অনলাইন নিরাপত্তা নিশ্চিতে প্রযুক্তি ব্যবহারের পাশাপাশি সচেতনতা বাড়ানোর আহ্বান

একটি ভুল ক্লিক, একটি অসতর্কভাবে শেয়ার করা তথ্য কিংবা অপরিচিত কারও সঙ্গে গোপনে আদান-প্রদান করা একটি ওটিপি মুহূর্তেই তৈরি করতে পারে বড় ধরনের আর্থিক, সামাজিক ও ব্যক্তিগত ঝুঁকি। প্রযুক্তিনির্ভর জীবনে এ ধরনের ঝুঁকি মোকাবিলায় সচেতনতা ও দায়িত্বশীল ডিজিটাল আচরণকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হল অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠিত হয়েছে সাইবার সচেতনতা বৃদ্ধি কর্মসূচি। 

বাংলাদেশ পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) সাইবার পুলিশ সেন্টার (সিপিসি) এ কর্মসূচির আয়োজন করে। সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হল কর্তৃক আয়োজিত এবং বিকাশ লিমিটেডের পৃষ্ঠপোষকতায় অনুষ্ঠিত এ কর্মসূচিতে রোকেয়া হলের স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শ্রেণীর ছাত্রীরা অংশগ্রহণ করেন।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন রোকেয়া হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. হোসনে আরা বেগম।

প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সাইবার পুলিশ সেন্টার (সিপিসি), সিআইডির ডিআইজি (ভারপ্রাপ্ত) মো. সাইফুদ্দিন শাহীন। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সাইবার ইনভেস্টিগেশন অ্যান্ড অপারেশনস, সিপিসি, সিআইডির অতিরিক্ত ডিআইজি মো. জাহিদুল ইসলাম। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন বিকাশ লিমিটেডের এক্সটার্নাল অ্যাফেয়ার্স বিভাগের এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট ও প্রধান এ কে এম মনিরুল করিম।

অনুষ্ঠানে বিশেষভাবে গুরুত্ব পায় সাইবার হয়রানি বা সাইবার হ্যারাসমেন্ট, অনলাইন ব্ল্যাকমেইল, পরিচয় জালিয়াতি, ব্যক্তিগত তথ্যের অপব্যবহার, ভুয়া লিংক ও অনলাইন প্রতারণার মতো বিভিন্ন সাইবার অপরাধ। 

বক্তারা বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের ব্যবহার যত বাড়ছে, ততই এর অপব্যবহারের ঝুঁকিও বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষ করে নারী ও তরুণদের ব্যক্তিগত তথ্য, ছবি ও পরিচয়কে কেন্দ্র করে বিভিন্ন ধরনের হয়রানি ও প্রতারণার ঘটনা ঘটতে পারে। তাই অনলাইন নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রযুক্তি ব্যবহারের পাশাপাশি সচেতন ও দায়িত্বশীল আচরণ গড়ে তোলা জরুরি।

সভাপতির বক্তব্যে অধ্যাপক ড. হোসনে আরা বেগম বলেন, “শিক্ষার্থীরা যাতে সাইবার জগতে নিরাপদে চলাচল করতে পারে এবং কোনও ধরনের হয়রানির শিকার হলে নির্দ্বিধায় প্রতিবাদ ও অভিযোগ জানাতে পারে, সে জন্য হল প্রশাসন সবসময় তাদের পাশে থাকবে।” তিনি এ ধরনের সচেতনতামূলক কর্মসূচির জন্য সিআইডিকে ধন্যবাদ জানান এবং শিক্ষার্থীদের অর্জিত জ্ঞান নিজেদের পাশাপাশি পরিবার ও বন্ধুদের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার আহ্বান জানান।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে ডিআইজি (ভারপ্রাপ্ত) মো. সাইফুদ্দিন শাহীন বলেন, “বর্তমান প্রজন্ম একই সঙ্গে বাস্তব ও ডিজিটাল দুই জগতেই বসবাস করছে। প্রযুক্তির বিস্তার মানুষের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করলেও এর সঙ্গে সৃষ্টি হয়েছে নতুন ধরনের ঝুঁকি ও অপরাধ। তাই প্রযুক্তি ব্যবহারের পাশাপাশি এর নিরাপদ ব্যবহার সম্পর্কেও সমানভাবে সচেতন হতে হবে।” তিনি বলেন, “সচেতনতাই সাইবার নিরাপত্তার প্রথম ও প্রধান হাতিয়ার এবং সাইবার অপরাধ প্রতিরোধ ও দমনে সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টার সার্বক্ষণিক কাজ করে যাচ্ছে।” 

তিনি শিক্ষার্থীদের শক্তিশালী পাসওয়ার্ড ব্যবহারের পাশাপাশি ওটিপি ও পিন নম্বর গোপন রাখা, অপরিচিত লিংকে ক্লিক না করা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অতিরিক্ত ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ না করা এবং কোনও তথ্য যাচাই না করে শেয়ার না করার পরামর্শ দেন। একই সঙ্গে অনলাইন বুলিং, সাইবার হয়রানি, ব্ল্যাকমেইল বা প্রতারণার শিকার হলে দ্রুত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তা নেওয়ার আহ্বান জানান।

মূল প্রবন্ধে অতিরিক্ত ডিআইজি মো. জাহিদুল ইসলাম বলেন, “বর্তমান প্রজন্মের শিক্ষা, যোগাযোগ, বিনোদন ও দৈনন্দিন কার্যক্রমের একটি বড় অংশই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মকে কেন্দ্র করে পরিচালিত হচ্ছে। ফলে সাইবার নিরাপত্তা এখন আর শুধু প্রযুক্তিবিদদের আলোচনার বিষয় নয়; এটি প্রতিটি শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও নাগরিকের জন্য অপরিহার্য জীবনদক্ষতায় পরিণত হয়েছে।” 

তিনি বলেন, “সাইবার অপরাধীরা অনেক সময় প্রযুক্তির দুর্বলতার চেয়ে মানুষের অসতর্কতাকেই বেশি কাজে লাগায়। একটি ওটিপি শেয়ার করা, অপরিচিত লিংকে ক্লিক করা অথবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অতিরিক্ত ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ একজন মানুষকে বড় ধরনের আর্থিক ও সামাজিক ক্ষতির মুখে ফেলতে পারে। তাই সচেতনতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং তথ্য যাচাইয়ের অভ্যাসই সাইবার নিরাপত্তার প্রথম ও কার্যকর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা।” তিনি শিক্ষার্থীদের শুধু প্রযুক্তির ব্যবহারকারী নয়, বরং একটি নিরাপদ ও দায়িত্বশীল ডিজিটাল সমাজ গঠনের অগ্রদূত হিসেবে গড়ে ওঠার আহ্বান জানান।

তিনি আরও বলেন, “সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপতথ্য ও গুজব দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই কোনও তথ্যের সত্যতা যাচাই না করে তা শেয়ার না করা এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারে দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেওয়া প্রত্যেক ডিজিটাল নাগরিকের কর্তব্য। একজন সচেতন শিক্ষার্থী শুধু নিজেকে নয়, পরিবার, বন্ধু ও আশপাশের মানুষকেও সাইবার ঝুঁকি থেকে সুরক্ষিত রাখতে ভূমিকা রাখতে পারে।” 

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বিকাশ লিমিটেডের এক্সটার্নাল অ্যাফেয়ার্স বিভাগের এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট ও প্রধান এ কে এম মনিরুল করিম ডিজিটাল আর্থিক লেনদেনে সচেতনতার গুরুত্ব তুলে ধরেন।

তিনি বলেন, “ডিজিটাল আর্থিক সেবার প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে প্রতারণার নতুন নতুন কৌশলও দেখা দিচ্ছে। তবে সচেতনতা ও সঠিক তথ্য জানার কারণে এসব প্রতারণার ঝুঁকি অনেকাংশেই মোকাবিলা করা সম্ভব।” এ ধরনের সচেতনতামূলক অনুষ্ঠানে সঙ্গী হওয়ার জন্য সিআইডিকে ধন্যবাদ জানান তিনি।

অনুষ্ঠানে বক্তারা ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষা, শক্তিশালী পাসওয়ার্ড ব্যবহার, ওটিপি ও পিন নম্বর কারও সঙ্গে শেয়ার না করা, অপরিচিত লিংক ও সন্দেহজনক বার্তা এড়িয়ে চলা, অনলাইন পরিচিতির ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা এবং সাইবার হয়রানি বা প্রতারণার ঘটনা ঘটলে দ্রুত সাইবার পুলিশ সেন্টার অথবা নিকটস্থ থানায় অভিযোগ জানানোর পরামর্শ দেন।

অনুষ্ঠান শেষে উপস্থিত ছাত্রীরা সাইবার নিরাপত্তা, অনলাইন হয়রানি, ডিজিটাল প্রতারণা ও ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন করেন। অতিথিবৃন্দ এসব  প্রশ্নের উত্তর দেন এবং নিরাপদ ডিজিটাল আচরণ সম্পর্কে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা প্রদান করেন।

এসএন/পিডিকে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *