এক সপ্তাহ আগেও রাজধানী ঢাকার ফিলিং স্টেশনগুলোতে জ্বালানি তেল সংগ্রহ ছিল এক ভয়াবহ ভোগান্তির নাম। রাত থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা, ঘণ্টার পর ঘণ্টা রোদে অপেক্ষা, আর কয়েক কিলোমিটার দীর্ঘ যানবাহনের সারি—সব মিলিয়ে নগরজীবনে নেমে এসেছিল চরম বিপর্যয়। গত কয়েকদিনে লাইন ছোট হতে হতে এখন প্রায় উধাও, স্বস্তি নিয়েই সংগ্রহ করা যাচ্ছে জ্বালানি।
সোমবার (২৭ এপ্রিল) সরেজমিনে রাজধানীর বিভিন্ন ফিলিং স্টেশন ঘুরে দেখা যায়, কোথাও নেই দীর্ঘ লাইন। স্বাভাবিক গতিতেই গ্রাহকরা কয়েক মিনিটের মধ্যেই জ্বালানি সংগ্রহ করতে পারছেন।
ঢাকার অধিকাংশ ফিলিং স্টেশন চলাচলের প্রধান সড়কের পাশে হওয়ায় তেলের লাইনের কারণে তৈরি হতো দীর্ঘ যানজট। সন্ধ্যায় ট্রাক, কাভার্ডভ্যান, বাসের লাইন বাড়লে যানজট আরও ভয়াবহ রূপ পেতো। সে অবস্থারও অনেকটা পরিবর্তন এসেছে।
বদলে গেছে শাহবাগ, নীলক্ষেত ও রমনা এলাকার চিত্র
সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত শাহবাগ, নীলক্ষেত ও রমনা এলাকার কয়েকটি ফিলিং স্টেশন ঘুরে দেখা যায় সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র। এক সপ্তাহ আগেও যে লাইন প্রধান সড়ক পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল, সেখানে এখন স্টেশনের ভেতরেই সীমিত সংখ্যক যানবাহনের স্বাভাবিক সারি দেখা যায়। তেল নেওয়ায় কোনো তাড়াহুড়া কিংবা বাগবিতণ্ডা নেই। সবাই ধীরস্থিরভাবেই তেল নিচ্ছেন।

নীলক্ষেত ফিলিং স্টেশনে একসময় লাইন নীলক্ষেত থেকে আজিমপুর, পলাশী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবেশপথ পর্যন্ত পৌঁছে যেত। সেখানে স্টেশনের চৌহদ্দির বাইরেও খুবই স্বল্পসংখ্যক যানবাহন অপেক্ষমাণ দেখা গেলো।
সেখানে থাকা লালবাগের বাসিন্দা আবু মিয়া জাগো নিউজকে বলেন, ‘এক সপ্তাহ আগে ৭–৮ ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে মাত্র ৫শ টাকার তেল পেয়েছিলাম। আজ মাত্র ৫ মিনিটেই প্রয়োজনীয় জ্বালানি নিতে পেরেছি। বিশ্বাসই হচ্ছে না।’
‘ফুয়েল পাস’ ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা
সংকট ঘণীভূত হতে থাকা জ্বালানি খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে গত ৯ এপ্রিল পরীক্ষামূলকভাবে ‘ফুয়েল পাস’ চালু করে সরকার। প্রথমে ঢাকা এবং পরে দেশের বিভিন্ন জেলায়ও চালু হচ্ছে এ পাস। প্রথমে মোটরসাইকেলের জন্য এ পাস চালু করলেও ২৬ এপ্রিল থেকে ব্যক্তিগত গাড়ির জন্য ফুয়েল পাস দেওয়া হচ্ছে। সরকারি ওয়েবসাইট ও অ্যাপের মাধ্যমে এ সেবা নেওয়া যাচ্ছে। বর্তমানে ঢাকার ১১টি পাম্প থেকে শুধু ফুয়েল পাসের মাধ্যমে তেল বিতরণ হচ্ছে।
কয়েকদিন আগে তেজগাঁওয়ের ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশনে জ্বালানি তেল (অকটেন) নিতে মহাখালী রেলক্রসিং পর্যন্ত দীর্ঘ যানবাহনের লাইন লেগে থাকতো। ফিলিং স্টেশনের মালিক কিছুক্ষণ আগে (বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে) আমাকে জানিয়েছেন ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশনে ওই মুহূর্তে মাত্র ছয়টি মোটরসাইকেল রয়েছে।-জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব (অপারেশন অনুবিভাগ) মনির হোসেন চৌধুরী
শাহবাগ মেঘনা মডেল সার্ভিস সেন্টারে দেখা যায় তুলনামূলক কম ভিড়। এখানে মোটরসাইকেলচালকদের ফুয়েল পাসে তেল দেওয়া হচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী আহনাফ চৌধুরী বলেন, ‘ফুয়েল পাস ব্যবস্থা একটি ভালো উদ্যোগ। এতে কারা কতটুকু জ্বালানি নিচ্ছে তার রেকর্ড থাকছে। ফলে অনিয়ন্ত্রিতভাবে লাইনে দাঁড়িয়ে তেল সংগ্রহের প্রবণতা কমে গেছে।’
বিশ্ববাজারে অস্থিরতা ও উৎপাদন খরচের তুলনায় ভর্তুকির বোঝা কমাতে সরকার গত ১৯ এপ্রিল জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায়। নতুন দাম অনুযায়ী ডিজেল প্রতি লিটার ১১৫ টাকা (১৫ টাকা বৃদ্ধি), কেরোসিন ১৩০ টাকা (১৮ টাকা বৃদ্ধি), অকটেন ১৪০ টাকা (২০ টাকা বৃদ্ধি) এবং পেট্রোল ১৩৫ টাকা (১৯ টাকা বৃদ্ধি) নির্ধারণ করা হয়।
দাম বাড়ানোর পর সরকার তেলের সরবরাহও ২০ শতাংশ বাড়ানোর ঘোষণা দেয়। সরবরাহ বাড়ানো ও ফুয়েল পাস চালুর প্রভাবে ধীরে ধীরে শুরু হয় লাইন কমার প্রবণতা।
মৎস্য ভবন সংলগ্ন রমনা ফিলিং স্টেশনেও দেখা যায় একই চিত্র। কয়েকদিন আগেও প্রেস ক্লাব, সেগুনবাগিচা ও বারডেম হাসপাতাল এলাকা পর্যন্ত দীর্ঘ যানবাহনের সারি থাকতো। আজ পুরো এলাকা ছিল প্রায় যানজটমুক্ত।
স্টেশনের কর্মীরা জানান, জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক থাকা ও আতঙ্ক কমে যাওয়ায় এখন গ্রাহকরা প্রয়োজন অনুযায়ী আসছেন। ফলে কোনো বিশৃঙ্খলা বা অতিরিক্ত ভিড় তৈরি হচ্ছে না।
নগরজীবনে স্বস্তি
জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ায় রাজধানীতে যান চলাচলও অনেকটাই সহজ হয়েছে। দীর্ঘ লাইনের কারণে যে তীব্র যানজট তৈরি হতো, তা এখন আর দেখা যাচ্ছে না। পাম্পগুলোতে কর্মীরাও দ্রুত ও স্বাভাবিকভাবে সেবা দিতে পারছেন। শহরের অসংখ্য রাইড শেয়ারিং চালক সবচেয়ে বেশি উপকৃত হয়েছেন। তারা তেলের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল। গত প্রায় দুই মাস তাদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে রোজগারে ব্যাপক টান পড়ে, যা প্রায় স্বাভাবিক হয়ে এসেছে।
‘জ্বালানি তেলের সংকট হবে না’
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সরবরাহ ব্যবস্থার ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে এই স্বস্তির পরিবেশ আরও দীর্ঘস্থায়ী হবে।
জ্বালানি তেলের জন্য হাহাকার পরিস্থিতি থেকে কীভাবে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসছে- এ বিষয়ে জানতে চাইলে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব (অপারেশন অনুবিভাগ) মনির হোসেন চৌধুরী সোমবার বিকেলে জাগো নিউজকে বলেন, ‘সরকার সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সাপ্লাই চেইন ঠিক রেখে পর্যাপ্ত তেল সরবরাহের মাধ্যমে সফলতা পেয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘কয়েকদিন আগে তেজগাঁওয়ের ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশনে জ্বালানি তেল (অকটেন) নিতে মহাখালী রেলক্রসিং পর্যন্ত দীর্ঘ যানবাহনের লাইন লেগে থাকতো। ফিলিং স্টেশনের মালিক কিছুক্ষণ আগে (বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে) আমাকে জানিয়েছেন ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশনে ওই মুহূর্তে মাত্র ছয়টি মোটরসাইকেল রয়েছে।’
জ্বালানি মজুত কেমন আছে, কতদিন চলবে জানতে চাইলে মনির হোসেন চৌধুরী বলেন, ‘জ্বালানি তেলের আপাতত কোনো সংকট নেই। আগামী মে মাসেও জ্বালানি তেলের সংকট হবে না।’ সার্বিক পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে বিপিসিসহ সংশ্লিষ্ট সবাই আপ্রাণ প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
কিউআর কোডভিত্তিক ফুয়েল পাস
সোমবার জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশিকায় বলা হয়, সারাদেশে জ্বালানি ব্যবস্থাপনা আধুনিকায়ন ও সুশৃঙ্খল করতে সরকার কিউআর (QR) কোডভিত্তিক ‘ফুয়েল পাস বিডি’ (Fuel Pass BD) সিস্টেম চালু করেছে। এখন থেকে দেশের সব ফিলিং স্টেশনে মোটরসাইকেলে জ্বালানি সরবরাহের ক্ষেত্রে এই ডিজিটাল পাস ব্যবহার বাধ্যতামূলক। জ্বালানি বিতরণ প্রক্রিয়া তদারকি করতে এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ফিলিং স্টেশনের জন্য জরুরি সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী, অকটেন, পেট্রোল ও ডিজেল প্রদানকারী দেশের সব ফিলিং স্টেশনকে বাধ্যতামূলকভাবে এই সিস্টেমের আওতায় নিবন্ধন করতে হবে।
নিবন্ধন প্রক্রিয়া
গুগল প্লে-স্টোর থেকে ‘Fuel Pass BD’ অ্যাপ ডাউনলোড করে অথবা নির্দিষ্ট ওয়েবসাইটের মাধ্যমে স্টেশনের আইডি ও মোবাইল নম্বর ব্যবহার করে নিবন্ধন সম্পন্ন করতে হবে।
অপারেটর নিয়োগ
ফিলিং স্টেশন মালিক বা ব্যবস্থাপক অ্যাপের মাধ্যমেই প্রয়োজনীয় সংখ্যক অপারেটর নিয়োগ দিতে পারবেন। তবে প্রতিটি অপারেটরের ন্যূনতম একটি অ্যান্ড্রয়েড ফোন এবং সক্রিয় ইন্টারনেট সংযোগ থাকা আবশ্যক।
নির্দেশনায় স্পষ্ট জানানো হয়েছে যে, বর্তমানে মোটরসাইকেলের জন্য এটি চালু হলেও পর্যায়ক্রমে সব যানবাহন এই সিস্টেমের আওতায় আসবে। কিউআর কোড ছাড়া কোনো মোটরসাইকেলে জ্বালানি সরবরাহ করা যাবে না। এই নিয়ম অমান্য করলে সংশ্লিষ্ট ফিলিং স্টেশন কর্তৃপক্ষ বা অপারেটরের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনের আওতায় কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ঢাকার যে ১১ ফিলিং স্টেশনে ফুয়েল পাস কার্যকর
করিম অ্যান্ড সন্স, শাপলা চত্বর, ঢাকা; ইউরেকা এন্টারপ্রাইজ (ফিলিং স্টেশন), মহাখালী, ঢাকা; মাসুদ হাসান ফিলিং স্টেশন, এয়ারপোর্ট, উত্তরা, ঢাকা; মেসার্স সততা অ্যান্ড কোম্পানি, ৪৩৯, তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা; মেসার্স দিগন্ত ফিলিং স্টেশন, সেকশন-১৪, ইব্রাহিমপুর, মিরপুর, ঢাকা; মেসার্স কামাল ট্রেডিং এজেন্সি, ৮০, শহীদ তাজউদ্দিন আহম্মেদ সরণি, তেজগাঁও, ঢাকা; মেসার্স এসপি, ফিলিং স্টেশন লিমিটেড, গাবতলী, মিরপুর, ঢাকা; সিটি ফিলিং স্টেশন, তেজগাঁও ঢাকা-মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেড; সেবা গ্রীন ফিলিং স্টেশন, উত্তরা-মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেড; স্যাম অ্যাসোসিয়েটস, মিরপুর-০২-মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেড; সুমাত্রা ফিলিং স্টেশন-কালশী রোড, মিরপুর।
এসএন/পিডিকে