২০৩০ সালের ফিফা বিশ্বকাপ শুরু হতে এখনও চার বছর বাকি। মাঠে কোন দল চ্যাম্পিয়ন হবে, তা নিয়ে আলোচনা শুরু হওয়ারও সময় আসেনি। কিন্তু এরই মধ্যে সবচেয়ে বেশি আগ্রহ তৈরি হয়েছে অন্য একটি প্রশ্ন ঘিরে-বিশ্বকাপের ফাইনাল কোথায় হবে?
ফিফা এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানায়নি। তবে আয়োজক দেশগুলোর নেপথ্যে চলছে তীব্র হিসাব-নিকাশ। একদিকে স্পেনের ঐতিহ্যবাহী সান্তিয়াগো বার্নাব্যু ও সংস্কারাধীন ক্যাম্প ন্যু, অন্যদিকে মরক্কোর নির্মাণাধীন ১ লাখ ১৫ হাজার দর্শক ধারণক্ষমতার গ্র্যান্ড হাসান স্টেডিয়াম। বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ম্যাচের মঞ্চ হওয়ার দৌড়ে এখন এই তিন স্টেডিয়ামই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।
২০৩০ বিশ্বকাপ এমনিতেই ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যতিক্রমী আয়োজন হতে যাচ্ছে। বিশ্বকাপের শতবর্ষ উপলক্ষে প্রথমবারের মতো টুর্নামেন্ট ছড়িয়ে পড়বে তিন মহাদেশের ছয়টি দেশে। উদ্বোধনী তিন ম্যাচ হবে উরুগুয়ে, আর্জেন্টিনা ও প্যারাগুয়েতে। এরপর মূল পর্বের বাকি ম্যাচগুলো অনুষ্ঠিত হবে স্পেন, পর্তুগাল ও মরক্কোতে। ১৯৩০ সালের প্রথম বিশ্বকাপের স্মৃতিকে সম্মান জানাতেই এমন ব্যতিক্রমী পরিকল্পনা নিয়েছে ফিফা।
তবে শতবর্ষের এই আয়োজনের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ম্যাচটি কোথায় হবে, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় রহস্য। প্রথম দিকে ধারণা ছিল, ফাইনাল আয়োজনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে এগিয়ে থাকবে সান্তিয়াগো বার্নাব্যু। সম্প্রতি আধুনিকায়নের মাধ্যমে নতুন রূপ পেয়েছে রিয়াল মাদ্রিদের এই স্টেডিয়াম। প্রায় ৮৪ হাজার দর্শক ধারণক্ষমতার পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তি, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং বড় ইভেন্ট আয়োজনের অভিজ্ঞতা বার্নাব্যুকে স্বাভাবিকভাবেই শক্তিশালী প্রার্থী করে তুলেছে।
অন্যদিকে সংস্কার শেষে বার্সেলোনার ক্যাম্প ন্যুতে একসঙ্গে বসতে পারবেন প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার দর্শক। ফলে ধারণক্ষমতার দিক থেকেও সেটি বিশ্বের অন্যতম বড় ফুটবল স্টেডিয়ামে পরিণত হবে।
কিন্তু এই সমীকরণ বদলে দিতে চাইছে মরক্কো। দেশটির বেনসলিমানে নির্মাণাধীন গ্র্যান্ড হাসান স্টেডিয়াম শেষ হলে একসঙ্গে প্রায় ১ লাখ ১৫ হাজার দর্শক খেলা দেখতে পারবেন। এটি শুধু আফ্রিকার নয়, বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ফুটবল স্টেডিয়ামে পরিণত হবে। প্রায় ৫০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয়ে নির্মিত এই স্টেডিয়ামকে ঘিরেই মরক্কো এখন বিশ্বকাপ ফাইনাল আয়োজনের স্বপ্ন দেখছে।
শুধু নতুন স্টেডিয়াম নয়, বিশ্বকাপকে সামনে রেখে অবকাঠামো উন্নয়নেও বড় বিনিয়োগ করছে উত্তর আফ্রিকার দেশটি। ট্যাঙ্গিয়ার, কাসাব্লাঙ্কা, রাবাত, আগাদির, মারাকেশ ও ফেজের স্টেডিয়ামগুলোও আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে বিপুল অর্থ ব্যয় করা হচ্ছে। সব মিলিয়ে স্টেডিয়াম উন্নয়নেই মরক্কোর বিনিয়োগ এক বিলিয়ন ডলারের বেশি।
মরক্কোর এই আগ্রাসী প্রস্তুতি বিশ্বকাপের ফাইনাল নিয়ে নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে। ব্রাজিলিয়ান সংবাদমাধ্যম গ্লোবো জানিয়েছে, নেপথ্যে একটি সমঝোতার সম্ভাবনাও আলোচনা হচ্ছে। সেই পরিকল্পনায় ফাইনাল হতে পারে সান্তিয়াগো বার্নাব্যুতে, আর একটি সেমিফাইনাল আয়োজন করবে মরক্কোর গ্র্যান্ড হাসান স্টেডিয়াম। এর বিনিময়ে ২০২৯ সালের ক্লাব বিশ্বকাপ আয়োজনের সুযোগ পেতে পারে মরক্কো।
অন্যদিকে স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যমগুলো দাবি করছে, মরক্কোকে ফাইনাল পাইয়ে দিতে বিভিন্ন মহলে জোরালো লবিং চলছে। এমনকি স্পেন ফাইনালের দাবিতে প্রত্যাশিতভাবে সক্রিয় না হওয়ায় ফিফাও বিস্মিত-এমন আলোচনাও সামনে এসেছে।
স্পেন অবশ্য শুধু ঐতিহ্যের ওপর ভরসা করছে না। তাদের বড় শক্তি রিয়াল মাদ্রিদের সভাপতি ফ্লোরেন্তিনো পেরেজ। আন্তর্জাতিক ফুটবলের প্রশাসনিক মহলে তাঁর প্রভাব এবং ফিফার সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক বার্নাব্যুর পক্ষে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে বলেই মনে করা হচ্ছে। বিশেষ করে ক্লাব বিশ্বকাপ নিয়ে ইউরোপীয় ক্লাবগুলোর আপত্তি কমাতে তাঁর ভূমিকা ফিফার কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
এদিকে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যম মার্কা দাবি করেছিল, ২০৩০ বিশ্বকাপের ফাইনাল বার্নাব্যুতেই হবে এবং এ বিষয়ে পর্তুগাল ও মরক্কোরও সম্মতি রয়েছে। তবে সেই খবরের কোনো আনুষ্ঠানিক নিশ্চিতকরণ এখনো আসেনি।
ফাইনাল ভেন্যুর আলোচনা চললেও বিশ্বকাপের কাঠামো নিয়েও নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ২০২৬ সালের মতো ২০৩০ সালেও ৪৮টি দল অংশ নেওয়ার কথা থাকলেও ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো ভবিষ্যতে দলসংখ্যা ৬৪-তে উন্নীত করার সম্ভাবনার কথাও জানিয়েছেন। ফলে শতবর্ষের বিশ্বকাপ শুধু আয়োজনের দিক থেকেই নয়, কাঠামোগত পরিবর্তনের দিক থেকেও নতুন ইতিহাসের সাক্ষী হতে পারে।
এসএন/পিডিকে