যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের সাম্প্রতিক শান্তি চুক্তি নিয়ে দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে তীব্র মতভেদ ও টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে। নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির প্রকাশ্য আপত্তি দেশটির কট্টরপন্থি রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলোকে উৎসাহিত করেছে, যার ফলে তুলনামূলক মধ্যপন্থি হিসেবে পরিচিত প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এখন তীব্র রাজনৈতিক রোষানলের মুখে পড়েছেন। খবর আল জাজিরার।
গত মার্চে বাবা আলি খামেনির মৃত্যুরে পর ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা হন মোজতবা খামেনি। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে তিনি প্রকাশ্যে না এলেও এই চুক্তি নিয়ে একটি লিখিত বিবৃতি দিয়েছেন। সেখানে তিনি জানান, নীতিগতভাবে এই চুক্তিতে তাঁর আপত্তি বা ভিন্ন মত ছিল।
প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান চুক্তির সব দায় নিজের কাঁধে নেওয়ায় এবং যুক্তরাষ্ট্রের কোনো বাড়তি বা অন্যায় দাবি মেনে না নেওয়ার শর্ত দেওয়ায় সর্বোচ্চ নেতা শেষ পর্যন্ত এটির অনুমতি দেন। তবে চুক্তিটি চূড়ান্ত করতে একটি বড় শর্ত দিয়েছেন খামেনি। তিনি জানিয়েছেন, দেশের সামরিক কমান্ডারসহ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের অন্তত তিন-চতুর্থাংশ (৭৫ শতাংশ) সদস্যের সই বা অনুমোদন এই চুক্তিতে অবশ্যই থাকতে হবে।
সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ খামেনিকে আশ্বস্ত করে জানিয়েছে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ‘পূর্ণ অবিশ্বাস’ নিয়ে আলোচনা এগিয়ে নেবে এবং কোনো শর্ত লঙ্ঘিত হলে প্রতিশোধের পরিকল্পনা তৈরি রয়েছে।
প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান এই চুক্তিকে ‘ঐতিহাসিক দলিল ও শক্তিশালী ইরানের পক্ষ থেকে একটি বার্তা’ হিসেবে অভিহিত করেছেন, যা কোনো হুমকি বা চাপের মুখে মর্যাদা বিসর্জন না দেওয়ার জাতির কণ্ঠস্বরকে প্রতিফলিত করে।
প্রধান আলোচক ও সংসদীয় স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবফ সর্বোচ্চ নেতাকে তাঁর বিচক্ষণ বার্তার জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, এই সমঝোতা স্মারক কেবল ‘একটি কঠিন ও আঁকাবাঁকা পথের সূচনা’। নিজেকে ‘যুদ্ধোত্তর অর্থনৈতিক কমান্ডার’ হিসেবে দাবি করে তিনি জনগণের ওপর থেকে অর্থনৈতিক চাপ মুক্ত করতে এবং সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে নিজের জন্য বাড়তি ক্ষমতা দাবি করেছেন।
খামেনির সমর্থক ও কট্টরপন্থিরা দাবি করছেন, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত না থাকলে আলোচনা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। রাজধানী তেহরানের কাছে এক সমাবেশে কট্টরপন্থি ধর্মীয় স্তুতিবাদক মোহাম্মদ আলি বখশি সরাসরি প্রেসিডেন্টকে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, সর্বোচ্চ নেতার শর্ত পূরণ না হলে তারা রাষ্ট্রপতিকে শোচনীয় অবস্থায় ফেলবেন। তবে রাষ্ট্রপতির কার্যালয় এই বিভেদ সৃষ্টিকারীদের বিচারের দাবি জানিয়েছে।
অতি-রক্ষণশীল কোমের প্রতিনিধি মোহাম্মদ মান্নান রাইসি সর্বোচ্চ নেতা একা হয়ে পড়েছেন উল্লেখ করে সংসদ চালুর দাবি জানিয়েছেন, যাতে দেশের স্বার্থবিরোধী চুক্তি আটকে দেওয়া যায়। অন্যদিকে মাশহাদের প্রভাবশালী ইমাম আয়াতুল্লাহ আহমদ আলামোলহোদা বলেন, ওয়াশিংটনের সঙ্গে লড়াই শেষ হয়নি। ৭০ বছর ধরে অপরাধ করা এই শত্রু শিবিরের শত শত ‘কুকুরকে’ হত্যা করলেও তা শহীদ ইমামের হত্যার প্রতিশোধের সমান হবে না।
শনিবার ইরানি সংবাদপত্রগুলোর প্রথম পাতায় এই খবর স্থান পায়। কিছু রক্ষণশীল দৈনিক বলেছে, সর্বোচ্চ নেতা কেবল শর্তসাপেক্ষে অনুমোদন দিয়েছেন এবং শান্তি স্থাপনের পথ এখনও কঠিন। অপরদিকে সংস্কারপন্থি সংবাদপত্র ‘এতেমাদ’ এই সমঝোতা স্মারকটিকে একটি ‘বিজয় দলিল’ হিসেবে বর্ণনা করেছে।