একটি খেলার মাঠের স্বপ্ন। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে এক হয়েছেন গ্রামের মানুষ। কারও অনুদান ২০০ টাকা, কারও ৫০০, আবার কেউ দিয়েছেন এক হাজার থেকে কয়েক হাজার টাকা। ধনী-গরিবের ভেদাভেদ ভুলে সবার সম্মিলিত অর্থায়নে কেনা হয়েছে ৬০ শতাংশ জমি। দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণের প্রথম ধাপ উদ্যাপন করেছেন গ্রামবাসী বাদ্যযন্ত্রের তালে তালে আনন্দ-উৎসবের মধ্য দিয়ে। ব্যতিক্রমী এই উদ্যোগের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন টাঙ্গাইলের দেলদুয়ার উপজেলার বাবুপুর গ্রামের বাসিন্দারা। তবে একটি পূর্ণাঙ্গ খেলার মাঠ গড়ে তুলতে প্রয়োজন আরও ৬০ শতাংশ জমি।গ্রামের পথে পথে আনন্দ-উল্লাস। কারও হাতে জাতীয় পতাকা, কারও হাতে ফুলের মালা। বাদ্যযন্ত্রের তালে তালে উচ্ছ্বাসে মেতেছেন শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে প্রবীণরাও। কারণ, দীর্ঘদিনের স্বপ্ন এবার বাস্তবে রূপ নিতে শুরু করেছে।
টাঙ্গাইলের দেলদুয়ার উপজেলার দেউলী ইউনিয়নের বাবুপুর গ্রামে সাত শতাধিক পরিবারের বসবাস। জনসংখ্যা সাড়ে তিন হাজারের বেশি। অথচ এত দিন শিশু-কিশোর ও তরুণদের খেলাধুলার জন্য ছিল না নির্দিষ্ট কোনো মাঠ। ধান কাটার পর কৃষিজমিতে সাময়িকভাবে খেলার সুযোগ মিললেও নতুন করে ফসলের আবাদ শুরু হলে বন্ধ হয়ে যেত খেলাধুলা।
এই সংকটের স্থায়ী সমাধানে এগিয়ে আসেন এস এম ইকবাল মাহমুদ ও ক্রীড়াব্যক্তিত্ব খোরশেদ আলম। তাদের উদ্যোগে গত ৮ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হয় গ্রামবাসীর মতবিনিময় সভা। সভায় সিদ্ধান্ত হয়, সরকারি-বেসরকারি কোনো প্রতিষ্ঠানের সহায়তার অপেক্ষায় না থেকে নিজেদের অর্থেই কেনা হবে খেলার মাঠের জমি।
এরপর শুরু হয় অর্থ সংগ্রহের উদ্যোগ। গ্রামের বিত্তবানদের পাশাপাশি এগিয়ে আসেন সাধারণ মানুষও। কেউ দিয়েছেন ২০০ টাকা, কেউ ৫০০, আবার কেউ এক হাজার থেকে পাঁচ কিংবা দশ হাজার টাকা পর্যন্ত। সামর্থ্য অনুযায়ী সবার ছোট-বড় অনুদানে গড়ে ওঠে জমি কেনার তহবিল।
গ্রামবাসীর সম্মিলিত অর্থায়নে ইকবাল হোসেন সুজনের কাছ থেকে প্রতি শতাংশ ৫২ হাজার টাকা দরে কেনা হয় ৬০ শতাংশ জমি। এর সঙ্গে জমির মালিকও এক শতাংশ জমি দান করেন।
গত বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) আনুষ্ঠানিকভাবে জমিটি গ্রামবাসীর কাছে বুঝিয়ে দেওয়া হয়। এ উপলক্ষে সকাল থেকেই বাবুপুর গ্রামে চলে আনন্দ-উৎসব। জাতীয় পতাকা উত্তোলন, ফুলের মালা দিয়ে প্রবীণদের বরণ এবং বাদ্যযন্ত্রের তালে তালে আনন্দ প্রকাশে মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা।
তবে ৬০ শতাংশ জমি কেনার মধ্য দিয়ে উদ্যোগের প্রথম ধাপ সম্পন্ন হলেও পূর্ণাঙ্গ খেলার মাঠ গড়ে তোলার জন্য আরও ৬০ শতাংশ জমি কেনার পরিকল্পনা রয়েছে উদ্যোক্তাদের। সব মিলিয়ে ১২০ শতাংশ জমিতে একটি মানসম্মত খেলার মাঠ গড়ে তুলতে চান তাঁরা। যেখানে নিয়মিত খেলাধুলার পাশাপাশি নতুন খেলোয়াড় তৈরির সুযোগও তৈরি হবে।
সরকারি কিংবা বেসরকারি কোনো আর্থিক সহায়তা ছাড়াই গ্রামের মানুষের এমন সম্মিলিত উদ্যোগকে ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখছেন স্থানীয়রা। তাদের প্রত্যাশা, বাবুপুরের এই মাঠ ঘিরে নতুন প্রজন্ম ফিরে পাবে খেলাধুলার উপযুক্ত পরিবেশ। একই সঙ্গে বাড়বে সামাজিক বন্ধন, সম্প্রীতি ও সুস্থ বিনোদনের সুযোগ।
একটি মাঠের জন্য কারও ২০০ টাকা, কারও কয়েক হাজার টাকার সহযোগিতা—অঙ্কে হয়তো ছোট, কিন্তু সম্মিলিত স্বপ্ন বাস্তবায়নে প্রতিটি অবদানই গুরুত্বপূর্ণ। ৬০ শতাংশ জমি কেনার মধ্য দিয়ে স্বপ্নের প্রথম ধাপ পেরিয়েছেন বাবুপুরের মানুষ। এখন অপেক্ষা আরও ৬০ শতাংশ জমির। গ্রামবাসীর প্রত্যাশা, সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় একদিন পূর্ণতা পাবে নতুন প্রজন্মের স্বপ্নের খেলার মাঠ।