কুমিল্লায় স্কুলছাত্র গুলিবিদ্ধ, ১২ জনের বিরুদ্ধে মামলা

কুমিল্লা নগরীর কাটাবিল এলাকায় মাদকবিরোধী মানববন্ধনে অংশ নেওয়া স্থানীয়দের বাড়িঘরে হামলা ও নির্বিচারে গুলির ঘটনার পর অবশেষে মামলা করা হয়েছে। গুলিবিদ্ধ স্কুলছাত্র ইথান আহমেদ প্রেমের (১২) বাবা ইউনুছ মিয়া বাদী হয়ে বৃহস্পতিবার গভীর রাতে কোতোয়ালি মডেল থানায় ছয়জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা মিলিয়ে মোট ১২ জনের বিরুদ্ধে এই মামলা করেন। আজ শুক্রবার (২৬ জুন) বিকেলে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তৌহিদুল আনোয়ার।

ওসি জানান, এ ঘটনায় জড়িত সন্দেহে ইতোমধ্যে একজনকে আটক করা হয়েছে এবং অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারে পুলিশের চিরুনি অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

ঢাকা মেডিকেলে ইথান, শঙ্কামুক্ত নয় ফুসফুস

এদিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আশঙ্কাজনক অবস্থায় চিকিৎসাধীন ইথানের শরীর থেকে এখনও গুলি বের করা সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছেন তার বাবা ইউনুছ মিয়া। আজ শুক্রবার মুঠোফোনে তিনি বলেন, কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ঝুঁকি থাকায় চিকিৎসকরা গুলি বের করতে পারেননি, যার কারণে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ছেলেকে ঢাকা মেডিকেলে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে অপারেশন থিয়েটারে নেওয়া হলেও অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ ও জটিলতার কারণে তাৎক্ষণিকভাবে গুলি অপসারণ করা যায়নি। গুলিবিদ্ধ স্থানে এখনও অনবরত রক্তক্ষরণ হচ্ছে এবং বাইরে থেকে রক্ত দিতে হচ্ছে। হাসপাতালের বড় সার্জন এলে চূড়ান্ত অস্ত্রোপচার করা হবে বলে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন।

ইথানের মা সোনিয়া আক্তার কান্নায় ভেঙে পড়ে বলেন, তার একমাত্র ছেলেটি টিফিনের বিরতিতে বাসায় ফেরার পথে গুলিবিদ্ধ হয়েছে, ওরে ছাড়া তিনি বাঁচবেন না। কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক ডা. মো. শাহজাহান জানান, গুলিটি ইথানের ফুসফুস পর্যন্ত আঘাত করায় মারাত্মক ঝুঁকি এড়িয়ে তাকে দ্রুত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।

রাজনৈতিক নেতাদের পরিদর্শন ও প্রশাসনের জরুরি সভা

এই বর্বরোচিত ঘটনার পর বৃহস্পতিবার রাতেই দুর্ঘটনাস্থল কাটাবিল এলাকা পরিদর্শনে যান স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও জনপ্রতিনিধিরা। এর মধ্যে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন কুমিল্লা মহানগর বিএনপির সভাপতি উদবাতুল বারী আবু এবং দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আশিকুর রহমান মাহমুদ ওয়াসিম। এরপর এলাকা পরিদর্শন করেন কুমিল্লা-৬ (সদর ও সদর দক্ষিণ) আসনের সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা মনিরুল হক চৌধুরী। পরবর্তীতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, জেলা প্রশাসন, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ও রাজনৈতিক নেতাদের নিয়ে একটি জরুরি যৌথ সভা অনুষ্ঠিত হয়। আজ শুক্রবার সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে সংসদ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরী বলেন, একজন জনপ্রতিনিধি হিসেবে তিনি এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এ ঘটনার দায় এড়াতে পারেন না। জড়িতদের দ্রুততম সময়ে আইনের আওতায় আনতে সব পক্ষকে নিয়ে জরুরি বৈঠক করা হয়েছে।

রেঞ্জ ডিআইজির আলটিমেটাম ও বিচারের দাবিতে তীব্র প্রতিবাদ

কাটাবিল এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে আজ শুক্রবার দুর্ঘটনাস্থল সশরীরে পরিদর্শন করেছেন চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি মনিরুজ্জামান। তিনি গুলিবিদ্ধ ইথানের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে সান্ত্বনা দেন এবং সাংবাদিকদের জানান, মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে। এই জঘন্য অপরাধের সঙ্গে জড়িতরা যেখানেই থাকুক, তাদের খুঁজে বের করে আইনের আওতায় আনা হবে এবং এ বিষয়ে ধারাবাহিক অভিযান পরিচালনার জন্য স্থানীয় পুলিশকে কড়া নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে, এই সশস্ত্র হামলার প্রতিবাদে আজ শুক্রবার বিকেলে নগরীতে পৃথক বিক্ষোভ ও মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল। এর মধ্যে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর যুব শাখা এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির জেলা ও মহানগর শাখা পৃথক মানববন্ধনের মাধ্যমে দ্রুত আসামিদের গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানায়।

গত বৃহস্পতিবার দুপুরে কাটাবিল এলাকায় ‘নাগরিক কমিটি’র উদ্যোগে মাদকবিরোধী মানববন্ধন চলাকালে একদল সশস্ত্র দুর্বৃত্ত দেশীয় অস্ত্র নিয়ে হামলা চালিয়ে নির্বিচারে গুলি ছুড়লে স্কুলছাত্র ইথানসহ অন্তত সাতজন গুরুতর আহত হন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *