নেপালে লাশ দাফন শুরু, নিখোঁজ হাজারো মানুষের সন্ধানে উদ্ধারকর্মীরা

হিমালয় অঞ্চলে সুনামির মতো ভয়াবহ বন্যায় শত শত মানুষের মৃত্যুর পর আজ সোমবার (৩১ আগস্ট) নেপালে উদ্ধার হওয়া মরদেহগুলোর দাফন শুরু হয়েছে। ভয়াবহ এই বন্যার পানির স্রোতে গ্রাম ও জনপদ ভেসে গেছে। এখনো হাজার হাজার মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন।

নিখোঁজ স্বজনদের সন্ধানে উদ্বিগ্ন পরিবারের সদস্যরা উদ্ধারকেন্দ্র ও হাসপাতালগুলোতে ভিড় করছেন। অন্যদিকে অনেক পরিবারকে উপচেপড়া মর্গে গিয়ে মরদেহ শনাক্ত করার মতো কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে।

গত বুধবার বরফ, পাথর ও ধ্বংসাবশেষের বিশাল স্রোত নেমে এসে বিভিন্ন গ্রাম ও শহর ভাসিয়ে নেয়। এতে নেপাল ও সীমান্তের ওপারে চীনের তিব্বত মিলিয়ে অন্তত ৭৯৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। কিছু মরদেহ স্রোতে ভেসে ভারতের ভূখণ্ড পর্যন্ত চলে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। এখনো অন্তত ৩ হাজার ৪৮ জন নিখোঁজ রয়েছেন। নিখোঁজদের মধ্যে তিব্বতের পবিত্র কৈলাস পর্বতে যাওয়া পর্যটক ও তীর্থযাত্রীরাও রয়েছেন। নেপালে নিখোঁজদের মধ্যে বিভিন্ন জলবিদ্যুৎকেন্দ্রে কর্মরত ৯৩৩ জন শ্রমিকও রয়েছেন।

রোববার নেপালি সেনাবাহিনীর সদস্য ও প্রকৌশলীরা হিমালয়ের নদী উপত্যকায় অবস্থিত ত্রিশূলী-৩ এ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের একটি টানেলে আটকে পড়েছেন বলে ধারণা করা শ্রমিকদের উদ্ধারে ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে খননকাজ চালান।

এর আগে উদ্ধারকারীরা সফলভাবে টানেলের ভেতর একটি পাইপ ঢোকাতে সক্ষম হন। দুর্যোগের সময় বেঁচে যাওয়া শ্রমিকরা ভয়াবহ পরিস্থিতির বর্ণনা দিয়েছেন।

ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশের ৩৩ বছর বয়সী সুরেন্দ্র দৌলুরি জানান, তিনি যে আপার ত্রিশূলী-১ প্রকল্পে কাজ করছিলেন, সেখানে প্রচণ্ড পানির স্রোতে পুরো এলাকা প্লাবিত হয়ে যায়।

নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুতে উদ্ধারের চার দিন পর এএফপিকে তিনি বলেন, ‘আমরা খুব জোরে একটি শব্দ শুনতে পাই। এরপর দেখি টারবাইন ফ্লোর কাদা ও পানিতে ডুবে গেছে। সেখানে ছয়জন শ্রমিক আটকা পড়েছিলেন। আমরা তাদের মধ্যে পাঁচজনকে উদ্ধার করতে পেরেছি। আর একজনের মৃত্যু হয়েছে।’

কিছু শ্রমিক উঁচু জায়গা কিংবা নির্মাণ এলাকার এমন অংশে পৌঁছাতে সক্ষম হন, যেখানে পানির ভয়াবহ স্রোত পৌঁছাতে পারেনি।

নেপালি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, রোববার রাতভর বৃষ্টি ও নদীর পানি বেড়ে যাওয়ায় উদ্ধারকাজ ব্যাহত হয়। খনন করা এলাকায় পানি ঢুকে পড়ায় কাজ কিছু সময়ের জন্য বাধাগ্রস্ত হয়। পরে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলে উদ্ধারকাজ আবার শুরু করা হয়।

ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ

যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) জানিয়েছে, হিমবাহ ধসে এই দুর্যোগের সৃষ্টি হয়। ফলে  পানি, বরফ ও ধ্বংসাবশেষ নদীপথে নেমে আসে।

এই প্রবল স্রোতের কারণে বিশাল কয়েকটি হ্রদের সৃষ্টি হয়েছে। এসব হ্রদ উদ্ধারকাজে নতুন কোনো ঝুঁকি তৈরি করে কি না, তা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন জরুরি বিভাগের কর্মীরা।

চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, তিব্বত সীমান্তের একটি বন্দর এলাকায় ভয়াবহ ভূমিধসের পর নতুন একটি হ্রদ সৃষ্টি হয়। এ কারণে সেখানে উদ্ধারকাজে নিয়োজিত চীনা উদ্ধারকারীদের রোববার নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। চীনের হিসাবে, তিব্বতে এখন পর্যন্ত ১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ৫৪৬ জন নিখোঁজ রয়েছেন।

নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থা রোববার জানিয়েছে, দেশটির অংশে নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা বেড়ে ২ হাজার ৫০২ জনে দাঁড়িয়েছে। সেখানে নিশ্চিতভাবে ৭৮১ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।

এত বিপুলসংখ্যক মরদেহ উদ্ধার হওয়ায় এবং পর্যাপ্ত হিমায়িত সংরক্ষণব্যবস্থা না থাকায় নেপালি কর্তৃপক্ষ মরদেহ শনাক্ত করার প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার আগেই দাফন শুরু করতে বাধ্য হয়েছে।

কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মরদেহগুলো থেকে ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে, যাতে পরে পরিচয় শনাক্ত করে স্বজনদের কাছে মরদেহ হস্তান্তর করা যায় এবং পরিবারগুলো তাদের প্রচলিত রীতি অনুযায়ী শেষকৃত্য সম্পন্ন করতে পারে।

স্বজন হারানো মানুষজন মরদেহ শনাক্তকেন্দ্রে জড়ো হচ্ছেন। সেখানে উদ্ধার হওয়া মরদেহের ছবি এলইডি স্ক্রিনে দেখানো হচ্ছে। অনেক সময় ভয়াবহ দৃশ্য দেখে স্বজনরা চোখ বন্ধ করে ফেলছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *