দৃশ্যপটে বার্নহাম, যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে সবচেয়ে এগিয়ে

কয়েক মাসের তীব্র চাপের মুখে আজ সোমবার (২২ জুন) যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার তার পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন। এর মাধ্যমে এমন একটি প্রক্রিয়া শুরু হলো যার ফলে ব্রিটেন এক দশকের মধ্যে তার সপ্তম প্রধানমন্ত্রী পেতে যাচ্ছে।

গত সপ্তাহেই পার্লামেন্টে ফিরে আসা অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ অ্যান্ডি বার্নহাম এখন স্টারমারের স্থলাভিষিক্ত হওয়ার দৌড়ে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছেন বলে মনে করা হচ্ছে। এর কারণ, তাঁর সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বী ওয়েস স্ট্রিটিং ইতোমধ্যে বার্নহামকে সমর্থন দেওয়ার কথা জানিয়েছেন। খবর বার্তা সংস্থা এএফপির।

১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটের বাইরে আজ আবেগঘন বক্তব্য দেওয়ার সময় স্টারমারের কণ্ঠ বুজে আসছিল। তিনি স্বীকার করেন, ক্ষমতায় বসার মাত্র দুই বছরের মাথায় তিনি নিজের লেবার পার্টির এমপিদের সমর্থন হারিয়েছেন।

স্টারমার জানান, তিনি রাষ্ট্রপ্রধান রাজা তৃতীয় চার্লস-কে তাঁর পদত্যাগের সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন, যাতে নতুন একজন লেবার নেতা এবং ফলশ্রুতিতে নতুন প্রধানমন্ত্রী নির্বাচন করা সম্ভব হয়।

স্ত্রী ভিক্টোরিয়া এবং দুই সন্তানকে ধন্যবাদ জানানোর সময় চোখের জল চেপে স্টারমার বলেন, ‘নেতৃত্বের এই প্রতিযোগিতা শেষ না হওয়া পর্যন্ত আমি প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বে থাকব এবং ক্ষমতা হস্তান্তর যেন সুশৃঙ্খলভাবে সম্পন্ন হয় তা নিশ্চিত করতে আমার সাধ্যমতো সবকিছু করব।’

২০২৪ সালের জুলাই মাসে কনজারভেটিভদের বিরুদ্ধে সাধারণ নির্বাচনে এক ভূমিধস জয়ের মাধ্যমে টানা ১৪ বছর বিরোধী দলে থাকা লেবার পার্টিকে ক্ষমতায় ফিরিয়ে এনেছিলেন স্টারমার। তবে তার প্রধানমন্ত্রিত্ব দ্রুতই বিভিন্ন নীতিগত অবস্থান থেকে ইউ-টার্ন, জনগণের কাছে জনপ্রিয়তা হারানো এবং মন্ত্রীদের পদত্যাগের ঘটনায় প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।

‘যে দেশকে আমি ভালোবাসি’

লেবার পার্টির আইনপ্রণেতারা শেষ পর্যন্ত এই সিদ্ধান্তে এসেছেন যে, উগ্র-ডানপন্থী ও অভিবাসন-বিরোধী দল ‘রিফর্ম ইউকে’র উত্থান রুখে দেওয়ার ক্ষমতা স্টারমারের নেই। সাম্প্রতিক জনমত জরিপগুলোতে দলটি শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে।

গত মে মাসে স্থানীয় ও আঞ্চলিক নির্বাচনে রিফর্ম ইউকে-র কাছে লেবার পার্টির বড় ধরনের ভরাডুবির পর থেকেই স্টারমারের অভ্যন্তরীণ কর্তৃত্ব কমতে শুরু করে এবং তার পরিবর্তে বার্নহামকে আনার দাবি জোরালো হতে থাকে।

স্টারমার তার নেতৃত্বের প্রতি যেকোনো চ্যালেঞ্জের বিরুদ্ধে লড়াই করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। তবে গত সপ্তাহে বার্নহাম পার্লামেন্টের উপ-নির্বাচনে জয়ী হয়ে নেতৃত্বের লড়াইয়ে দাঁড়ানোর যোগ্যতা অর্জন করার পর বেশ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ মন্ত্রী স্টারমারকে সাফ জানিয়ে দেন যে তার সময় শেষ।

টনি ব্লেয়ার এবং গর্ডন ব্রাউন সরকারের সাবেক মন্ত্রী বার্নহাম, যিনি ২০১৭ সাল থেকে গ্রেটার ম্যানচেস্টারের মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। আজ সোমবার দিনের শেষভাগে হাউজ অব কমন্সে (পার্লামেন্টে) নিজের আসন গ্রহণ করার কথা রয়েছে তার।

জ্যেষ্ঠ মন্ত্রী ও সহকর্মীদের উপস্থিতিতে স্যার কিয়ার স্টারমার বলেন, ‘আমার দল এখন যে প্রশ্নটি তুলছে তা হলো, আগামী সাধারণ নির্বাচনে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য আমিই কি সবচেয়ে যোগ্য ব্যক্তি?’ আমি এই প্রশ্নে আমার পার্লামেন্টারি দলের উত্তর শুনেছি এবং আমি অত্যন্ত সদ্বিবেচনার সাথে সেই উত্তর মেনে নিচ্ছি। আমার নেওয়া প্রতিটি সিদ্ধান্ত ছিল আমার ভালোবাসার দেশটিকে সবার আগে রাখার জন্য। আর সেই কারণেই আমি লেবার পার্টির নেতার পদ থেকে পদত্যাগ করছি।

জাতীয়তাবাদের শক্তি

স্টারমার জানান, তিনি লেবার পার্টির ন্যাশনাল এক্সিকিউটিভ কমিটিকে তার স্থলাভিষিক্ত খোঁজার একটি সময়সূচি নির্ধারণ করতে বলেছেন, যার মনোনয়ন প্রক্রিয়া আগামী ৯ জুলাই থেকে শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। গ্রীষ্মকালীন ছুটির পর সেপ্টেম্বর মাসে পার্লামেন্ট পুনরায় চালু হওয়ার আগেই যেন নতুন একজন নেতা দায়িত্ব গ্রহণ করতে পারেন, তা এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিশ্চিত করা হবে বলে তিনি ব্যাখ্যা করেন।

বক্তব্য শেষ করার পর স্টারমার তার স্ত্রীকে জড়িয়ে ধরেন। সে সময় একজন সুপরিচিত ব্রেক্সিট-বিরোধী আন্দোলনকারী কাছাকাছি একটি রাস্তা থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের থিম সং ‘ওড টু জয়’ বাজিয়ে স্টারমারের বক্তব্যকে থামিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন।

অ্যান্ডি বার্নহাম একটি সুশৃঙ্খল ও দায়িত্বশীল ক্ষমতা হস্তান্তরের আহ্বান জানিয়ে এক্স-এ লিখেছেন, ‘আমি এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে নিজেকে (প্রার্থী হিসেবে) তুলে ধরব।’

এর পরপরই সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী স্ট্রিটিং, যিনি আগে নিজে নেতৃত্বের প্রতিযোগিতায় নামার কথা বলেছিলেন, তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা না করে বার্নহামকে সমর্থন দেওয়ার ঘোষণা দেন। এর মাধ্যমে তিনি ইঙ্গিত দেন যে, কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিযোগিতা ছাড়াই বার্নহাম দলের শীর্ষ নেতা হতে পারেন।

স্ট্রিটিং জানান, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে তিনি বার্নহামের সাথে কথা বলেছেন এবং তিনি নিশ্চিত যে বার্নহাম ‘জাতীয়তাবাদের শক্তির বিরুদ্ধে আমাদের জীবনের সবচেয়ে বড় লড়াইয়ে জয়ী হতে পারেন।’

এড মিলিব্যান্ড, যিনি যুক্তরাজ্যের সংবাদমাধ্যমের মতে স্টারমারকে পদত্যাগ করতে চাপ দিয়েছিলেন, তিনি বিদায়ী প্রধানমন্ত্রীর ‘মহৎ মর্যাদা ও সততার’ প্রশংসা করেছেন এবং বলেছেন যে, স্টারমার তার অর্জনের জন্য অত্যন্ত গর্বিত হতে পারেন।

এদিকে, আন্তর্জাতিক বিষয়গুলো পরিচালনার জন্য ব্যাপকভাবে প্রশংসিত স্টারমার ইউরোপীয় ও ইউক্রেনীয় নিরাপত্তাকে ‘আরও শক্তিশালী’ করেছেন বলে মন্তব্য করেছেন ইইউ প্রধান উরসুলা ফন ডার লেয়েন।

শেষ সুযোগ

বার্নহাম তাঁর উপ-নির্বাচনের বিজয়সূচক বক্তৃতায় সতর্ক করে বলেছিলেন যে লেবার পার্টির কাছে এটিই ‘পরিবর্তনের শেষ সুযোগ’।

স্টারমারের স্থলাভিষিক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে সফল হলে, এই ৫৬ বছর বয়সী নেতা লেবার পার্টির বিশাল পার্লামেন্টারি সংখ্যাগরিষ্ঠতার সুবাদে দেশের প্রধানমন্ত্রী হবেন। তবে সে ক্ষেত্রে জনগণের ম্যান্ডেট বা রায়ের পরিধি নিয়ে তাকে সম্ভবত প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে।

রিফর্ম ইউকে-র নেতা নাইজেল ফারাজ তাৎক্ষণিকভাবে একটি আগাম সাধারণ নির্বাচনের দাবি জানিয়েছেন।

গত মার্চ মাসে প্রয়াত মার্কিন যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টাইনের পরিচিত সহযোগী পিটার ম্যান্ডেলসনকে ওয়াশিংটনে যুক্তরাজ্যের রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার এক দুর্ভাগা সিদ্ধান্তের কারণে স্টারমার প্রায় ক্ষমতাচ্যুত হতে বসেছিলেন।

যুক্তরাজ্যের সংবাদমাধ্যমের মতে, বার্নহাম বর্তমান অর্থমন্ত্রী র‍্যাচেল রিভসকে পরিবর্তন করার পরিকল্পনা করছেন, তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদকে তাঁর পদে বহাল রাখতে পারেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *