বাজেট চিন্তাশীল হলেও নীতিকাঠামো দুর্বল : দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ও নাগরিক প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেছেন, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের নীতিকাঠামো চিন্তাশীল হলেও এর ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত আর্থিক ও সামষ্টিক অর্থনৈতিক কাঠামো দুর্বল এবং অনেক ক্ষেত্রে অপেশাদার। যে নীতিকাঠামো তৈরি হয়েছে বাজেটকে কেন্দ্র করে, সেটা মোটামুটিভাবে একটি চিন্তাশীল নীতিকাঠামো। কিন্তু এর পরেই সমস্যার সূত্রপাত। কারণ এই কাঠামোটি একটি অত্যন্ত দুর্বল, সম্ভবত অকার্যকর আর্থিক কাঠামোর ওপর স্থাপন করা হয়েছে।

রাজধানীতে আয়োজিত ‘জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭: অসুবিধাগ্রস্ত মানুষের জন্য কী আছে?’ শীর্ষক মিডিয়া ব্রিফিং এ মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে সোমবার (১৫ জুন) ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য এসব কথা বলেন। এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম এর আয়োজন করে। ব্রিফিং সঞ্চালনা করেন সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান।

দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের মতে, মধ্যমেয়াদি সামষ্টিক অর্থনৈতিক কাঠামোও দুর্বল। এর ফলে বাজেট একদিকে আর্থিক কাঠামোগত দুর্বলতায় আক্রান্ত হয়েছে, অন্যদিকে প্রবৃদ্ধির যে মডেল সামনে আনা হয়েছে তার যৌক্তিকতাও প্রশ্নবিদ্ধ।

ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য অভিযোগ করেন, বাজেট প্রণয়নে ব্যবহৃত তথ্য-উপাত্তের ক্ষেত্রে অপূর্ণতা, অমনোযোগ এবং অনেক ক্ষেত্রে ‘ছলচাতুরী’করা হয়েছে। তথ্য নিয়ে ছলচাতুরী করলে সেটা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। আগের সরকারও প্রবৃদ্ধিকে বাড়িয়ে বলা, মূল্যস্ফীতিকে কম দেখানো এবং উন্নয়ন প্রকল্পের প্রকৃত প্রভাব মূল্যায়ন না করার মতো কাজ করেছে। বর্তমান সরকারও যদি সেই পথে হাঁটে, তাহলে তা হবে অত্যন্ত দুঃখজনক।

বাজেট বাস্তবায়নকে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ উল্লেখ করে ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, বাজেট ঘোষণা করলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। বাজেট বাস্তবায়নে জনগণের পক্ষ থেকে ধারাবাহিক চাপ ও নজরদারি প্রয়োজন। প্রস্তাবিত বাজেটের অধিকাংশ প্রাক্কলন ৩০ জুন পর্যন্ত হালনাগাদ তথ্যের ভিত্তিতে করা হয়নি। বরং গত বছরের সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে প্রস্তুত করা তথ্যের ওপর নির্ভর করে মধ্যমেয়াদি কাঠামো তৈরি করা হয়েছে। ফলে আগামী ৩০ জুলাইয়ের মধ্যে সর্বশেষ তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে সব প্রাক্কলন ও লক্ষ্যমাত্রা হালনাগাদ করার আহ্বান জানাচ্ছি।

ড. দেবপ্রিয় বলেন, চলতি তথ্যের ভিত্তিতে প্রাক্কলন ও লক্ষ্যমাত্রা হালনাগাদ না করলে আর্থিক শৃঙ্খলা রক্ষা এবং বাজারকে সঠিক সংকেত দেওয়ার ক্ষেত্রে দুর্বলতা তৈরি হবে। এতে সরকার নিজেই বিভ্রান্ত হতে পারে।

বাজেট বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন সিপিডির ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তিনি বলেন, প্রতি বছর বাজেটের হিসাব মেলাতে এক ধরনের কৃত্রিম রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। পরে সেই বোঝা গিয়ে পড়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ওপর। এবারও একই পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছে। প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা, কর প্রশাসনের সংস্কার ও সুশাসন নিশ্চিত না করে এনবিআরের ওপর অতিরিক্ত রাজস্ব আদায়ের চাপ দেওয়া বাস্তবসম্মত নয়।

রাজস্ব ঘাটতি দেখা দিলে সরকারের সমন্বয়ের জায়গা কোথায় এ প্রশ্ন তুলে ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, সরকারি কর্মচারীদের বেতন বা বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ কমানো সম্ভব নয়। ফলে শেষ পর্যন্ত ভর্তুকি কমানোর পথই বেছে নেওয়া হবে, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে সাধারণ মানুষের ওপর।

প্রবন্ধে সরকারের তিন বছর মেয়াদি ‘রিকভারি, রেস্টোরেশন ও রিকনস্ট্রাকশন’কর্মপরিকল্পনারও সমালোচনা করা হয়। দেবপ্রিয় বলেন, প্রথম বছরেই অর্থনীতিকে পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়ানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা অবাস্তব এবং অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টিকারী। প্রয়োজনীয় সংস্কার ছাড়া তড়িঘড়ি পদক্ষেপ নেওয়া হলে এবং নির্বাচনের আগে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে না এলে সরকারের অর্জন ম্লান হয়ে যেতে পারে।

দেশের নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরে ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, মানুষ এখন মূল্যস্ফীতি, মজুরি সংকট ও সঞ্চয় হারানোর ত্রিমুখী চাপে রয়েছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় মেটাতে অনেকেই সঞ্চয় ভাঙতে বাধ্য হচ্ছেন।

এছাড়া বাজেট ঘাটতি পূরণে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ), বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) থেকে প্রায় সাড়ে ৯ বিলিয়ন ডলার ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনার প্রসঙ্গ তুলে ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, এসব ঋণের শর্ত বা কর্মসম্পাদন সূচক যেন দেশের প্রান্তিক ও পিছিয়ে পড়া মানুষের স্বার্থের পরিপন্থি না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। ঋণ নিতে হলে সেটি অবশ্যই জনমানুষের পক্ষে হতে হবে, জনবিরোধী নয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *