ফুটবল বিশ্বকাপ খুব কম সময়ই পুরোপুরি রাজনীতিমুক্ত থেকেছে। তবে এবার যে জটিল ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে টুর্নামেন্টটি অনুষ্ঠিত হচ্ছে, তার নজির আগে খুব কমই দেখা গেছে। প্রধান আয়োজক দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধরত যে দেশের সঙ্গে, সেই দেশও বিশ্বকাপে অংশ নিচ্ছে।
ইরানের সঙ্গে এখন যুদ্ধবিরতিতে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ইরানের ম্যাচ যুক্তরাষ্ট্রে হলেও দলটি অবস্থান করছে সহ-আয়োজক মেক্সিকোতে। ম্যাচের আগের দিন তারা যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরেকটি বাস্তবতা। সেটি হলো, ২০২৬ বিশ্বকাপের তিন সহ-আয়োজক-যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো—এখন নিজেদের মধ্যেই তীব্র বাণিজ্যসংঘাতে জড়িত। মেক্সিকোর এস্তাদিও আজতেকা স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচ থেকে নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে ফাইনাল পর্যন্ত সময়ের মধ্যে উত্তর আমেরিকার এই তিন দেশের মধ্যে মুক্ত বাণিজ্যচুক্তি (এফটিএ) নিয়ে নতুন করে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
বিশ্বকাপের আবহে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংঘাতের গতিপথ বদলাবে কি না, তা নিশ্চিত নয়। তবে ফুটবলের অর্থনীতিতে বড় পরিবর্তন ইতিমধ্যে দৃশ্যমান। এটি শুধু ফুটবল অর্থনীতির পুনর্গঠন নয়, বরং আধুনিক অর্থনীতি কীভাবে পরিচালিত হচ্ছে, তারও একটি উদাহরণ।
চাপে সমর্থকেরা
স্কটল্যান্ডের কিংবদন্তি কোচ জক স্টেইল বলেছিলেন, ‘সমর্থক ছাড়া ফুটবল কিছুই নয়।’ কিন্তু সেই সমর্থকেরাই এবার সবচেয়ে বেশি চাপে। বিশ্বকাপের কিছু ম্যাচের টিকিটের দাম বেড়ে এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা অনেকের নাগালের বাইরে। এমনকি স্টেডিয়ামে যাওয়ার ট্রেনভাড়াও অনেক ক্ষেত্রে সাধারণ টিকিটের দামের কাছাকাছি। যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সি ট্রানজিটের সাধারণ ফিরতি ভাড়া ১২ দশমিক ৯০ ডলার হলেও বিশ্বকাপ উপলক্ষে তা প্রায় ৮ গুণ বেড়ে ১০০ ডলারে উন্নীত হয়েছে।
এই পরিস্থিতির পেছনে রয়েছে নতুন অর্থনৈতিক মডেল। টুর্নামেন্টের বড় অংশই অনুষ্ঠিত হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রে। এক-চতুর্থাংশ ম্যাচ কানাডা ও মেক্সিকোয় হলেও যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাচগুলোতে এনএফএলের ব্যবসায়িক মডেলের প্রভাব স্পষ্ট।
ফলে ‘ফেয়ার প্লে’ বা ‘সুন্দর খেলা’ ফুটবল এখন ফিফার জন্য আরও বেশি ‘লাভজনক খেলায়’ পরিণত হয়েছে। অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এটি বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে প্রভাবশালী আয়োজনগুলোর একটি হতে পারে।
অনেক বিশ্লেষকের মতে, এটি ‘কে-আকৃতির অর্থনীতি’র প্রতিফলন। অর্থাৎ সমাজের একাংশ দ্রুত এগিয়ে যায়, অন্য অংশ পিছিয়ে পড়ে। টিকিটের মূল্য নির্ধারণও যেন মূলত উচ্চ আয়ের দর্শকদের কেন্দ্র করেই করা হয়েছে।
তবে ফিফার যুক্তি ভিন্ন। তাদের মতে, টিকিট বিক্রি থেকে অর্জিত অর্থ দরিদ্র দেশগুলোর ফুটবল উন্নয়নে পুনর্বিনিয়োগ করা হবে।

সবচেয়ে বড় বিশ্বকাপ
এবারই প্রথম বিশ্বকাপে দলের সংখ্যা ৩২ থেকে বেড়ে ৪৮টি হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ম্যাচ, সবচেয়ে বড় ভৌগোলিক বিস্তৃতি এবং সম্ভাব্য সর্বোচ্চ টেলিভিশন দর্শক—সব মিলিয়ে এটি ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিশ্বকাপ।
ভ্যাঙ্কুভার থেকে মেক্সিকো সিটি পর্যন্ত বিস্তৃত এই আয়োজনের ভৌগোলিক পরিসরও নজিরবিহীন। চ্যাম্পিয়ন দলকে এমন দূরত্ব ভ্রমণ করতে হতে পারে, যা প্রায় পৃথিবীর ব্যাসের সমান।
তবে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় টিকিটের দাম। মার্কিন ডলারে ফাইনালের টিকিটের দাম বেড়ে পাঁচ অঙ্কে পৌঁছেছে। আকর্ষণীয় গ্রুপ ম্যাচের গড় টিকিটমূল্য প্রায় এক হাজার ডলার। তুলনামূলক কম গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের টিকিটও কয়েক শ’ডলারের নিচে নয়।
এটি মূল্য নির্ধারণের নতুন এক পরীক্ষাও বটে। ‘ডায়নামিক প্রাইসিং’ পদ্ধতিতে চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দামও বাড়ে। সংগীতানুষ্ঠান বা কিছু ক্রীড়া আসরে আগে এ পদ্ধতি ব্যবহৃত হলেও এত বড় পরিসরে তা এবারই প্রথম দেখা গেল।
যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ফুটবল লিগ বা এনএফএল মডেলে সাধারণত প্রতিটি আসন থেকে সর্বোচ্চ রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য থাকে। স্টেডিয়াম পূর্ণ হলো কি না, সেটি মুখ্য নয়; মূল লক্ষ্য থাকে সর্বোচ্চ আয় নিশ্চিত করা।
এ কারণেই যুক্তরাষ্ট্রের ক্রীড়াঙ্গনে টিকিট অনেক সময় বিলাসপণ্যের মতো মূল্য পায়। অনেক স্টেডিয়ামে সাধারণ আসনের পরিবর্তে গড়ে তোলা হয়েছে করপোরেট বক্স, আতিথেয়তা স্যুইট ও বিলাসবহুল লাউঞ্জ। এই মডেলে দর্শকসংখ্যার চেয়ে দর্শকপ্রতি আয় বেশি গুরুত্ব পায়। চলমান বিশ্বকাপেও মডেলটির প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে।
ইউরোপের ভিন্ন পথ
ইউরোপের ফুটবল অর্থনীতি ভিন্ন দর্শনের ওপর দাঁড়িয়ে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ফরাসি ক্লাব পিএসজির মাঠে গোলপোস্টের পেছনের গ্যালারির টিকিট তুলনামূলক কম মূল্য রাখা হয়। বিপরীতে করপোরেট আসনের দাম বেশি।
এর পেছনের ধারণা হলো, সাধারণ সমর্থকদের তৈরি আবহই করপোরেট দর্শকদের জন্য বড় আকর্ষণ। সেই আবহ হারিয়ে গেলে ফুটবলের প্রাণও ম্লান হয়ে যেতে পারে।
ইতিমধ্যে বিশ্বকাপের মূল্যনীতি নিয়ে প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। যেসব ম্যাচের চাহিদা কম, সেগুলোর পুনর্বিক্রয়মূল্য উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ৬২০ ডলারের দুটি টিকিট ফিফার পুনর্বিক্রয় প্ল্যাটফর্মে ১৭১ পাউন্ডে বিক্রি হয়েছে, যা মূল দামের তুলনায় ৬৪ শতাংশ কম।
নিউ জার্সির ৯৮ ডলারের ট্রেন টিকিটও প্রত্যাশিত হারে বিক্রি হয়নি। নিউইয়র্ক, নিউ জার্সি, ক্যালিফোর্নিয়া এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) কর্তৃপক্ষ টিকিটের মূল্য নির্ধারণের কৌশল নিয়ে ওঠা অভিযোগ খতিয়ে দেখছে।
নিউ জার্সির অ্যাটর্নি জেনারেল জেনিফার ডেভেনপোর্ট উদ্ভূত পরিস্থিতিকে ‘বিভ্রান্তি, কৃত্রিম সংকট আর অসম্ভব উচ্চমূল্যের জটিল গোলকধাঁধা’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
তবে সুইজারল্যান্ডভিত্তিক ‘অলাভজনক’ সংস্থার ওপর এই অঙ্গরাজ্যের এখতিয়ার রয়েছে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। এ বিষয়ে ফিফা অবশ্য কোনো মন্তব্য করেনি।
ভবিষ্যতের ইঙ্গিত
এখন প্রশ্ন হলো, টিকিটের মূল্য নিয়ে ফিফা কি এমন এক সীমায় পৌঁছেছে, যেখানে এই পরীক্ষার স্থায়িত্ব নিয়ে সংশয় তৈরি হতে পারে?
আগামী ২০৩০ সালের ফুটবল বিশ্বকাপ হবে স্পেন, পর্তুগাল ও মরক্কোয়। অনেকের ধারণা, ওই অঞ্চলের সমর্থকেরা এমন মূল্যনীতি সহজে গ্রহণ করবেন না। ইউরোপে এখনো গ্যালারির আবেগ, ঐতিহ্য ও সাধারণ সমর্থকের উপস্থিতিকে ফুটবল সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ বলে মনে করা হয়।
একই কারণে ব্রিটেন ও আয়ারল্যান্ড ২০২৮ সালে অনুষ্ঠেয় ইউরোর জন্য এ ধরনের মূল্যনীতি আগেভাগেই বাতিল করা হয়েছে।
এদিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) মূল্য নির্ধারণে আরও বড় পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি করছে। ভবিষ্যতে টিকিটের দাম সবার জন্য এক না–ও হতে পারে। ব্যক্তির তথ্য, আগ্রহ, কেনাকাটার অভ্যাস ও আর্থিক সক্ষমতার ভিত্তিতে আলাদা মূল্য নির্ধারণ করা হতে পারে।
অর্থাৎ ফিফার বর্তমান পরীক্ষা শুধু আজকের টিকিটমূল্য নিয়ে নয়; এটি ভবিষ্যতের এমন এক অর্থনৈতিক বাস্তবতার ইঙ্গিত, যেখানে একই ম্যাচের জন্য দুজন মানুষকে ভিন্ন মূল্য পরিশোধ করতে হতে পারে।

‘কে-আকৃতির’অর্থনীতি
বিশ্বকাপে এখন যুক্তরাষ্ট্রের এনএফএল অর্থনৈতিক মডেলের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে।
ঋণমান নির্ণয়কারী প্রতিষ্ঠান মিডিসের হিসাবে, যুক্তরাষ্ট্রে সবচেয়ে ধনী ১০ শতাংশ মানুষের ব্যয় মোট ভোক্তা ব্যয়ের প্রায় অর্ধেক। অন্যদিকে নিম্ন আয়ের মানুষের ব্যয় প্রায় স্থবির।
এই বৈষম্যমূলক ‘কে-আকৃতির অর্থনীতি’র প্রতিফলন বিশ্বকাপের গ্যালারিতেও দেখা যেতে পারে। ডায়নামিক প্রাইসিং মূলত উচ্চ আয়ের দর্শকদের লক্ষ্য করেই পরিচালিত হয়। এর ফলে যে ফুটবল একসময় গণমানুষের সমর্থন, উন্মাদনা ও অভিজ্ঞতার অংশ ছিল, সেটি ধীরে ধীরে উচ্চমূল্যের বিশেষ অভিজ্ঞতায় রূপ নিতে পারে।
বিশ্বকাপকে ঘিরে ভোক্তা আস্থা ও বিনিয়োগ বাড়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, স্বাগতিক দেশ ভালো করলে ইতিবাচক অর্থনৈতিক প্রভাব দেখা যায়, আর দল বিদায় নিলে শেয়ারবাজারে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে।
সাম্প্রতিক মার্কিন কর্মসংস্থানের তথ্য অনুযায়ী, আতিথেয়তা খাতে কয়েক হাজার নতুন কর্মসংস্থান হয়েছে, যার সঙ্গে বিশ্বকাপের সম্পর্ক রয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি এত বড় এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় বিনিয়োগ এত ব্যাপক যে সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রভাব তুলনামূলক সীমিতই থাকবে।
অন্যদিকে আয়োজক শহরগুলো টিকিট বিক্রির অর্থ থেকে সরাসরি কোনো অংশ পাচ্ছে না; সেই অর্থ যাচ্ছে ফিফার কাছে। কিছু শহরে হোটেল বুকিংও প্রত্যাশার তুলনায় কম।
তবে বিশ্বকাপকে ঘিরে ভোক্তা আস্থা বৃদ্ধির সুযোগ রয়েছে। ২০১৮ সালের বিশ্বকাপের সময় গবেষণা সংস্থা কান্তার হিসাব করেছিল, ঘরে বসে খেলা দেখার জন্য মানুষ অতিরিক্ত ১ কোটি ৩০ লাখবার সুপার মার্কেটে গিয়েছিল। যদিও গভীর রাতে ম্যাচ হলে উৎপাদনশীলতায় নেতিবাচক প্রভাবও পড়তে পারে।
সব মিলিয়ে টিকিটের দাম নিয়ে ফিফার এই বিতর্কিত পরীক্ষা ভবিষ্যতে ফুটবলের অর্থনীতিকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করতে পারে। একই সঙ্গে এই অস্বাভাবিক বিশ্বকাপ হয়তো বৈশ্বিক অস্থিরতা কিছুটা কমানোর ক্ষেত্রও তৈরি করতে পারে।
অবশ্য সেটি নিশ্চিত নয়। তবু এমন আশাই ফুটবলকে বাঁচিয়ে রাখবে, তেমনটাই আশা করা যায়।