১৪ বছর পেরিয়ে গেলেও সন্ধান মেলেনি ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) দুই শিক্ষার্থী মো. ওয়ালিউল্লাহ ও আল-মুকাদ্দাসের। ২০১২ সালে নিখোঁজ হন এই দুই শিক্ষার্থী। আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবসে ওই দুই শিক্ষার্থীর সন্ধান ও ঘটনার বিচার দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছে ইবি শাখা ছাত্রশিবির।
আজ রোববার (৩০ আগস্ট) দুপুর ১টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুষদ ভবন থেকে বিক্ষোভ মিছিলটি শুরু হয়। বিক্ষোভ মিছিলে, ‘ওলি ভাই গুম কেন, প্রশাসন জবাব চাই’, ‘গুমকারীদের কালো হাত, ভেঙে দাও ভেঙে দাও’, ‘ওলি ভাইয়ের সন্ধান, দিতে হবে দিতে হবে’, ‘১৪ বছর পেরিয়ে গেল, আর কত অপেক্ষা’, ‘জাস্টিস জাস্টিস, উই ওয়ান্ট জাস্টিস’, ‘এই বাংলায় হবে না, গুমকারীদের ঠিকানা’, ‘মুকাদ্দাস ভাই গুম কেন, প্রশাসন জবাব চাই’, ‘খুনিদের ঠিকানা, এই বাংলায় হবে না’, ‘আওয়ামী লীগের আস্তানা, গুঁড়িয়ে দাও’, ‘আমার ভাই ফিরবে কবে, প্রশাসন বিচার চাই’ ইত্যাদি স্লোগান দিতে দেখা যায়।
মিছিলটি ক্যাম্পাসের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে বিশ্ববিদ্যালয়ের ফটকে সংক্ষিপ্ত সমাবেশে করে। সমাবেশে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবিরের সভাপতি ইউসুফ আলী, সেক্রেটারি রাশেদুল ইসলাম রাফি, কুষ্টিয়া জেলা ছাত্রশিবিরের সভাপতি ইমরান বিশ্বাস বক্তব্য দেন।
এ সময় ইবি ছাত্রশিবিরের সভাপতি ইউসুফ আলী বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত অসংখ্য মানুষকে গুম করা হয়েছে। ২০২৪ সালে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গুমের ঘটনায় প্রায় এক হাজার ৯০০টি অভিযোগ জমা পড়ে। এর মধ্যে এক হাজার ৫৫৯টি প্রমাণিত হয়েছে। এখনও ২৫১ জনের সন্ধান পাওয়া যায়নি। সরকারকে তাদের জীবিত-মৃত অবস্থান নিশ্চিত করতে হবে।
ইউসুফ আলী আরও বলেন, “ওয়ালিউল্লাহ ও আল-মুকাদ্দাসের জনপ্রিয়তার কারণে প্রশাসনের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী ও ছাত্রলীগের মাধ্যমে তাদের গুম করা হয়েছে। এ ঘটনায় জড়িতরা এখনও ক্যাম্পাসে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তাদের বিচার নিশ্চিত করতে হবে। আগের প্রশাসন তদন্ত কমিটি করলেও এর কার্যক্রম দেখা যায়নি। আগামী সাত দিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করতে হবে, না হলে ছাত্রশিবির কঠোর কর্মসূচি দেবে। আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবসে ওয়ালিউল্লাহ ও আল-মুকাদ্দাসের গুমের বিচার নিশ্চিত করে সরকারকে প্রমাণ করতে হবে তারা নিরপেক্ষ। আমরা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানাচ্ছি।
২০১২ সালের ২ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় যান আল-ফিকহ বিভাগের শিক্ষার্থী আল-মুকাদ্দাস। ৪ ফেব্রুয়ারি রাতে তিনি ও তাঁর বন্ধু মো. ওয়ালীউল্লাহ কল্যাণপুর থেকে হানিফ পরিবহণের একটি বাসে (নম্বর-৩৭৫০) ওঠেন। রাত ১টার দিকে বাসটি সাভারের নবীনগরে পৌঁছালে র্যাব-৪-এর একটি কালো গাড়ি বাসটির গতিরোধ করে। র্যাবের পোশাক পরিহিত ৮-১০ জন ও সাদা পোশাকের কয়েকজন ব্যক্তি র্যাব ও ডিবি পরিচয়ে তাদের বাস থেকে নামিয়ে নিয়ে যান। এরপর থেকে তাদের আর কোনো সন্ধান মেলেনি।
এ ঘটনায় ৬ ফেব্রুয়ারি মুকাদ্দাসের চাচা আবদুল হাই দারুস সালাম থানায় এবং ৮ ফেব্রুয়ারি ওয়ালীউল্লাহর বড় ভাই খালেদ সাইফুল্লাহ আশুলিয়া থানায় জিডি করেন। পরে পরিবারের পক্ষ থেকে পুলিশ, র্যাবসহ প্রশাসনের বিভিন্ন কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করেও সন্ধান না পেয়ে হাইকোর্টে পৃথক দুটি রিট করা হয়। পরে রিট দুটিও খারিজ হয়ে যায়।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, আল-মুকাদ্দাস আল-ফিকহ বিভাগের অনার্স চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী ও ইবি শাখা ছাত্রশিবিরের সাংস্কৃতিক সম্পাদক ছিলেন। তার বাড়ি পিরোজপুরের খানাকুনিয়ারী গ্রামে। অন্যদিকে মো. ওয়ালীউল্লাহ ছিলেন দাওয়াহ অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থী ও শাখা ছাত্রশিবিরের অর্থ সম্পাদক। তার বাড়ি ঝালকাঠির কাঁঠালিয়ার পশ্চিম শৌলজালিয়া গ্রামে।
এদিকে তাদের নিখোঁজের ঘটনা তদন্তে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর গত বছরের সেপ্টেম্বরে ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি গঠন করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। তবে কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক আব্দুল হান্নান পদত্যাগ করায় তদন্ত কার্যক্রম স্থগিত হয়ে যায়। এমনকি দীর্ঘ এক বছরেও কমিটি পুনর্গঠন করেনি।
ওয়ালীউল্লাহ ও মুকাদ্দাসের পরিবারের দাবি, তারা তাদের সন্তান ফিরে পেতে চায়। জীবিত বা মৃত হোকÑতাদের সন্ধানের দাবি পরিবারের। একই সঙ্গে নিখোঁজের ঘটনায় জড়িতদের চিহ্নিত করে বিচারের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন স্বজন ও সহপাঠীরা।