রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, বিভেদ, প্রতিহিংসা ও প্রতিশোধ কোনো জাতিকে শক্তিশালী করে না। অতীতের কর্তৃত্ববাদ ও অন্যায় যেন আর কখনো ফিরে না আসে, সেজন্য রাসুল (সা.)-কে অনুসরণ এবং ধর্মের শান্তি, ন্যায় ও সম্প্রীতির মর্মবাণীকে হৃদয়ে ধারণ করে গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার, সুশাসন ও মানুষের মৌলিক অধিকার রক্ষায় আমাদের ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।
আজ মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদে পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে সিরাতুন্নবী (সা.) অনুষ্ঠানের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন রাষ্ট্রপতি।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) সারা বিশ্বের মুসলমানদের জন্য অত্যন্ত পবিত্র ও মহামান্বিত সময়। এই মহৎ ও পবিত্র অনুষ্ঠানে উপস্থিত হতে পেরে আমি মহান রাব্বুল আলামিনের দরবারে অশেষ শুকরিয়া আদায় করছি। সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানব, বিশ্ব মানবতার মুক্তির দূত, আমাদের প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) এর প্রতি জানাই অগণিত সালাম ও দরুদ। একই সঙ্গে ইসলামের সব নবী ও রসুল (সা.) এর পরিবার পরিজন, সাহাবায়ে কেরাম, তাবে তাবেঈন, সব মুমিন মুসলমানের রুহের মাগফিরাত ও শান্তি কামনা করছি।
রাষ্ট্রপতি বলেন, মহান আল্লাহ তাআলা মানব জাতির হেদায়েত, মুক্তি ও কল্যাণের জন্য সর্বশেষ নবী ও রাসুল হজরত মুহাম্মদ (সা.)-কে পৃথিবীতে প্রেরণ করেছেন। তার আগমন মানব সভ্যতার ইতিহাসে এক অনন্য ও অবিস্মরণীয় ঘটনা। তিনি সমগ্র বিশ্বের জন্য রহমতস্বরূপ। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, আমি আপনাকে সমগ্র বিশ্বজগতের জন্য রহমতস্বরূপ প্রেরণ করেছি (সূরা আল আম্বিয়া : আয়াত ১০৭)। হজরত মুহাম্মদ (সা.) এর জীবন ও আদর্শ বিশ্ব মানবতার জন্য চিরন্তন পথনির্দেশ। তার চরিত্রে সত্যবাদিতা, ন্যায়পরায়ণতা, ক্ষমাশীলতা, সহনশীলতা, মানবিকতা ও পরম মমত্ববোধের অনন্য সমন্বয় ঘটেছিল। দরিদ্র, এতিম, অসহায় ও নিপীড়িত মানুষের প্রতি তিনি ছিলেন মমতাশীল। নারী, শিশু, প্রতিবেশী ও মেহনতি মানুষের অধিকার আদায়ে তিনি দিয়ে গেছেন সুস্পষ্ট নির্দেশনা। তিনি মানুষকে শিখিয়েছেন ধর্ম, বর্ণ, গোত্র, ভাষা, অঞ্চল কিংবা সামাজিক অবস্থানের কারণে কোনো মানুষকে অবজ্ঞা করা যাবে না। মানুষের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা এবং ন্যায় ও ইনসাফের সমাজ গঠনই ছিল তার অন্যতম শিক্ষা।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, রাসুল (সা.) বলেছেন—তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি উত্তম, যে তার চরিত্রে উত্তম। মহান আল্লাহ রাসুল (সা.) এর অনুপম চরিত্রের প্রশংসা করে পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেছেন—নিশ্চয়ই আপনি মহান চরিত্রের অধিকারী (সুরা আল আহাব : আয়াত ২১)। মহানবী (সা.) এর এই পবিত্র চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ও শিক্ষা আমাদের ব্যক্তি, পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনে সততা নৈতিকতা এবং উত্তম চরিত্রের সর্বোচ্চ গুরুত্বকে স্মরণ করিয়ে দেয়। রাসুলে করিম (সা.) হলেন সর্বশ্রেষ্ঠ আদর্শ। আজকের বিশ্বে হিংসা, সংঘাত, অসহিষ্ণুতা, বৈষম্য, উগ্রতা মিথ্যা ও নৈতিক অবক্ষয়ের যে বিস্তার ঘটছে, তা থেকে উত্তরণের জন্য মহানবী (সা.) এর আদর্শ অনুসরণের কোনো বিকল্প নেই। তার বিদায় হজের ভাষণে মানব মর্যাদা, সাম্য, ভ্রাতৃত্ব, ন্যায়বিচার ও পারস্পরিক অধিকারের যে মহান শিক্ষা উচ্চারিত হয়েছিল, তা আজও সমগ্র বিশ্বে মানবজাতির জন্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। মহানবী (সা.) এর মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা সার্বজনীন চিরন্তন ও পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান পবিত্র কোরআন নাজিল করেন। এর মাধ্যমে আল্লাহ মানবজাতির জন্য শান্তি, ন্যায়, সাম্য, ভ্রাতৃত্ব ও মানবতার অনুপম বিধান-আদর্শ ইসলাম ধর্মকে পরিপূর্ণতা দান করেছেন। মহানবী (সা.) এর প্রতি প্রকৃত ভালোবাসা প্রকাশের উপায় হলো কোরআন ও সুন্নাহর আলোকে আমাদের জীবন, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রকে পরিচালনা করা।
রাষ্ট্রপতি বলেন, বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও ধর্মীয় সহ-অবস্থানের এক উজ্জ্বল ঐতিহ্যের দেশ। এদেশের মানুষ যুগ যুগ ধরে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহনশীলতা ও সম্প্রীতির সঙ্গে বাস করে আসছে। মহানবী (সা.) অন্যান্য ধর্মের সঙ্গে সমন্বয় করে যে সমাজব্যবস্থা, পারস্পরিক অধিকার ও সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ অবস্থানের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, আমাদের জাতীয় জীবনেও শান্তি ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠায় তা অনুসরণীয়। সেই দৃষ্টান্তকে অনুসরণ করে আমরা এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চাই, যেখানে ধর্মপ্রাণ মানুষ স্বাধীনভাবে ধর্ম পালন করবেন। সব ধর্মের মানুষ নিরাপদ ও সম্মানজনক জীবনযাপন করবেন। ন্যায়বিচার, সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও পারস্পরিক সৌহার্দ্য হবে রাষ্ট্র ও সমাজের ভিত্তি।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, বাংলাদেশের মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাস মূল্যবোধ ও ইসলামী সংস্কৃতির সঙ্গে আমাদের জাতীয় জীবনের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সেই অনুভূতির প্রতি সম্মান জানিয়ে সংবিধানের প্রস্তাবনায় বিসমিল্লাহির রহমানির রাহিম সংযোজন করেন। তিনি চারটি বিভাগীয় শহরে ইসলামী সাংস্কৃতিক কেন্দ্র স্থাপন করেন। তার শাসন আমলে ইমামদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাদের ধর্মীয় দায়িত্বের পাশাপাশি সমাজকল্যাণ ও আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে সম্পৃক্ত করার কার্যক্রম শুরু হয়। এজন্য প্রতিষ্ঠা করা হয় ইমাম প্রশিক্ষণ একাডেমি। পরবর্তীতে ১৯৯৩ সালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া মসজিদ-ভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কার্যক্রম চালু করেন। ২০০১ সালে ইমাম মুয়াজ্জিন কল্যাণ ট্রাস্ট প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে মসজিদ, ইমাম, ধর্মের শিক্ষা ও সমাজে ইসলামী নৈতিক মূল্যবোধের বিকাশে প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার পরিধি সম্প্রসারিত হয়েছে। বর্তমান সরকার ধর্মীয় নেতাদের মর্যাদা বৃদ্ধি এবং তাদের কল্যাণ নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। ইতোমধ্যে ইমাম, মুয়াজ্জিন ও খাদেম সাহেবদের মাসিক সম্মানী ভাতা দেওয়া শুরু হয়েছে। এ ছাড়া অন্যান্য ধর্মীয় উপাসনালয়ে সেবাদানকারীদেরও সম্মানী ভাতা প্রদানের কাজ শুরু হয়েছে। আমি আশা করি, ২০৩০ সালের আগে প্রতিশ্রুতি অনুসারে দেশের সব মসজিদসহ অন্যান্য ধর্মীয় উপাসনালয় মাসিক সম্মানী ভাতার আওতায় আসবে।
রাষ্ট্রপতি বলেন, প্রিয় আলেম, ওলামা ও পীর মাশায়েক, আপনারা ধর্মীয় নৈতিক মূল্যবোধের পথপ্রদর্শক। মসজিদের মিম্বর থেকে আপনারা কোটি মানুষের কাছে সত্য, ন্যায়, সততা, ভ্রাতৃত্ব ও মানবতার বাণী পৌঁছে দেন। তাই সমাজ থেকে দুর্নীতি, মাদক সন্ত্রাস, সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ, গুজব, হিংসা, নারী ও শিশু নির্যাতন এবং অসহিষ্ণুতা দূর করতে আপনাদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমি আবার বলছি, অসহিষ্ণুতা দূর করতে আপনাদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমি আশা করব, আপনারা ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা নবী করিম (সা.) এর জীবনাদর্শ তুলে ধরে তরুণ প্রজন্মকে নৈতিকতা, দেশপ্রেম ও মানবিক মূল্যবোধে উদ্বুদ্ধ করবেন, অনুপ্রাণিত করবেন। আমাদের মনে রাখতে হবে—বিভেদ, প্রতিহিংসা, প্রতিশোধ কোনো জাতিকে শক্তিশালী করে না। অতীতের কর্তৃত্ববাদ ও অন্যায় যেন আর কখনো ফিরে না আসে, সেজন্য রাসুল (সা.)-কে অনুসরণ এবং ধর্মের শান্তি, ন্যায় ও সম্প্রীতির মর্মবাণীকে হৃদয়ে ধারণ করে গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার, সুশাসন ও মানুষের মৌলিক অধিকার রক্ষায় আমাদের ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।
রাষ্ট্রপ্রধান আরও বলেন, আপনারা বিশেষ করে ইসলামিক ফাউন্ডেশন দীর্ঘদিন ধরে দেশের ধর্মীয় শিক্ষা, ইসলামিক সংস্কৃতি গবেষণা ও প্রকাশনা, মসজিদ ভিত্তিক কার্যক্রম বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। আমার বিশ্বাস পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে আয়োজিত এ ধরনের কর্মসূচি ইসলামের শান্তি, সৌহার্দ্য ও মানবকল্যাণের বাণী মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, আমি অবশ্যই সরকারকে অনুরোধ করব, তারা যেন এই বিষয়টি গুরুত্বসহ গ্রহণ করে এবং এই বিষয়গুলো যেন বাস্তবায়িত করা সম্ভব হয়, সে বিষয়ে তারা যেন উদ্যোগ গ্রহণ করে। পরিশেষে পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে আমি সবার প্রতি আহ্বান জানাই, আসুন আমরা মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) এর সত্য, ন্যায়, সততা, সহিষ্ণুতা, ক্ষমা ও মানব প্রেমের মহান আদর্শে নিজেদের জীবনধারণ করি। মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) এর জীবন আদর্শ অনুসরণ করার তৌফিক দান করুন। আমাদের দেশ ও জাতিকে সব অনিষ্ট ও অশান্তি থেকে রক্ষা করুন। বাংলাদেশকে শান্তি, ন্যায়, সাম্য, সম্প্রীতি ও সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিয়ে যান। আমি পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানমালার শুভ উদ্বোধন ঘোষণা করছি এবং সব কর্মসূচির সার্বিক সফলতা কামনা করছি। আমাদের সহায় হোন। আমিন। আল্লাহ হাফেজ। বাংলাদেশ জিন্দাবাদ।