চট্টগ্রামের আকাশে তখন উত্তেজনার মেঘ! অস্ট্রেলিয়ার পাহাড়সম ১৯৬ রানের লক্ষ্য দেখে অনেকেই হয়তো ভেবেছিলেন ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি চলে গেছে সফরকারীদের হাতে। কিন্তু মাঠে থাকা বাংলাদেশ যেন অন্য এক বার্তা দিতে চাইল। শেষ বল পর্যন্ত লড়াই, প্রতিটি রানে উত্তেজনা আর শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত জয়ের আশা-সব মিলিয়ে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে দ্বিতীয় টি-টোয়েন্টিতে হারলেও নিজেদের নতুন রূপ দেখাল বাংলাদেশ।
তবে শেষ পর্যন্ত রুদ্ধশ্বাস লড়াইয়ের পর ৭ রানের ব্যবধানে জয় তুলে নেয় অজিরা। সেই সঙ্গে এক ম্যাচ হাতে রেখেই তিন ম্যাচের টি-টোয়েন্টি সিরিজ ২-০ ব্যবধানে নিজেদের করে নেয় সফরকারীরা।
টস জিতে ব্যাট করতে নেমে অস্ট্রেলিয়া ২০ ওভারে ৫ উইকেট হারিয়ে তুলে ১৯৬ রান। জবাবে ২০ ওভারে ৬ উইকেট হারিয়ে ১৮৯ রান তুলে বাংলাদেশ। তাতেই ২-০-তে সিরিজ জিতল সফরকারী অজিরা। আক্ষেপ থাকল সমতা ফেরানোর কাছে গিয়েও হারল বাংলাদেশ।
চট্টগ্রামে আজ দুপুরে টস জিতে আগে ব্যাট করার সিদ্ধান্ত নেয় অস্ট্রেলিয়া। শুরুটা অবশ্য তাদের পক্ষে ছিল না। বাংলাদেশের বোলাররা নতুন বলে দারুণ নিয়ন্ত্রণ দেখিয়ে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং অর্ডারে চাপ তৈরি করে। দলীয় ৫০ রান পূর্ণ হওয়ার আগেই তিনটি উইকেট হারিয়ে বিপাকে পড়ে যায় অজিরা। তখন মনে হচ্ছিল, বড় সংগ্রহের পথে এগোতে পারবে না সফরকারীরা।
কিন্তু সেখান থেকেই ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেন ম্যাট রেনশো। একপ্রান্ত আগলে রেখে ধীরে ধীরে ইনিংসের ভিত গড়ে তোলেন তিনি। মাত্র ২৯ বলে তুলে নেন অর্ধশতক। এরপর আরও আগ্রাসী হয়ে বাংলাদেশের বোলারদের ওপর চাপ বাড়ান বাঁহাতি এই ব্যাটার।
রেনশোর সঙ্গে টিম ডেভিডের জুটি অস্ট্রেলিয়ার ইনিংসকে নিয়ে যায় অন্য উচ্চতায়। চতুর্থ উইকেটে দুজন যোগ করেন ৯৭ রান। ডেভিডের ২৬ বলে ৪৫ রানের ঝড়ো ইনিংস বাংলাদেশের বোলিং পরিকল্পনা এলোমেলো করে দেয়। অন্যদিকে রেনশো শেষ পর্যন্ত অপরাজিত থেকে খেলেন ৫২ বলে ৮৯ রানের দুর্দান্ত ইনিংস। চারটি চার ও পাঁচটি ছক্কায় সাজানো এই ইনিংস তাকে আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ সংগ্রহ এনে দেয়।
শেষ দিকে আরও ৪২ রানের জুটি গড়ে অস্ট্রেলিয়াকে ২০ ওভারে ৫ উইকেটে ১৯৬ রানের শক্ত অবস্থানে পৌঁছে দেন রেনশো ও জোয়েল ডেভিডসন।
বাংলাদেশের হয়ে নাসুম আহমেদ ছিলেন সবচেয়ে সফল বোলার। চার ওভারে মাত্র ২৭ রান দিয়ে দুটি উইকেট নেন তিনি। সাকলাইন, মুস্তাফিজুর রহমান ও নাহিদ রানা একটি করে উইকেট পেলেও অস্ট্রেলিয়ার রান তোলার গতি পুরোপুরি থামানো যায়নি। বিশেষ করে শেষ ওভারে মুস্তাফিজের বলে ১৮ রান তুলে নিয়ে অস্ট্রেলিয়া নিজেদের সংগ্রহকে আরও বড় করে।
১৯৭ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে বাংলাদেশের শুরুটাও ছিল আশাব্যঞ্জক। তানজিদ হাসান তামিমের ৩০ রান, সাইফ হাসানের ৪২ রান এবং পারভেজ হোসেনের ৩৬ রানের ইনিংসে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ বেশ কিছু সময় ছিল স্বাগতিকদের হাতে।
প্রথম ১০ ওভার শেষে বাংলাদেশের স্কোর ছিল ১০৩ রান। হাতে ছিল আট উইকেট। তখন জয়টা কঠিন হলেও অসম্ভব মনে হচ্ছিল না। কিন্তু মাঝের ওভারগুলোতে প্রয়োজনীয় গতি ধরে রাখতে পারেনি বাংলাদেশ। শেষ ১০ ওভারে ৯৪ রান প্রয়োজন হলেও শেষ পর্যন্ত ৮৬ রান তুলেই থেমে যায় তারা।
তবে শেষ পর্যন্ত ম্যাচ জমিয়ে রাখেন তাওহীদ হৃদয়। শেষ দুই ওভারে বাংলাদেশের প্রয়োজন ছিল ৩৪ রান। নাথান এলিসের করা ১৯তম ওভারে আসে মাত্র ১১ রান। ফলে শেষ ওভারে সমীকরণ দাঁড়ায় ২৩ রান।
হৃদয় তখনও আশা বাঁচিয়ে রেখেছিলেন। শেষ ওভারে দুটি বড় শটে উত্তেজনা বাড়িয়ে দেন তিনি। শেষ দুই বলে প্রয়োজন ছিল ১২ রান। পরের বলে বাউন্ডারি আসায় সমীকরণ দাঁড়ায় শেষ বলে ৮ রান। জয়ের জন্য শেষ বলেও বড় শট খেলতে চেয়েছিলেন হৃদয়। কিন্তু সীমানার কাছে ক্যাচ দিয়ে থেমে যায় বাংলাদেশের শেষ আশা।
২২ বলে দুই ছক্কা ও তিন চারে ৩৫ রানের ইনিংস খেলেন হৃদয়। তার লড়াইয়ে বাংলাদেশ জয় না পেলেও প্রমাণ করেছে, বড় দলের বিপক্ষেও এখন তারা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই করতে জানে।
২০২১ সালে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টি-টোয়েন্টি সিরিজে ১-৪ ব্যবধানে হেরেছিল বাংলাদেশ। এবার অবশ্য চিত্রটা ভিন্ন। অস্ট্রেলিয়া এক ম্যাচ আগেই সিরিজ জিতে নিয়েছে ঠিকই, কিন্তু চট্টগ্রামের এই ম্যাচে বাংলাদেশের লড়াই নতুন আত্মবিশ্বাসের গল্প লিখে গেছে!
এসএন/কে