সাম্বার তালে তালে ‘জোগো বনিতো’র বন্দনা। একসময় এটাই ছিল ব্রাজিল ফুটবলের পরিচয়। তাদের পায়ের ছোঁয়ায় বল যেন নেচে উঠত। আর প্রতিটি আক্রমণ হয়ে উঠত একেকটি শিল্পকর্ম। ফুটবলপ্রেমীদের কাছে ব্রাজিল মানেই ছিল সৌন্দর্যের আরেক নাম। ইতিহাসে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন এই দলটি একসময় ফুটবলীয় শিল্পের জীবন্ত উদাহরণ ছিল। তবে ২০২৬ বিশ্বকাপে তাদের পারফরম্যান্সে সেই সোনালি সময়ের স্মৃতি যেন ধীরে ধীরে দূরে সরে যাচ্ছে।
ব্রাজিলের সেই সোনালি সময়ের কথা উঠলে এখনও ফুটবলপ্রেমীদের চোখে ভেসে ওঠে অসংখ্য কালজয়ী মুহূর্ত। ড্রিবলিং, শরীরের নিখুঁত বাঁক, প্রতিপক্ষকে বিভ্রান্ত করা ফেইন্ট, চোখধাঁধানো পাস, বিদ্যুৎগতির আক্রমণ, নিখুঁত ক্রস আর দৃষ্টিনন্দন ফিনিশিং– সব মিলিয়ে তারা ফুটবলকে শিল্পে পরিণত করেছিল।
সেই সময়ের একটি দলগত গোল আজও ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা হিসেবে বিবেচিত হয়। এমনকি গোলে পরিণত না হওয়া তিনটি আক্রমণও কিংবদন্তির মর্যাদা পেয়েছে। ব্রাজিলের সেই ফুটবল দর্শন নিয়ে লেখা হয়েছে অসংখ্য বই, নির্মিত হয়েছে চলচ্চিত্র, আর প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তা আলোচনার বিষয় হয়ে আছে।
২০২৬ বিশ্বকাপে ব্রাজিলের শুরুটা খুব একটা ভালো হয়নি। প্রথম ম্যাচে মরক্কোর সঙ্গে ১–১ গোলে ড্র করেছে তারা। ম্যাচে জিততে না পারায় সমর্থকদের মধ্যে কিছুটা হতাশা দেখা দিয়েছিল। দলে অনেক প্রতিভাবান ফুটবলার থাকলেও এখনো সেই চেনা দাপুটে ব্রাজিলকে দেখা যায়নি।
সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানও ব্রাজিলের জন্য খুব একটা সুখকর নয়। ফিফার সর্বশেষ বিশ্ব র্যাঙ্কিংয়ে দলটির অবস্থান ষষ্ঠ। বিশ্বকাপের দক্ষিণ আমেরিকা অঞ্চলের বাছাইপর্বে তারা কনমেবল পয়েন্ট তালিকায় পঞ্চম হয়ে মূল পর্বে জায়গা করে নেয়। এই বাছাইপর্বে ব্রাজিল ছয়টি ম্যাচ হেরেছে। যা তাদের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি। মাত্র আটটি ম্যাচ জিতেছে। এটিও তাদের সবচেয়ে কম জয়। পাশাপাশি ১৭টি গোল হজম করেছে, যা বাছাইপর্বে তাদের সর্বোচ্চ।
এই পরিস্থিতি বদলানোর দায়িত্ব এখন কার্লো আনচেলোত্তির। ২০২৫ সালের মে মাসে তিনি ব্রাজিল জাতীয় দলের কোচ হন। ক্লাব ফুটবলে তার সাফল্য অসাধারণ। তিনি রেকর্ড পাঁচবার উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জিতেছেন। পাশাপাশি ইংল্যান্ড, স্পেন, ইতালি, জার্মানি ও ফ্রান্সের শীর্ষ লিগে শিরোপা জেতার কৃতিত্বও রয়েছে তার। তবে জাতীয় দলের কোচ হিসেবে তার অভিজ্ঞতা খুব বেশি নয়। ১৯৯২ থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত তিনি ইতালি জাতীয় দলের সহকারী কোচ ছিলেন।
ব্রাজিলের সবচেয়ে বড় শক্তি এখনো তাদের খেলোয়াড়রা। ভিনিসিয়াস জুনিয়র ও রাফিনিয়া বিশ্বের অন্যতম সেরা আক্রমণভাগের ফুটবলারদের মধ্যে আছেন। ইগর থিয়াগো ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের বর্ষসেরা খেলোয়াড়ের মনোনয়ন পেয়েছেন। আর গোলবারের নিচে আছেন অভিজ্ঞ অ্যালিসন বেকার। যিনি বিশ্বের সেরা গোলরক্ষকদের একজন।
দলের সবচেয়ে পরিচিত মুখ নেইমার জুনিয়র। চোটের কারণে তিনি প্রায় তিন বছর জাতীয় দলের বাইরে ছিলেন। তবে তার অভিজ্ঞতা ও ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা এখনো ব্রাজিলের জন্য বড় ভরসা। রক্ষণভাগে নেতৃত্ব দিচ্ছেন মারকিনিয়োস। তিনি ব্রাজিলের অধিনায়ক হওয়ার পাশাপাশি প্যারিস সেন্ট জার্মেইনেরও অধিনায়ক। অন্যদিকে, তরুণ এন্ড্রিককে ভবিষ্যতের অন্যতম বড় তারকা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বর্তমান ব্রাজিল দলে একসঙ্গে আছে অতীতের গৌরব, বর্তমানের চ্যালেঞ্জ আর ভবিষ্যতের সম্ভাবনা। কাগজে-কলমে দলটি এখনো বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী। তবে শুধু ভালো খেলোয়াড় থাকলেই সাফল্য আসে না। প্রয়োজন ভালো পরিকল্পনা, দলগত বোঝাপড়া এবং সঠিক কৌশল। সেই কাজটাই এখন আনচেলোত্তির সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।
ইতিহাস বলছে, ব্রাজিলকে কখনোই সহজভাবে নেওয়া যায় না। কঠিন পরিস্থিতি থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে তারা অনেকবার বিশ্বকে চমকে দিয়েছে। ২০২৬ বিশ্বকাপেও সেই সুযোগ তাদের সামনে আছে। তবে এবার অতীতের গৌরব নয়, বর্তমানের খেলাই ঠিক করে দেবে ব্রাজিল আবার বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্নকে কতটা এগিয়ে নিতে পারে।