গত কয়েক বিশ্বকাপের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী দল নিয়ে ২০২২ বিশ্বকাপ খেলতে কাতার গিয়েছিল ব্রাজিল। মধ্যপ্রাচ্যে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে সবচেয়ে দামি স্কোয়াডও ছিল সেলেসাওদের। এমনকি বলা হচ্ছিল, ব্রাজিলের বেঞ্চে থাকা স্কোয়াড দিয়েই বিশ্বকাপ জেতা সম্ভব।
বাস্তবে কাতারে হয়েছে উল্টোটা। কোয়ার্টার ফাইনালে ক্রোয়েশিয়ার মুখোমুখি হয়েছিল ব্রাজিল। দারুণ লড়াই করছিল দুই দল। নির্ধারিত সময়ের খেলা গোলশূন্য ড্র হওয়ায়, খেলা গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে। ম্যাচের ১০৫তম মিনিটে জাল খুঁজে নেন নেইমার জুনিয়র।
১২০ মিনিটের খেলা প্রায় শেষের দিকে। ততক্ষণে জয় উদযাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছিল ব্রাজিল সমর্থকরা। কিন্তু সেই প্রস্তুতিতে রণেভঙ্গ দেয় ক্রোয়েশিয়া। ১১৭তম মিনিটে গোল করে ম্যাচে সমতা ফেরায় তারা। এরপর টাইব্রেকারে ৪-২ গোলে হেরে বিদায় নেয় পাঁচ বারের বিশ্বচ্যিাম্পিয়নরা।
টাইব্রেকারে প্রথম চার শটের মধ্যে দুটিতেই গোল করতে ব্যর্থ হয় ব্রাজিল। চতুর্থ শটটি নেন ডিফেন্ডার মারকুইনহোস। তার শট ক্রোয়েশিয়ার গোলরক্ষকের ডানপাশের পোস্টে লাগে। সঙ্গে সঙ্গে বিজয় উল্লাসে মেতে ওঠে লুকা মদ্রিচরা।
ক্রোয়াটদের উল্লাসের ফাঁকে ক্যামেরায় ধরা পড়ে নেইমারের বিমর্ষ চেহারা। আকাশের দিকে চিৎ হয়ে শুয়ে মাথায় হাত নেইমারের। চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ছিল পানি। দানি আলভেজ যখন তাকে টেনে তুললেন, তখন পা যেন বিষণ্নতায় নড়াতে পারছিলেন না নেইমার। মারকুইনহোস মিস না করলে পঞ্চম শটটি নিতেন তিনি।
সামনে আরও একটি বিশ্বকাপ। তার আগে এক ইউটিউব ভিডিওতে সান্তোসের সতীর্থদের সঙ্গে সে সময়ের অনুভুতি ভাগাভাগি করলেন নেইমার। তিনি বলেন, ‘আমার জীবনে, আমি সবসময় পঞ্চম পেনাল্টি নিয়েছি। পঞ্চম পেনাল্টি সবচেয়ে কঠিন, কিন্তু তা হয়তো আসে না।’
বিশ্বকাপ জয়ের জন্য বাস্তবিক অর্থেই সেবারই সবচেয়ে ভালো অবস্থানে ছিল ব্রাজিল। নেইমারের ক্যারিয়ারে ছিল সেটি তৃতীয় বিশ্বকাপ। কিন্তু সম্ভাবনাময় একটি যাত্রার সমাপ্তি ঘটে খালি হাতে।
সে সময় মারা যাওয়ার অনুভূতি হচ্ছিল নেইমারের। তিনি বলেন, ‘মনে হচ্ছিল আমি মারা যাচ্ছি। ম্যাচের পর আমরা হোটেলে গেলাম, মনে হচ্ছিল পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। আপনি ধীরে ধীরে পরিবারের সঙ্গে মিলিত হচ্ছেন। সবাই আপনার পাশ দিয়ে যাচ্ছে গম্ভীর মুখে। মুখ বাঁকা করে বলছে, এত বাজে?’
বিশ্বকাপে সেই হারের পর ব্রাজিলের জার্সিতে সবচেয়ে বেশি গোল করা নেইমারের মনে হয়েছিল, বেঁচে থাকতেই তিনি যেন নিজের শেষকৃত্য দেখে ফেললেন।
তিনি বলেন, ‘ঈশ্বরের দিব্যি করে বলছি, আমার শেষকৃত্য কেমন হবে সেটা যেন দেখে ফেললাম। একটা ছোট্ট ঘরে বসে ছিলাম। আমার পরিবার আসল, আরও অনেকে আসল। সবার চোখগুলো লাল, কোনো শব্দ বলছে না। মনে হচ্ছিল আমি যেন কফিনে এবং সবাই বলছে, বাহ, তুমি এখনও বেঁচে আছ, হ্যাঁ? সেই সময় এমন অনুভূতি হচ্ছিল।’
সেই বিশ্বকাপের পরে খুব অল্প কয়েকটি ম্যাচেই ব্রাজিলের হলুদ জার্সিতে মাঠে নামা হয়েছে নেইমারের। ২০২৩ সালের অক্টোবরে বিশ্বকাপ বাছাইয়ের ম্যাচে উরুগুয়ের বিপক্ষে এসিএল ইনজুরিতে পড়েন নেইমার। এরপর মাঠের বাইরে ছিলেন টানা এক বছরেরও বেশি সময়।
চোট কাটিয়ে ক্লাবের জার্সিতে মাঠে ফিরলেও নিয়মিতই ছোটখাটো চোটের কারণে মাঠের বাইরে থাকতে হচ্ছে নেইমারকে। চলতি বছরেও দু’বার যেতে হয়েছে ডাক্তারের ছুরি-কাঁচির নিচে।
২০২৬ বিশ্বকাপের আর মাত্র দুমাস বাকি। কিন্তু এখনো নিশ্চিত নয় নেইমারের বিশ্বকাপের স্কোয়াডে থাকা। ব্রাজিল কোচ কার্লো আনচেলত্তি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, পূর্ণ ফিট না হলে নেইমারকে বিশ্বকাপের বিমানে তুলবেন না তিনি।
বর্তমানে নেইমারের বয়স ৩৪ বছর। তাই বিশ্বকাপ দলে সুযোগ না পেলেও এটাই হতে যাচ্ছে নেইমারের ক্যারিয়ারের শেষ বিশ্বকাপ। ফলে নিজের সবটুকু দিয়ে আপাতত আনচেলত্তির সেই চাহিদা পূরণ করতেই ব্যস্ত সময় পার করছেন তিনি।