লাতিন আমেরিকার বৃহত্তম দেশ ব্রাজিলে রোববার (২৫ অক্টোবর) অনুষ্ঠিত হচ্ছে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দ্বিতীয় দফার ভোট। এ নির্বাচনে বামপন্থি বর্তমান প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা ও ডানপন্থি সিনেটর ফ্লাভিও বলসোনারোর মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস পাওয়া যাচ্ছে।
নির্বাচনে ফ্লাভিও জয়ী হলে দেশটির রাজনীতিতে ডানপন্থিদের প্রভাব আরও বাড়তে পারে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে। অন্যদিকে, লুলা পুনর্নির্বাচিত হলে তা হবে তার চতুর্থ মেয়াদ, যা ওয়াশিংটনের জন্য হতাশার কারণ হতে পারে।
দেশটির সাবেক প্রেসিডেন্ট জইর বলসোনারোর ছেলে ফ্লাভিও চলতি মাসের শুরুতে প্রথম দফার ভোটে জনমত জরিপের পূর্বাভাসকে ছাড়িয়ে এগিয়ে থেকে বড় চমক দেখান। প্রথম দফায় তিনি ৪৭ শতাংশ ভোট পান। অন্যদিকে, লুলার পক্ষে ভোট পড়ে ৪৫ শতাংশ।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত লাতিন আমেরিকার ডানপন্থি রাজনীতিকদের ধারাবাহিক সাফল্যের অংশ হতে পারে ফ্লাভিওর জয়। তবে লুলা আরেক মেয়াদে ক্ষমতায় ফিরলে ব্রাজিলের সঙ্গে বাণিজ্য ও নিরাপত্তা ইস্যুতে ওয়াশিংটনের চলমান মতবিরোধ অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে।
নির্বাচনী প্রচারে দুর্নীতির কেলেঙ্কারি, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের অভিযোগ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। যদিও ব্রাজিলের নির্বাচনে হস্তক্ষেপের অভিযোগ অস্বীকার করেছে ওয়াশিংটন। সাবেক প্রেসিডেন্ট জইর বলসোনারোর বিরুদ্ধে ২০২২ সালে অভ্যুত্থানের ষড়যন্ত্রের অভিযোগে ২০২৫ সালে দেওয়া দণ্ডের প্রভাবও নির্বাচনে পড়েছে। ফ্লাভিও প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলে তিনি তার বাবাকে মুক্ত করবেন।
জইর বলসোনারোর বিরুদ্ধে মামলাটিকে ‘উইচ হান্ট’ বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়রানি বলে আখ্যা দিয়েছেন ট্রাম্প। ২০২৫ সালে সাবেক ব্রাজিলীয় প্রেসিডেন্টের বিচারপ্রক্রিয়ার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত সিদ্ধান্তে ব্রাজিলের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেন তিনি। পরে এসব শুল্কের কিছু অংশ কমানো হলেও চলতি বছর অন্যায্য বাণিজ্যচর্চার অভিযোগ তুলে ব্রাজিলের ওপর নতুন শুল্ক আরোপ করেন ট্রাম্প।
লুলার অভিযোগ, বলসোনারো পরিবারের সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসনের ঘনিষ্ঠতা ব্রাজিলের নির্বাচনে প্রভাব বিস্তারের প্রচেষ্টার অংশ। একই সঙ্গে শুল্কসহ বিভিন্ন শাস্তিমূলক পদক্ষেপকে তিনি চাপ প্রয়োগ ও হয়রানি হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বৈষম্য ও বেকারত্ব কমলেও জীবনযাত্রার বাড়তি ব্যয় এবং পরিবারের ঋণের বোঝা নিয়ে উদ্বিগ্ন ভোটারদের সমর্থন আদায়ে হিমশিম খাচ্ছেন লুলা। পাশাপাশি দেশটিতে দীর্ঘদিনের গ্যাং-সহিংসতাও ভোটারদের উদ্বেগের বড় কারণ হয়ে রয়েছে।
অন্যদিকে, জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে অসন্তোষকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছেন ফ্লাভিও। অপরাধ দমনে কঠোর অবস্থানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি। গুরুতর যৌন অপরাধের ক্ষেত্রে রাসায়নিকভাবে খোজাকরণ এবং সর্বোচ্চ নিরাপত্তাবিশিষ্ট কারাগার প্রতিষ্ঠার মতো কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও বলেছেন এই ডানপন্থি নেতা।
প্রথম দফায় এগিয়ে ফ্লাভিও, শেষ মুহূর্তে ব্যবধান কমিয়েছেন লুলা
নির্বাচনের আগে প্রকাশিত জনমত জরিপগুলোতে দুই প্রার্থীর মধ্যে প্রায় সমান সমর্থনের চিত্র উঠে এসেছে। ভোটের শেষ দিনগুলোতে লুলা ব্যবধান কমিয়ে আনায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা আরও জমে উঠেছে। তবে ব্রাজিলের নির্বাচনী ইতিহাস ফ্লাভিওর পক্ষে যেতে পারে। দেশটিতে প্রথম দফার ভোটে দ্বিতীয় স্থানে থাকা কোনো প্রার্থী এখন পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়ী হননি।
প্রথম দফায় ফ্লাভিওর এগিয়ে থাকার খবরে ব্রাজিলের শেয়ারবাজার ও মুদ্রার দর বেড়েছিল। ব্যবসাবান্ধব সংস্কারের প্রত্যাশায় বাজারে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়।
প্রথম দফার নির্বাচনে ফ্লাভিওর লিবারেল পার্টি এবং অন্যান্য ডানপন্থি রাজনীতিকদেরও উল্লেখযোগ্য সাফল্য আসে। ফলে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলে আইনসভায় ফ্লাভিওর জন্য সংস্কার বাস্তবায়নের পথ সহজ হতে পারে। তবে লুলা জয়ী হলেও আইনসভায় ডানপন্থিদের শক্ত অবস্থান তাঁর সরকার পরিচালনাকে জটিল করে তুলতে পারে।