টেক্সট হিপ: দক্ষিণ কোরিয়ার তরুণদের বই পড়ার নতুন ফ্যাশন

পূর্ব এশিয়ার তো বটেই, বৈশ্বিক টেক জায়ান্ট দেশগুলোর মাঝে অন্যতম দক্ষিণ কোরিয়া। বিশ্বায়নের প্রভাবে প্রযুক্তিগত উৎকর্ষে যেসব দেশের লেখচিত্র ইতিবাচকভাবে উত্তর-পূর্বমুখী, তার মধ্যে দ. কোরিয়া সেই তালিকার প্রথম সারিতেই। তবে আধুনিকতার ছোঁয়ায় সেখানকার তরুণরা শুধু ডিভাইসের পর্দায় স্ক্রল করেই সময় কাটাচ্ছেন না। পিডিএফের এই রমরমা যুগে মুদ্রিত বই পড়াকেও তারা নতুন আঙ্গিকের এক ফ্যাশন হিসেবে গ্রহণ করেছেন। আর এটি পরিচিত ‘টেক্সট হিপ’ নামে।

ইতিহাস পড়ুনদেশটিতে সাপ্তাহিক ছুটি শনি ও রোববার। এরকমই সপ্তাহান্তের কোনো এক বিকেলে রাজধানী সিউলের ব্যস্ত নগরকেন্দ্র গোয়াংতোংগিয়ো সেতুর নিচে পাথর বিছানো চত্বরে গেলে দেখা মেলে সারি সারি চেয়ারে বসে আছেন নানা বয়সী মানুষ। ওপর দিয়ে ছুটছে মেট্রোরেল, ফ্লাইওভার ও সড়কপথে যানবাহন— সব মিলিয়ে শহরের গতানুগতিক কোলাহল। তবে তাতে যেন কারও তেমন ভ্রুক্ষেপ নেই। ঠিক পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে চেওংগিয়ে জলধারা। পানির কলকল শব্দের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে পাশেই কোথাও বাজতে থাকা ধ্রুপদি সংগীত।

সেখানেই দেখা যায় কেউ গল্প করছেন, কারও চোখ আবার মুঠোফোনের রিলসে। তবে অনেকের চোখ বইয়ে। গল্প, উপন্যাস, কবিতা কিংবা ভিনদেশী কোনো বিখ্যাত বইয়ের কোরিয়ান অনুবাদের বই দেখা যায় তাদের হাতে।

এই নতুন প্রবণতার নাম দেওয়া হয়েছে ‘টেক্সট হিপ’। ইংরেজি শব্দ ‘টেক্সট’ অর্থাৎ লিখিত বিষয় এবং ‘হিপ’ অর্থাৎ আধুনিক ও আকর্ষণীয়। এই দুই শব্দের সমন্বয়েই উৎপত্তি নতুন এই ট্রেন্ডের নাম। এর মাধ্যমে এমন এক সাংস্কৃতিক পরিবর্তনকে বোঝানো হচ্ছে, যেখানে তরুণেরা বই পড়া ‘উপভোগ’ করাকে আধুনিক, অনুসরণীয় ও অনুকরণীয় অভ্যাস হিসেবে দেখছেন এবং উপভোগ করছেন।

দক্ষিণ কোরিয়ান কালচার ওয়েবসাইটের তথ্যমতে, এই পরিবর্তনের একটি বড় উদাহরণ দেখা যায় ২০২৪ সালের মে মাসে অনুষ্ঠিত সিউল আন্তর্জাতিক বইমেলায়। ৫ দিনব্যাপী ওই আয়োজনে প্রায় দেড় লাখ দর্শনার্থী অংশ নেন, যাদের শতকরা ৭০ ভাগেরই বয়স ছিল ২০ থেকে ৩৯ বছরের মধ্যে। বইমেলার এই পরিসংখ্যানই দেখিয়ে দেয়, দেশটিতে তরুণদের মধ্যে বইয়ের প্রতি আগ্রহ কতটা বেড়েছে।

এমনকি সে বছরের অক্টোবরে দক্ষিণ কোরিয়ার কথাসাহিত্যিক হান কাং সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার অর্জন করলে তরুণদের বই পড়ার এই ট্রেন্ড যেন আরও গতিশীল আবহ পায়।

এর প্রভাবে দেশটিতে যেমন ছাপা বইয়ের বিক্রি বেড়েছে তেমনি উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে বই পড়ার সহায়ক সামগ্রীর বিক্রি। মানুষ বইয়ের পাশাপাশি কিনছেন জার্নাল, ডায়েরি, বুকমার্কসহ নানা আনুষঙ্গিক পণ্য।

পাশাপাশি বই পড়ার জন্য বিশেষভাবে সাজানো ক্যাফে ও বারগুলোতেও বাড়ছে তরুণদের আনাগোনা। সেখানে কফি কিংবা চা পান করতে করতে বই পড়া, আড্ডা দেওয়া, বইয়ের রিভিও কিংবা সাহিত্যভিত্তিক আয়োজনে অংশ নেওয়াও অনেকের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে।

বইয়ের প্রতি এই নতুন ভালোবাসা শুধু ব্যক্তিগত পাঠাভ্যাসের মধ্যেও সীমাবদ্ধ নেই। অনেকেই এখন দলবদ্ধভাবে বই পড়ছেন, নিজেদের মধ্যে অভিজ্ঞতা বিনিময় করছেন এবং সাহিত্য নিয়ে আলোচনা করছেন। কেউ প্রিয় লেখার অংশ নিজের হাতে লিখে অনুলিপি তৈরি করছেন আবার কেউ শুনছেন লেখকদের অভিজ্ঞতা।

সব মিলিয়ে দক্ষিণ কোরিয়ায় বই ও লিখিত বিষয়বস্তুকে ঘিরে মানুষের আগ্রহ এক নতুন মাত্রা পেয়েছে। এখন প্রশ্ন ওঠে— আজকের জেনজি বা তরুণ প্রজন্ম বড় হয়েছে মুঠোফোন, রিলস, ভ্লগিং ও দ্রুত বিনোদনের জগতে; তাদের কাছে হঠাৎ বই পড়া এত আকর্ষণীয় হয়ে উঠল কেন বা কীভাবে?

মূলত, এর নেপথ্যে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ ব্যাখ্যা করেছেন বিশেষজ্ঞরা। যেমন, তরুণেরা সব সময় নতুন ধরনের সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা খোঁজেন। আগের প্রজন্মের মানুষের কাছে কাগজে ছাপা লেখা কিংবা দীর্ঘ রচনা পড়া পরিচিত অভ্যাস হলেও বর্তমান তরুণ প্রজন্মের অভিজ্ঞতা ভিন্ন। আবার, স্বল্প সময়ের রিলসের মতো দ্রুতগতির ও উত্তেজনাপূর্ণ বিনোদন থেকে কিছুটা দূরে থাকার আকাঙ্ক্ষা তরুণদের বইয়ের দিকে ফিরিয়ে আনছে। পাশাপাশি, দেশটির জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী ও বিনোদনজগতের তারকাদের প্রভাবও এই প্রবণতা ছড়িয়ে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

তবে এই ‘টেক্সট হিপ’-এর শুরুতে সমালোচনাও কম হয়নি। অনেকে প্রশ্ন তুলেছিলেন, তরুণেরা কি সত্যিই বই পড়ছেন, নাকি নিজেদের শিক্ষিত, রুচিশীল ও আধুনিক হিসেবে তুলে ধরার জন্য কেবল বই পড়ার ভান করছেন মাত্র? তবে, টেক্সট হিপ সমর্থকদের যুক্তি, মানুষ যে উদ্দেশ্যেই বই হাতে তুলে নিক না কেন, শেষ পর্যন্ত এর ইতিবাচক প্রভাবই বেশি। আসলে বই পড়াকে ফ্যাশন হিসেবে গ্রহণ করার মধ্য দিয়েও নতুন পাঠক তৈরি হচ্ছে। প্রকাশনা শিল্পের জন্য খুলে যাচ্ছে নতুন সম্ভাবনার দরজা।

সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বে প্রযুক্তির কল্যাণে বইপ্রেমীদের মুঠোফোন, ল্যাপটপসহ বিভিন্ন ডিভাইসে ই-বুক পড়ার অভ্যাস যেন সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে। এতে বিখ্যাত লেখকদের সেরা বই তো বটেই তাদের সৃজনশীল সত্ত্বা যেন পিডিএফ আকারে অনেকটাই সহজলভ্য। এতে স্বাভাবিকভাবেই ছাপাবই কিনতে অনাগ্রহও বাড়ে সমান তালে। এর রেশ গিয়ে পড়ে ছাপা কারখানার মালিক-শ্রমিক থেকে বিশাল একটি শ্রমগোষ্ঠির ওপরও। তবে সেই অভ্যাস থেকে আবারও ছাপা বইয়ের দিকে ঝুঁকছেন দক্ষিণ কোরিয়ার তরুণরা।

লেখকের মূল পান্ডুলিপি এক কপিই হয়। কিন্তু সেটি ছাপাখানা থেকে কাগজের বই আকারে যখন বের হয়, সেটি তো ছোঁয়া যায়। পাঠকের সাথে লেখকের একটা টেলিপ্যাথি যোগাযোগও যেন হয় আসল বই হাতে নিলে, যা পিডিএফ-এ নেই। দক্ষিণ কোরিয়ান তরুণরা যেন সেই আবহে নতুন জোয়ারই আনলেন। দ্য ‘টেক্সট হিপ’ অনন্য এক শুরুই বটে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *