মনোযোগ। প্রতিভা তাকে সুযোগ এনে দিয়েছিল, অনুশীলনে সবার আগে উপস্থিত হওয়া, সবার শেষে মাঠ ছাড়ার অভ্যাস তাকে সেরাদের কাতারে নিয়ে গেছে। নিজের শরীরকে নিয়ন্ত্রণে রাখা, ফিটনেস ধরে রাখা, প্রতিদিন নিজেকে আগের দিনের চেয়ে উন্নত করার চেষ্টা-এসব অভ্যাসই তাকে দীর্ঘ সময় শীর্ষ পর্যায়ে খেলতে সাহায্য করেছে।
এর ফলও এসেছে ইতিহাসে। পাঁচবার ব্যালন ডি’অর জয়, পাঁচটি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ শিরোপা, অসংখ্য গোল এবং ভেঙে দেওয়া একের পর এক রেকর্ড তাকে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা খেলোয়াড়ের মর্যাদা দিয়েছে।
তবে রোনালদোর গল্প শুধু মাঠের সাফল্যের গল্প নয়। তিনি বুঝেছিলেন, জনপ্রিয়তাকে কীভাবে সম্পদে পরিণত করতে হয়। দুই জায়ান্ট ক্লাব ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড এবং রিয়াল মাদ্রিদে খেলার সময় বিশ্বের সবচেয়ে দামী ক্রীড়া তারকাদের একজন হয়ে ওঠেন তিনি। এরপর আসে বৈশ্বিক বিজ্ঞাপন ও বাণিজ্যিক চুক্তি। নাইকির মতো বড় ব্র্যান্ডসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি তার আয়কে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
রোনালদোর সবচেয়ে বড় কৌশল ছিল-তিনি শুধু নিজের পরিচিতি বিক্রি করেননি, নিজের ব্র্যান্ড তৈরি করেছেন। সিআর-সেভেন নামের মাধ্যমে তিনি প্রথমে আন্ডারওয়্যারের ব্যবসা শুরু করেন। পরে সেই ব্র্যান্ড ছড়িয়ে পড়ে পোশাক, সুগন্ধি, হোটেল, জিম এবং অন্যান্য ব্যবসায়িক খাতে।
এখানেই ছিল তার বড় পার্থক্য। অনেক তারকা শুধু বিজ্ঞাপনের মুখ হয়ে থাকেন, কিন্তু রোনালদো নিজের নামকে একটি ব্যবসায়িক সম্পদে পরিণত করেছেন। তিনি বুঝেছিলেন, ক্যারিয়ার শেষ হলেও একটি শক্তিশালী ব্র্যান্ড তাকে আয় এনে দিতে পারে।
যেখানে অনেক ফুটবলার ত্রিশের পর ধীরে ধীরে ক্যারিয়ারের শেষ পর্যায়ে চলে যান, রোনালদো সেখানে নিজের ক্যারিয়ারকে নতুনভাবে সাজিয়েছেন। ৩৭ বছর বয়সে আল নাসেরের সঙ্গে তার চুক্তি তাকে বিশ্বের সবচেয়ে লাভজনক ক্রীড়া চুক্তিগুলোর একটির অংশ করে তোলে। বছরে প্রায় ২০০ মিলিয়ন ডলারের মতো আয়, সঙ্গে বাণিজ্যিক চুক্তি ও বিভিন্ন বোনাস-সব মিলিয়ে তার আর্থিক সাম্রাজ্য আরও বড় হয়!
এর আগেই রোনালদো ক্যারিয়ার আয়ে ১ বিলিয়ন ডলারের সীমা অতিক্রম করেছিলেন। সৌদি আরবের অধ্যায় সম্পদ আরও বাড়িয়েছে তার। ব্লুমবার্গ এবং ফোর্বসের তথ্য অনুযায়ী রোনালদোর সম্পদের পরিমান ১২০ কোটি ডলার (১.২ বিলিয়ন) থেকে ১৪০ কোটি ডলার (১.৪ বিলিয়ন)!
রোনালদোর গল্প তাই শুধু ফুটবলের নয়। এটি এমন এক মানুষের গল্প, যিনি সীমিত সুযোগ থেকে শুরু করে নিজের প্রতিভা, পরিশ্রম এবং ব্র্যান্ড নির্মাণের দক্ষতায় নিজেকে একটি বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছেন। মাঠে তার গোল যেমন ইতিহাসে লেখা থাকবে, তেমনি নিজের জীবনকে সফলতার উদাহরণে রূপান্তর করার গল্পও অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।
মাদেইরার সাধারণ পরিবারের সেই ছেলেটি আজ বিশ্বের কোটি মানুষের অনুপ্রেরণা। যিনি এই ৪১ বছর বয়সেও জোড়া গোল করছেন বিশ্বকাপের মাঠে। রেকর্ড গড়ে নিজেকে নিয়ে যাচ্ছেন অনন্য উচ্চতায়।
রোনালদোর গল্প এটাই বলে-শুরুটা কোথায়, সেটি গুরুত্বপূর্ণ নয়; গুরুত্বপূর্ণ হলো একজন মানুষ নিজের সম্ভাবনাকে কত দূর পর্যন্ত নিয়ে যেতে পারে!
এসএন/কে