সাত মাস ধরে সন্তান হারানোর শোক বয়ে বেড়াচ্ছিলেন অটোরিকশাচালক বিল্লাল হোসেন ও তার স্ত্রী কোহিনূর আক্তার। তাদের সেই শোকের ক্ষত শুকানোর আগেই আবারও নেমে এলো আরও বড় এক নির্মমতা। এবার কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের খোলা ড্রেন কেড়ে নিল তাদের আট বছরের মেয়ে মাহফুজা আক্তার স্মৃতির প্রাণ।
এক বছরেরও কম সময়ে দুই সন্তান হারিয়ে পরিবারটি এখন শোকে স্তব্ধ। নগরীর বদরপুর এলাকার বাসিন্দা বিল্লাল হোসেনের পৈতৃক বাড়ি চাঁদপুর জেলায়। জীবিকার তাগিদে তিনি দীর্ঘদিন ধরে কুমিল্লায় বসবাস করছেন। স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে ছোট্ট সংসারটি ছিল তার জীবনের সবচেয়ে বড় আশ্রয়। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে একে একে দুই সন্তানকে হারিয়ে এখন অসহায় হয়ে পড়েছেন তিনি।
আজ সোমবার (২২ জুন) জোহর নামাজের পর জানাজা শেষে স্মৃতির মরদেহ টমসমব্রিজ কবরস্থানে দাফন করা হয়। জানাজায় স্বজন, প্রতিবেশী ও স্থানীয়রা অংশ নেন। কিন্তু সবার চোখ ছিল সন্তান হারানোর অসহনীয় বেদনায় ভেঙেপড়া মা কোহিনূরের দিকে।
স্থানীয়রা জানায়, বিল্লাল-কোহিনূর দম্পতির তিন সন্তানের মধ্যে একমাত্র ছেলে প্রায় সাত মাস আগে অসুস্থ হয়ে মারা যায়। সেই শোক কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই গতকাল রোববার রাতে প্রাণ হারাল তাদের মেজো মেয়ে স্মৃতি।
মামার বিয়ের অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে নানাবাড়ি থেকে মায়ের হাত ধরে বাড়ি ফিরছিল ছোট্ট স্মৃতি। বৃষ্টির কারণে সড়কে জলাবদ্ধতা থাকায় রিকশা না পেয়ে ফুটপাত ধরে হাঁটছিলেন কোহিনূর। হঠাৎ করেই মায়ের হাত থেকে ছিটকে ফুটপাতের পাশের খোলা ড্রেনে পড়ে যায় শিশুটি। প্রবল স্রোতে মুহূর্তেই তলিয়ে যায় সে। প্রায় ২০ মিনিটের প্রাণপণ চেষ্টায় স্থানীয়রা ড্রেনের ভেতর থেকে তাকে উদ্ধার করে দ্রুত হাসপাতালে নেয়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
দাফনের আগে মফিজাবাদ কলোনির বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় হৃদয়বিদারক দৃশ্য। মেয়ের কথা বলতে বলতে বারবার জ্ঞান হারাচ্ছেন মা কোহিনূর। জ্ঞান ফিরে এলে বুক চাপড়ে কাঁদতে কাঁদতে বলেন, আমার ছেলেটা চলে গেছে সাত মাস আগে। মেয়েটাও চলে গেল। আমি এখন কী নিয়ে বাঁচব?
এদিকে খোলা ড্রেনে শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় নগরজুড়ে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরেই ড্রেনটি ঢাকনাবিহীন অবস্থায় ছিল। বারবার জানানো হলেও কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
নগরীর ২ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর বিল্লাল হোসেন বলেন, ড্রেনটি অনেক দিন ধরেই খোলা ছিল। খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমরা ঘটনাস্থলে যাই। সিটি করপোরেশনের প্রশাসকও নিহত শিশুর পরিবারের সঙ্গে কথা বলেছেন।