বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা, সম্পদ জব্দ ও নৌ অবরোধের মুখে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে নতুন করে চরম অর্থনৈতিক বিধিনিষেধ আরোপের হুমকি দেওয়া হলেও অটল থাকার ঘোষণা দিয়েছে ইরান। ওয়াশিংটনের সম্ভাব্য নজিরবিহীন নিষেধাজ্ঞা ও অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে নিজেদের অর্থনীতিকে সচল ও স্থিতিশীল রাখতে পাল্টা প্রস্তুতি নিচ্ছে তেহরান। খবর আল জাজিরার।
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট গত বৃহস্পতিবার জানান, চলতি সপ্তাহের মধ্যেই তেহরানের ওপর এমন অর্থনৈতিক আঘাত হানা হবে যা কোনো দেশকে বিচ্ছিন্ন করার ইতিহাসে আগে কখনও দেখা যায়নি।
পরদিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও একই সুর মিলিয়ে বলেন, ইরান মারাত্মক অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখোমুখি হতে যাচ্ছে। সোমবার (১৭ আগস্ট) দুদেশের মধ্যকার সমঝোতা স্মারকের (এমওইউ) মেয়াদ শেষ হওয়ার পর ট্রাম্প তেহরানকে ‘আত্মসমর্পণের জন্য সাদা পতাকা’ তোলার আহ্বান জানান।
ট্রেজারির অফিস অব ফরেন অ্যাসেটস কন্ট্রোল (ওফ্যাক) সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে ওয়াশিংটন ইরান সংক্রান্ত এক হাজারেরও বেশি ব্যক্তি, জাহাজ ও বিমানের ওপর অলরেডি নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে।
এই চরম পরিস্থিতির মুখেও পিছু হটতে নারাজ ইরান। দেশটির কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনে আক্রমণাত্মক সামরিক অভিযানে যাওয়ার পাশাপাশি সম্ভাব্য স্থল আক্রমণ মোকাবেলার প্রস্তুতি নিচ্ছ।
জার্মানির মারবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যপ্রাচ্য অর্থনীতিবিষয়ক অধ্যাপক মোহাম্মদ রেজা ফারজানেগান জানান, নৌ অবরোধের ফলে ইরানের অর্থনীতিতে পণ্যের ঘাটতি তৈরি করতে সামরিক শক্তি ও নিষেধাজ্ঞার যৌথ ব্যবহার দেখা যাচ্ছে। তবে তেহরান ট্রাম্পের শর্ত মেনে নেওয়ার চেয়ে সংঘাত চালিয়ে যাওয়ার পথেই হাঁটছে বলে মনে হচ্ছে।
অধ্যাপক রেজা ফারজানেগান বলেন, এই সংঘাত পুরোদমে শুরু হলে হরমুজ প্রণালিতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির মাধ্যমে পুরো বিশ্ব অর্থনীতিকে চরম খেসারত দিতে হবে।
এদিকে ওমান ও অন্যান্য মধ্যস্থতাকারীদের আলোচনার মধ্যেও হরমুজ প্রণালি বন্ধ রাখার ব্যাপারে অবস্থান কড়া করেছে তেহরান।
ইরানের সংসদ স্পিকার ও শীর্ষ আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবফ মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) জানান, যুক্তরাষ্ট্র তাদের ওপর থেকে সব ধরনের অবরোধ ও তেল নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং সামরিক হুমকি বন্ধ না করা পর্যন্ত আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের এই গুরুত্বপূর্ণ পথটি বন্ধই থাকবে।
মার্কিন অবরোধ কাটাতে ইরান এখন পাকিস্তান, তুরস্কসহ প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে স্থল সীমান্ত এবং রাশিয়া ও মধ্য এশিয়ার সঙ্গে কাস্পিয়ান সাগরের মাধ্যমে খাদ্য, ভোগ্যপণ্য ও শিল্প সামগ্রীর আমদানি সচল রাখার ওপর জোর দিচ্ছে।
ইরানের প্রায় ৯ কোটি মানুষ দীর্ঘদিন ধরে দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা ও আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতার কারণে উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি ও ক্রয়ক্ষমতা হ্রাসের শিকার। এই পরিস্থিতিতে দেশটির নতুন প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের প্রশাসন আগামী দুই বছরের জন্য বাজার স্থিতিশীল রাখা ও জাতীয় অর্থনীতি সচল রাখাকে প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে ঘোষণা করেছে।
তবে অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাত কমিয়ে আনা ছাড়া তেহরানের পক্ষে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্থায়িত্ব অর্জন করা কঠিন হবে।