ট্রাম্পের ফোনকলেই বদলে গেল সিদ্ধান্ত- তদন্তের দাবি ইউরোপের

বিশ্বকাপের মাঠে যুক্তরাষ্ট্রের স্বপ্ন শেষ হয়েছে বেলজিয়ামের কাছে ১-৪ গোলের বড় ব্যবধানে হেরে। কিন্তু সেই হারের গল্প এখন অনেকটাই আড়ালে। টুর্নামেন্ট শেষ হওয়ার পরও আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে একটি সিদ্ধান্ত-স্ট্রাইকার ফোলারিন বালোগুনের লাল কার্ডজনিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার। সেই সিদ্ধান্তকে ঘিরে উঠেছে রাজনৈতিক প্রভাব, প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ এবং ফিফার নিরপেক্ষতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন।

বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের স্বীকারোক্তির পর। তিনি নিজেই জানিয়েছেন, বালোগুনের লাল কার্ড নিয়ে ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর সঙ্গে ফোনে কথা বলেছিলেন। ট্রাম্পের দাবি, তিনি ওই লাল কার্ডকে অন্যায় মনে করেছিলেন, তবে এর বিনিময়ে কোনো বিশেষ সুবিধা চাননি।

এরপরই ফিফা একটি বিতর্কিত আইনি ব্যাখ্যার মাধ্যমে বালোগুনের স্বয়ংক্রিয় এক ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করে। বিশ্বকাপে লাল কার্ডের নিয়ম চালুর পর এমন সিদ্ধান্ত আগে কখনো দেখা যায়নি বলেই দাবি করা হচ্ছে।

ঘটনার পর ট্রাম্প প্রকাশ্যে ইনফান্তিনোকে ধন্যবাদ জানান এবং বলেন, তিনি ‘একটি বিশাল অন্যায়ের অবসান’ ঘটিয়েছেন। যদিও ইনফান্তিনোর বক্তব্য ভিন্ন। তার দাবি, তিনি ট্রাম্পকে স্পষ্ট করে জানিয়েছিলেন যে ফিফার ডিসিপ্লিনারি বডি সম্পূর্ণ স্বাধীন এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে কোনো বাইরের প্রভাব কাজ করে না।

তবে এই ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট হয়নি ইউরোপ। মঙ্গলবার ইউরোপীয় পার্লামেন্টের একদল সদস্য ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর ভূমিকা খতিয়ে দেখতে বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করেন। তাদের সন্দেহ, সিদ্ধান্ত গ্রহণের পেছনে মার্কিন প্রশাসনের কোনো অনৈতিক চাপ কাজ করেছে কি না, সেটি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।

এই উদ্যোগের অংশ হিসেবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৭টি সদস্য দেশের ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনকে ফিফার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে বালোগুনের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের পুরো সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া তদন্তের দাবি তোলা হয়েছে।

চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, ‘আমরা মনে করি, ইউরোপীয় ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনগুলো-যারা প্রত্যেকেই ফিফার সদস্য-তাদের এখন হস্তক্ষেপ করার এবং বালোগানের মামলার সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়া তদন্তের দাবি জানানোর উপযুক্ত সময় এসেছে।’

বিতর্কের সূত্রপাত বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার বিপক্ষে ম্যাচে। ওই ম্যাচে বিতর্কিত লাল কার্ড দেখেছিলেন বালোগুন। ফিফার প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী, সরাসরি লাল কার্ড পেলে পরের ম্যাচে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিষিদ্ধ থাকার কথা। ফলে বেলজিয়ামের বিপক্ষে নকআউট ম্যাচে তার খেলার সুযোগ থাকার কথা ছিল না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই নিষেধাজ্ঞা স্থগিত হওয়ায় তিনি মাঠে নামার সুযোগ পান, আর সেখান থেকেই শুরু হয় প্রশ্নের ঝড়।

ফিফার এই সিদ্ধান্ত ইউরোপীয় ফুটবলেও তীব্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে। ইউরোপীয় ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা উয়েফা ঘটনাটিকে ‘নজিরবিহীন, অবিশ্বাস্য এবং সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য’ বলে মন্তব্য করেছে। একই সঙ্গে বেলজিয়াম ফুটবল ফেডারেশনও বালোগুনের খেলার বৈধতা নিয়ে আনুষ্ঠানিক আইনি চ্যালেঞ্জ জানিয়েছে।

শুধু ফুটবল প্রশাসনই নয়, ইউরোপীয় কমিশনের ক্রীড়াবিষয়ক দায়িত্বপ্রাপ্ত কমিশনার গ্লেন মিকালেফও ফিফার সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন। তার ভাষায়, এটি ছিল একটি ‘ভুল সিদ্ধান্ত’, যা বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থার নিরপেক্ষতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।

বিশ্বকাপের মতো বৈশ্বিক আসরে মাঠের লড়াইয়ের বাইরেও প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও ন্যায়বিচার যে সমান গুরুত্বপূর্ণ, বালোগুন বিতর্ক যেন আবারও সেটিই সামনে এনে দিল। এখন নজর ফিফার দিকে-সংস্থাটি কি এই বিতর্কের পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা দেবে, নাকি ইউরোপের দাবির মুখে আনুষ্ঠানিক তদন্তের পথেই হাঁটতে হবে? সেই উত্তরই হয়তো নির্ধারণ করবে, এই বিতর্ক কেবল একটি ম্যাচের সিদ্ধান্তে সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি বিশ্ব ফুটবলের প্রশাসনিক ইতিহাসে নতুন এক অধ্যায় হয়ে থাকবে।

এসএন/পিডিকে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *