পাকিস্তানকে ২-০ ব্যবধানে হারিয়ে বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের (ডব্লিউটিসি) চলতি চক্রে যে স্বপ্নটা বাংলাদেশ দেখতে শুরু করেছে, সেটি এখন আর নিছক কল্পনা নয়! চার টেস্টে দুই জয়, এক হার ও এক ড্রয়ে ৫৮.৩৩ শতাংশ পয়েন্ট নিয়ে নাজমুল হোসেন শান্তর দল এখন তালিকার চতুর্থ স্থানে। তবে স্বপ্নের ঠিক পরেই দাঁড়িয়ে আছে কঠিন বাস্তবতা। সামনে বাংলাদেশের বাকি আট টেস্টের চারটিই দেশের বাইরে, প্রতিপক্ষ অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকা!
১৩ আগস্ট অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে দুই ম্যাচের সিরিজ দিয়ে শুরু হচ্ছে সেই কঠিন অধ্যায়। ডব্লিউটিসির চলতি চক্রে এখন পর্যন্ত আট টেস্টে সাত জয় নিয়ে ৮৭.৫০ শতাংশ পয়েন্টে সবার ওপরে অস্ট্রেলিয়া। এমন দলের বিপক্ষে তাদেরই মাটিতে সিরিজ-বাংলাদেশের জন্য এটি শুধু আরেকটি সিরিজ নয়, ফাইনালের দৌড়ে নিজেদের অবস্থান যাচাইয়ের বড় পরীক্ষা।
বাংলাদেশের হাতে এখনো আটটি টেস্ট। ঘরের মাঠে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও ইংল্যান্ডের বিপক্ষে চারটি, আর বিদেশে অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে চারটি। কাগজে-কলমে পথটা খুব কঠিন মনে না হলেও বাস্তবতা বলছে, ফাইনালে যেতে হলে প্রায় প্রতিটি ম্যাচেই পয়েন্ট কুড়াতে হবে।
গত দুই চক্রের হিসাব অন্তত তেমনই ইঙ্গিত দেয়। সর্বশেষ চার ফাইনালিস্টের মধ্যে তিন দলই ৬৫ শতাংশের বেশি পয়েন্ট নিয়ে ফাইনালে উঠেছে। ২০২৫ সালের ফাইনালিস্ট দক্ষিণ আফ্রিকা ও অস্ট্রেলিয়ার পয়েন্ট ছিল যথাক্রমে ৬৯.৪৪ ও ৬৭.৫৪ শতাংশ। এর আগে ২০২৩ সালে ভারত ৫৮.৮ শতাংশ পয়েন্ট নিয়েও ফাইনালে উঠেছিল। অর্থাৎ ৬০ শতাংশের আশপাশে থাকলে আশা বেঁচে থাকতে পারে, কিন্তু নিশ্চয়তা পাওয়া যায় না।
বাংলাদেশ অবশ্য প্রথম লক্ষ্য হিসেবে ৬০ শতাংশকে ধরতেই পারে। এই সীমায় পৌঁছানোর সমীকরণও খুব দুরূহ নয়। ঘরের মাঠে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও ইংল্যান্ডের বিপক্ষে চারটি টেস্টই জিতলে অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে অন্তত একটি জয়ই যথেষ্ট হতে পারে। বিদেশে জয় না পেলেও অন্য একটি পথ খোলা আছে-ঘরের চার টেস্ট জয়ের সঙ্গে অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে তিনটি ড্র। তাতেও বাংলাদেশ ৬০ শতাংশে পৌঁছে যাবে।
কিন্তু এখানেই আসল প্রশ্ন-৬০ শতাংশ কি ফাইনালে ওঠার জন্য যথেষ্ট হবে?
উত্তরটা সম্ভবত ‘না’। গত দুই চক্রের প্রবণতা অন্তত সে কথাই বলে। ফলে বাংলাদেশকে শুধু ৬০ শতাংশে পৌঁছানোর হিসাব করলে হবে না, ফাইনালে জায়গা নিশ্চিত করার মতো শক্ত অবস্থানও তৈরি করতে হবে। আর সেখানেই বিদেশের চার টেস্ট সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
বাংলাদেশের জন্য আশার জায়গা হলো, চলতি চক্রের শুরুটা হয়েছে দুর্দান্তভাবে। পাকিস্তানের বিপক্ষে ২-০ সিরিজ জয় দলকে শুধু মূল্যবান পয়েন্টই দেয়নি, ফাইনালের দৌড়েও এনে দিয়েছে। কিন্তু সামনে প্রতিপক্ষের মান এক লাফে অনেক বেড়ে যাচ্ছে। অস্ট্রেলিয়ার পর দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে খেলতে হবে। দুই দলেরই নিজেদের ঘরের মাঠে শক্তিশালী রেকর্ড। ফলে বাংলাদেশের ফাইনাল-যাত্রার আসল গল্প লেখা হতে পারে বিদেশের মাটিতেই!
অন্যদিকে তালিকার শীর্ষে থাকা অস্ট্রেলিয়াও এখনো নিশ্চিন্ত নয়। আট টেস্টে সাত জয় পাওয়া দলটির হাতে আরও ১৪ টেস্ট। বাংলাদেশের বিপক্ষে ঘরের মাঠের সিরিজের পর দক্ষিণ আফ্রিকা সফর, এরপর নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ঘরের সিরিজ এবং সবশেষে ভারতের মাটিতে পাঁচ টেস্ট। বিশেষ করে ভারত সফর অস্ট্রেলিয়ার জন্য বড় পরীক্ষা হতে পারে। ২০০৮ সালের পর ভারতে খেলা শেষ ১২ টেস্টে অস্ট্রেলিয়া জিতেছে মাত্র দুটিতে।
দক্ষিণ আফ্রিকা রয়েছে ৭৫ শতাংশ পয়েন্ট নিয়ে বাংলাদেশের ওপরে। চার টেস্টে তিন জয় পাওয়া দলটির বাকি ১০ টেস্টের আটটিই ঘরের মাঠে। অস্ট্রেলিয়া, বাংলাদেশ, ইংল্যান্ড ও শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে সেই ম্যাচগুলো দক্ষিণ আফ্রিকাকে ফাইনালের দৌড়ে বাড়তি সুবিধা দিচ্ছে। ৬০ শতাংশে যেতে তাদের আর খুব বেশি পথ পাড়ি দিতে হবে না।
নিউজিল্যান্ডও এখন সুবিধাজনক অবস্থানে। ছয় টেস্টে চার জয়, এক হার ও এক ড্রয়ে তাদের পয়েন্ট ৭২.২২ শতাংশ। সামনে ভারত ও শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ঘরের সিরিজ, আর অস্ট্রেলিয়া ও পাকিস্তানের বিপক্ষে বিদেশের ম্যাচ। তাদের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হতে পারে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে চার টেস্টের সিরিজ।
বাংলাদেশের ঠিক ওপরে থাকা এই দলগুলোর দিকে তাকালে বোঝা যায়, ফাইনালের দৌড় কতটা কঠিন। কারণ শুধু নিজের ম্যাচ জেতাই যথেষ্ট নয়, প্রতিদ্বন্দ্বীদেরও পয়েন্ট হারাতে হবে। এই জায়গায় বাংলাদেশের বড় সুবিধা হতে পারে অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা ও ভারতের মতো দলের পারস্পরিক লড়াই। একে অন্যের বিপক্ষে পয়েন্ট হারালে তালিকার মাঝের দলগুলোর জন্য সুযোগ তৈরি হবে।
ভারত অবশ্য এখন বাংলাদেশের পেছনে, ৯ টেস্টে চার জয়, চার হার ও এক ড্রয়ে তাদের পয়েন্ট ৪৮.১৫ শতাংশ। কিন্তু তাদের সামনে এখনো নয়টি টেস্ট। শ্রীলঙ্কা ও নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে বিদেশের সিরিজের পর ঘরের মাঠে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে পাঁচ টেস্ট। সাম্প্রতিক সময়ে ঘরের মাঠে ভারতের পারফরম্যান্সে ধাক্কা এলেও অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে দীর্ঘ সময়ের রেকর্ড তাদের আত্মবিশ্বাসী রাখতেই পারে। ২০০৮ সালের পর শেষ পাঁচ সিরিজে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ভারতের জয়-হারের হিসাব ১২-২।
শ্রীলঙ্কাও এখনো পুরোপুরি হিসাবের বাইরে নয়। চার টেস্টে ৪১.৬৭ শতাংশ পয়েন্ট নিয়ে তাদের সামনে বাকি আট ম্যাচ। ভারত, পাকিস্তান, নিউজিল্যান্ড ও দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে সেই ম্যাচগুলোতে বড় সাফল্য পেলে তারা আবারও দৌড়ে ফিরতে পারে।
ইংল্যান্ড, পাকিস্তান ও ওয়েস্ট ইন্ডিজের পরিস্থিতি অবশ্য অনেকটাই ভিন্ন। ১৩ টেস্টে চার জয়, আট হার ও এক ড্রয়ে ইংল্যান্ডের পয়েন্ট মাত্র ২৪.৩৬ শতাংশ। ধীর ওভার রেটের কারণে ১৪ পয়েন্ট হারানোও তাদের অবস্থানকে আরও কঠিন করেছে। বাকি আট টেস্টের সবগুলো জিতলেও তাদের সর্বোচ্চ পয়েন্ট দাঁড়াবে ৫৩.১৭ শতাংশ। ফলে ফাইনালে ওঠার সম্ভাবনা কার্যত ক্ষীণ।
পাকিস্তানের অবস্থাও স্বস্তিদায়ক নয়। ছয় টেস্টে দুই জয় ও চার হারের সঙ্গে আট পয়েন্টের শাস্তি পেয়েছে তারা। সামনে সাত টেস্ট! সবগুলো জিতলেও সর্বোচ্চ ৬৪.১ শতাংশে উঠতে পারবে দলটি। অর্থাৎ তাত্ত্বিকভাবে সুযোগ থাকলেও বাস্তবে তাদের সামনে প্রায় নিখুঁত একটি পথ দরকার।
আর ওয়েস্ট ইন্ডিজের জন্য ফাইনালের দরজা প্রায় বন্ধ। ১২ টেস্টে মাত্র দুই জয়, আট হার ও দুই ড্রয়ে তাদের পয়েন্ট ২০.৮৩ শতাংশ। বাকি দুই টেস্টই বাংলাদেশের বিপক্ষে। দুটিতে জিতলেও সর্বোচ্চ ৩২.১৪ শতাংশে পৌঁছাতে পারবে তারা।
ডব্লিউটিসিতে অবশ্য মোট পয়েন্টের চেয়ে পয়েন্টের শতাংশই আসল। জয় পেলে ১২ পয়েন্ট, ড্রয়ে দুই দল চার পয়েন্ট করে এবং টাই হলে ছয় পয়েন্ট করে পায়। কিন্তু ভিন্ন দলের ভিন্ন সংখ্যক ম্যাচ থাকায় মোট পয়েন্ট দিয়ে অবস্থান বিচার করা হয় না। ম্যাচ অনুযায়ী অর্জিত পয়েন্টের শতাংশই ঠিক করে দেয় কে কতটা এগিয়ে। শেষ পর্যন্ত সেই তালিকার শীর্ষ দুই দলই খেলবে ফাইনাল।
২০২৭ সালের ৯ থেকে ১৩ জুন দ্য ওভালে হবে সেই ফাইনাল। এখনো ২৭ সিরিজের মধ্যে ১৫ সিরিজ বাকি। অর্থাৎ লড়াইয়ের বড় অংশটাই এখনো সামনে। বাংলাদেশের জন্য সেই লড়াইয়ের শুরুটা অস্ট্রেলিয়াকে দিয়ে।
বাংলাদেশের সামনে এখন মূল প্রশ্ন একটাই- ৫৮.৩৩ শতাংশ থেকে কতটা ওপরে উঠতে পারবে তারা? উত্তরটা মিলবে আগামী আট টেস্টে। আর সেই উত্তরের প্রথম অধ্যায় শুরু হবে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে!
এসএন/পিডিকে