শরীয়তপুরের জেলা প্রশাসকের কার্যালয় চত্বরে তিন সাংবাদিককে মারধর করা হয়েছে। আজ মঙ্গলবার (২৪ আগস্ট) সকালে জেলা যুবদলের সাবেক সভাপতি আরিফুজ্জামান মোল্লার নেতৃত্বে তার সমর্থকরা এ মারধর করেন বলে অভিযোগ ভুক্তভোগী সাংবাদিকদের।
হামলার শিকার সাংবাদিকেরা হলেন—ডেইলি স্টারের জাহিদ হাসান, নিউজ টুয়েন্টিফোর টেলিভিশন ও জাগো নিউজের বিধান মজুমদার ও দৈনিক মানবকণ্ঠের বরকত মোল্লা।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, মঙ্গলবার সকালে জেলা প্রশাসককে প্রত্যাহারে সাংবাদিকদের দাবির প্রতিবাদে জেলা বিএনপিনেতারা বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করছিলেন। ভুক্তভোগী তিন সাংবাদিক সেই সমাবেশের সংবাদ সংগ্রহ করতে গেলে মারধরের শিকার হন।
আহত সাংবাদিক জাহিদ হাসান অভিযোগ করে বলেন, ‘পেশাগত দায়িত্ব পালন করার জন্য আমি জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে যাই। সেখানে একটি বিক্ষোভ মিছিল হচ্ছিল। ওই মিছিলের ছবি ও ভিডিও ধারণ করার সময় যুবদল নেতা আরিফ মোল্লা (আরিফুজ্জামান) তার সহযোগীদের নিয়ে আমাকে মারধর করেন। তারা আমার ক্যামেরা ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন। তখন স্থানীয় কয়েকজন আইনজীবী আমাকে উদ্ধার করে তাদের কার্যালয় নিয়ে যান।’
সাংবাদিক বিধান মজুমদার বলেন, ‘তথ্য সংগ্রহ করার জন্য আমি জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে যাই। ভবনের নিচতলা থেকে দোতলায় যাচ্ছিলাম। সেখানে যুবদলের নেতা আরিফ মোল্লা ও তার সহযোগীরা আমাকে চড়–থাপ্পড় ও লাথি মেরে ভবন থেকে বের করে দেন।’
তিন সাংবাদিককে মারধরের বিষয়ে জানতে যুবদলের সাবেক সভাপতি আরিফুজ্জামান মোল্লাকে কয়েক দফা ফোন করা হয়, কিন্তু তিনি ফোন ধরেননি।
কয়েকজন সাংবাদিক জানান, শরীয়তপুর জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে গত শনিবার রাতে প্রেসক্লাবের সীমানা প্রাচীরের তিনটি দেয়াল ভেঙে দেওয়া হয়। ওই ঘটনা নিয়ে এর প্রতিবাদে সাংবাদিক বি এম ইসরাফিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে প্রেসক্লাব সভাপতি আবুল হোসেন ও জেলা প্রশাসক তাহসিনা বেগমের ছবি দিয়ে প্রতিবাদ করেন। ওই ঘটনার জেরে তার ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। তাতে বি এম ইসরাফিলের ডান হাতের কবজি ভেঙে যায়।
সাংবাদিক ইসরাফিলের ওপর হামলা ও প্রেসক্লাবের সীমানাপ্রাচীর ভেঙে ফেলার প্রতিবাদে জেলায় কর্মরত সাংবাদিকরা গত রোববার বিকেলে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ মিছিল ও মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেন। কর্মসূচি চলাকালে জেলা প্রশাসক তাহসিনা বেগম সেখান দিয়ে যেতে চাইলে সাংবাদিকরা তাকে ঘিরে রাখেন। এ সময় সাংবাদিকরা জেলা প্রশাসককে প্রত্যাহার দাবি করে বিক্ষোভ করতে থাকেন।
ওই ঘটনায় শরীয়তপুরের বিএনপির নেতাকর্মীরা সাংবাদিকদের ওপর ক্ষুব্ধ হয়। বিএনপির কর্মীরা জেলা প্রেসক্লাব ও কয়েকজন সাংবাদিকের উদ্দেশে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনা করেন। তারা সভা করে সাংবাদিকদের বিপক্ষে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করার সিদ্ধান্ত নেন। এর ধারাবাহিকতায় আজ মঙ্গলবার বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশের আয়োজন করা হয়। ‘শরীয়তপুর জেলার সর্বস্তরের জনগণ’ নামের ব্যানারে জেলা পর্যায়ের বিএনপি ও যুবদলের কিছু নেতার উপস্থিতিতে কয়েকশ মানুষ কর্মসূচিতে অংশ নেয়। জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে জেলা প্রশাসককে ঘিরে বিক্ষোভকারী সাংবাদিকদের শাস্তি দাবি করেন তারা।
শরীয়তপুর জেলা বিএনপির সহসভাপতি শাহ মোহাম্মদ আবদুস সালাম সমাবেশে দেওয়া বক্তব্যে বলেন, সাংবাদিকরা জেলা প্রশাসকের সঙ্গে অন্যায় আচরণ করেছেন। তারা এভাবে তার প্রত্যাহার চাইতে পারেন না। সাংবাদিকতার আড়ালে কিছু সন্ত্রাসী ও ফ্যাসিবাদের দোসররা বিএনপি সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার জন্য এমন কাজ করেছেন। আমারা তার প্রতিবাদ জানাই।
ওই বিক্ষোভ সমাবেশে বক্তব্য দেন শরীয়তপুর জেলা বিএনপির সহসভাপতি শাহ মোহাম্মদ আবদুস সালাম, সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি সিরাজুল হক মোল্লা, সাধারণ সম্পাদক মাহবুব মোর্শেদ প্রমুখ।
বিএনপি নেতারা দাবি করেন, জেলা প্রশাসক সরকারের প্রতিনিধি। তার গাড়ি ঘিরে সাংবাদিকরা মব সৃষ্টি করেছেন। সাংবাদিকরা সন্ত্রাসী আচরণ করে জেলা প্রশাসকের প্রত্যাহার দাবি করেছেন। সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা করেছিলেন। তারা প্রেসক্লাবের নামে অবৈধভাবে সরকারি জমি দখলে রেখেছেন।
শরীয়তপুর প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক নুরুল আমিন রবিন বলেন, জেলা প্রশাসন থেকে লিজ নেওয়া প্রেসক্লাবের নির্ধারিত জায়গার সীমানা প্রাচীর কোনো ধরনের নোটিশ ছাড়া ভেঙে দেয় জেলা প্রশাসন। বিষয়টির জন্য জেলা প্রশাসক ও প্রেসক্লাবের সভাপতিকে দায়ী করে তাদের ছবিসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পোস্ট করেন সময় টেলিভিশনের রিপোর্টার বি এম ইসরাফিল। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে সভাপতির ছেলের নেতৃত্বে পাঁচ ছয়জন লোক এসে ইসরাফিলকে মারধর করে। এই ঘটনা নিয়ে সাংবাদিকরা জেলা প্রশাসনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করায় ক্ষুব্ধ হয়ে আজ কর্মসূচি পালন করছিল বিএনপির নেতাকর্মীরা। সংবাদ সংগ্রহ করতে গেলে তিন সাংবাদিককে মারা হয়েছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে তদন্ত করে দোষীদের বিচারের আওতায় আনার দাবি জানাচ্ছি।
সাংবাদিকদের মারধরের বিষয়ে শরীয়তপুরের পুলিশ সুপার (এসপি) রওনক জাহান বলেন, এ ঘটনায় আমাদের কাছে কোনো লিখিত অভিযোগ আসেনি। অভিযোগ পেলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।