যেজাতি আজ রাজনীতির বিভাজনে দুই শিবিরে বিভক্ত, ফুটবল তাদের আবারও এক কাতারে দাঁড় করালো। যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসের স্টেডিয়ামে একদিকে উড়েছে ইসলামিক রিপাবলিকের পতাকা, অন্যদিকে ১৯৭৯ সালের বিপ্লবপূর্ব ‘সিংহ ও সূর্য’ খচিত পতাকা। কিন্তু বল যখন টিম মেল্লির পায়ে, তখন সব পরিচয় ছাপিয়ে গ্যালারিজুড়ে শোনা গেছে একটাই শব্দ— ইরান, ইরান, ইরান….।
২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ইরানের ২–২ গোলের ড্র শুধু একটি ম্যাচের ফল নয়। এটি ছিল বিভক্ত এক জাতির আবেগের প্রতিচ্ছবি। খেলা শুরুর আগে স্টেডিয়ামের বাইরে ছিল বিক্ষোভ। রাজনৈতিক স্লোগান আর মতাদর্শের সংঘাত। একপক্ষ বর্তমান শাসনব্যবস্থার সমর্থক, অন্যপক্ষ তার কট্টর বিরোধী। কিন্তু মাঠের ভেতরে ঢুকতেই যেন বদলে যায় দৃশ্যপট।
ম্যাচ দেখতে নিউইয়র্ক থেকে আসা ইরানি সমর্থক পারসা তাফরেশি বলেছিলেন, ‘আজ আমরা একটা গোল করতে পারলে সবাই উল্লাস করব।’ শেষ পর্যন্ত তার কথাই সত্যি হয়। ইরান গোল করার সঙ্গে সঙ্গেই হাজারো দর্শক একযোগে আনন্দে ফেটে পড়ে। কার হাতে কোন পতাকা, কার রাজনৈতিক বিশ্বাস কী— সেই হিসাব আর কেউ রাখেনি।
ফুটবলের এই শক্তিটাই হয়তো এটিকে পৃথিবীর সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলায় পরিণত করেছে। যেখানে ভাষা, সংস্কৃতি কিংবা রাজনৈতিক মতভেদ ভুলে মানুষ একটি জার্সির জন্য এক হয়ে যায়। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচটিতে দুইবার পিছিয়ে পড়েও লড়াই করে সমতায় ফিরেছে ইরান। গুরুত্বপূর্ণ দুই পয়েন্ট হারানোর আক্ষেপ থাকলেও সমর্থকদের কাছে বড় প্রাপ্তি ছিল অন্য কিছু।
যুদ্ধ, অভিবাসন আর দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতার ভেতর দিয়ে যাওয়া লাখো ইরানির জন্য রাতটি ছিল একটুকরো স্বস্তি আর আত্মপরিচয়ের উদযাপন। স্টেডিয়ামের বাইরে হয়তো ছিল দুই মেরুর রাজনীতি। কিন্তু মাঠের ভেতরে ছিল একটাই অনুভূতি, নিজের দেশের জন্য ভালোবাসা। লস অ্যাঞ্জেলেসে উড়েছিল দুটি পতাকা। কিন্তু ইরান গোল করতেই গর্জে উঠেছিল একটি জাতির হৃদস্পন্দন।