ইরানে নতুন হামলার পরিকল্পনা সেন্টকমের : অনুমোদন দেবেন ট্রাম্প?

কূটনৈতিক আলোচনার সব দরজাই যখন প্রায় বন্ধ, তখন আবারও মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে নতুন করে যুদ্ধের কালো মেঘ জমতে শুরু করেছে। তেহরানকে কাবু করতে এবার বড় ধরনের সামরিক হামলার পরিকল্পনা চূড়ান্ত করেছে ওয়াশিংটন। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ‘দ্য হিল’-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পেন্টাগন ও মার্কিন বাহিনী ইরানের বিরুদ্ধে যেকোনো সময় বিধ্বংসী আক্রমণ চালানোর সব প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে।

প্রতিবেদনে জানানো হয়, মধ্যপ্রাচ্যে দায়িত্বপ্রাপ্ত মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) ইরানের বিরুদ্ধে পরবর্তী ধাপে হামলার সমস্ত প্রস্তুতি সম্পন্ন করে হোয়াইট হাউসের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। পেন্টাগন সেন্টকমকে সম্ভাব্য যুদ্ধের পূর্ণাঙ্গ প্রস্তুতির নির্দেশ দেয়, যার মধ্যে ইরানের জ্বালানি অবকাঠামো, পারমাণবিক কেন্দ্র ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা লক্ষ্য করে আক্রমণের ছক তৈরি করা হয়েছে। একই সঙ্গে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের কাছে বেশ কয়েকটি কৌশলগত সামরিক বিকল্পও উপস্থাপন করা হয়েছে।

যা বলছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৩ নভেম্বরের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের পরই এই হামলা চালানো হতে পারে। তবে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার বক্তব্যে দ্বিমুখী সংকেত দিয়ে চলেছেন। শনিবার (২৪ অক্টোবর) তিনি যেমন ইঙ্গিত দিয়েছেন যে- যুক্তরাষ্ট্র প্রয়োজনে ‘আগামীকালই’ হামলা চালাতে পারে, তেমনই আবার তেহরানের সঙ্গে একটি ‘বড় ও চমৎকার’ চুক্তির সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেছেন।

অন্যদিকে, মার্কিন ডিরেক্টর অব ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স জয় ক্লেটন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওকে পাঠানো এক গোয়েন্দা স্মারকে সতর্ক করে জানিয়েছেন, ইরান মধ্যপ্রাচ্য ও অন্য অঞ্চলে মার্কিন কর্মকর্তাদের ওপর প্রাণঘাতী হামলার চেষ্টা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে, যা এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে। এই আশঙ্কার প্রেক্ষিতে মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কয়েকটি মার্কিন দূতাবাসে কর্মী সংখ্যা কমিয়ে ফেলা হয়েছে। পেন্টাগন নভেম্বরের শেষ নাগাদ মধ্যপ্রাচ্যে তাদের তৃতীয় বিমানবাহী রণতরী ‘ইউএসএস থিওডোর রুজভেল্ট’-এর পাশাপাশি অতিরিক্ত ১০ হাজার সেনা ও ১৩তম মেরিন এক্সপিডিশনারি ইউনিট মোতায়েন করছে।

ইরানের কঠোর প্রতিক্রিয়া

মার্কিন প্রস্তুতি ও হুমকির কড়া জবাব দিয়েছে তেহরান। শনিবার ইরানি প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেন, আমেরিকানরা আলোচনা ভেস্তে দিয়েছে, তবুও সমঝোতার প্রচেষ্টা বজায় রাখা উচিত।

পরোক্ষভাবে চরম উত্তেজনার আবহ তৈরি হওয়ায় ভারতে ১২তম ব্রিকস পার্লামেন্টারি ফোরামে যোগ দিচ্ছেন না ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ। এদিকে রোববার (২৫ অক্টোবর) সকালে ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দর নগরী বন্দর আব্বাসের আকাশে যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি একটি ‘লুকাস’ ড্রোন ভূপাতিত করার দাবি করেছে দেশটির সেনাবাহিনী। রয়টার্সের খবর অনুযায়ী, নতুন হামলা শুরু হলে পারস্য উপসাগরের তলদেশের সাবমেরিন কমিউনিকেশন ক্যাবলে আঘাত হানার পরিকল্পনাও প্রস্তুত রেখেছে তেহরান। একই সঙ্গে ইসলামী বিপ্লবী গার্ড কোর (আইআরজিসি) তাদের সামরিক নীতিকে সম্পূর্ণ ‘আক্রমণাত্মক’ করার ঘোষণা দিয়েছে।

চলতি অক্টোবর মাসেই হরমুজ প্রণালি ও সংলগ্ন অঞ্চলে ১২০টিরও বেশি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার ঘটনা ঘটেছে, যা এই ৮ মাসের যুদ্ধের মধ্যে সর্বোচ্চ।

কূটনৈতিক বিশ্লেষণ ও রাজনৈতিক সমীকরণ

চ্যাথাম হাউসের সহযোগী গবেষক জুলি নরম্যান আল জাজিরাকে জানান, ট্রাম্পের সামনে সব পথই খোলা রয়েছে। এই হামলা পরিকল্পনা একাধারে ইরানের ওপর চাপ সৃষ্টির কৌশল ও মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর বাস্তবায়নের জন্য একটি বাস্তবসম্মত সামরিক বিকল্প। তবে বিশ্লেষকরা প্রশ্ন তুল বলেছেন- নতুন করে এই যুদ্ধ বাড়ালে ট্রাম্পের রাজনৈতিক লাভ কী হবে এবং নতুন হামলা ইরানকে আলোচনায় আনতে পারবে কি না?

দোহা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ এলমাসরি সতর্ক করে বলেছেন, সব সংকেতই নির্দেশ করছে আমরা এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের দিকে যাচ্ছি। আর আশঙ্কার বিষয় হলো, সংঘাতের এই পরবর্তী ধাপটি আগের চেয়েও বহুগুণ বেশি বিধ্বংসী ও প্রাণঘাতী হতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *