আন্দোলন করে কি রায় পরিবর্তন করা যায়?

২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সূচনা লগ্নে যে মন্তব্যটি ছাত্র-জনতাকে চরমভাবে ক্ষুব্ধ করেছিল, তা করেছিলেন তৎকালীন প্রধান বিচারপতি ওবায়দুল হাসান। রাষ্ট্রপক্ষের শুনানিকালে অ্যার্টনি জেনারেলকে উদ্দেশ্য করে তিনি উপহাসের ছলে প্রশ্ন তুলেছিলেন— ‘আন্দোলন করে কি আদালতের রায় পরিবর্তন করা যায়?’ তবে তীব্র গণআন্দোলনের মুখে পড়ে পরবর্তীতে তিনি নিজেই সেই অবস্থান থেকে পিছু হঠতে বাধ্য হন এবং শেষ পর্যন্ত নিজের দেওয়া বক্তব্য পরিবর্তন করে কোটা সংস্কারের রায় ঘোষণা করেন। আন্দোলনকারীদের তোপের মুখে ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশ ছাড়ার পর, আত্মগোপনে থাকা অবস্থাতেই ১০ আগস্ট পদত্যাগ করেন তিনি। এরপর থেকে তিনি আজও পলাতক রয়েছেন।

সুপ্রিম কোর্ট ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের নথি এবং বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের তৎকালীন নেতাদের সাক্ষ্য থেকে জানা যায়— ২০২৪ সালের ৫ জুন হাইকোর্ট সরকারি চাকরির প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে (৯ম-১৩তম গ্রেড) মুক্তিযোদ্ধা কোটা বাতিলের ২০১৮ সালের পরিপত্রকে অবৈধ ঘোষণা করেন। এর প্রতিবাদে ৬ জুন থেকে রাজপথে নামেন শিক্ষার্থীরা। ৯ জুন রাষ্ট্রপক্ষ হাইকোর্টের রায় স্থগিতের আবেদন করলে বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিমের চেম্বার জজ আদালত রায় স্থগিত না করে ৪ জুলাই শুনানির দিন ধার্য করেন।

তবে ৪ জুলাই শুনানিকালে তৎকালীন প্রধান বিচারপতি ওবায়দুল হাসান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘রাস্তায় এত কিসের আন্দোলন শুরু হয়েছে? আন্দোলনের চাপ দিয়ে কি হাইকোর্টের রায়, সুপ্রিম কোর্টের রায় পরিবর্তন করবেন?’ এদিন আদালত রাষ্ট্রপক্ষকে নিয়মিত লিভ-টু-আপিল করতে বলে শুনানি পিছিয়ে দেন। তবে দেশের পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে সুর নরম করেন তৎকালীন প্রধান বিচারপতি। ২০২৪ সালের ১১ জুলাই তিনি বলেন, ‘আন্দোলনকারীদের জন্য আদালতের দরজা সবসময় খোলা।’ একইসঙ্গে পরবর্তী শুনানির দিন ৭ আগস্ট ধার্য করা হয়। কিন্তু আন্দোলনের তীব্রতা এবং দেশব্যাপী সহিংসতার মুখে বাধ্য হয়ে শুনানি এগিয়ে এনে ২১ জুলাই আপিল বিভাগ ঐতিহাসিক রায় দেন। রায়ে মেধাভিত্তিক নিয়োগ ৯৩ শতাংশ এবং মুক্তিযোদ্ধা কোটা ৫ শতাংশসহ অন্যান্য কোটা মোট ৭ শতাংশে নামিয়ে আনার নির্দেশ দেওয়া হয়। তবে আপিল বিভাগের এই রায়ের পরও রাজপথ শান্ত হয়নি। ওইদিন (২১ জুলাই) সারা দেশে ইন্টারনেট বিচ্ছিন্ন এবং কারফিউ জারি রেখে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলপ্রয়োগ অব্যাহত রাখে।

২০২৪ সালের ২১ জুলাই নিখোঁজের পরদিন পূর্বাচল থেকে উদ্ধার করা আন্দোলনের সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করেন, তাকে চোখ বেঁধে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হয়েছে। সেদিনই ইন্টারনেট বিচ্ছিন্নতার মাঝেই ৫৬ জন সমন্বয়ক বার্তা পাঠিয় ৩ শতাধিক মানুষের মৃত্যুর অভিযোগ তোলেন এবং বলেন— ‘কেবল আদালতের রায়ের মাধ্যমে এসব হত্যাকাণ্ডের দায় এড়ানো সম্ভব নয়।’

সাবেক সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া জানান, ১৬ জুলাইয়ের পর আন্দোলন কেবল কোটায় সীমাবদ্ধ ছিল না। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদত্যাগ ও কমপ্লিট শাটডাউন কর্মসূচি তখন সামনে চলে আসে। ওই একদিনেই (২১ জুলাই) সারা দেশে অন্তত ১৯ জন নিহত হন।

সাবেক প্রধান বিচারপতির আওয়ামী লীগ আনুগত্য ও নজিরবিহীন সংবর্ধনা

নেত্রকোনার চিহ্নিত আওয়ামী পরিবারের সন্তান ওবায়দুল হাসান সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ছিলেন। তার ভাই সাজ্জাদুল হাসান ছিলেন সাবেক সংসদ সদস্য ও সচিব এবং বাবা ডা. আখলাকুল হোসাইন আহমেদ ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনিষ্ঠজন। ওবায়দুল হাসান প্রধান বিচারপতি হওয়ার পর আদালত প্রাঙ্গণে ছাত্রলীগ তাকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানায়, যা বিচার বিভাগের ইতিহাসে নজিরবিহীন ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হয়।

বর্তমান অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল স্মৃতিচারণ করে বলেন, আন্দোলনের মুখে সাবেক প্রধান বিচারপতি প্রথমে বললেও পরে রায় পরিবর্তন করতে বাধ্য হন। সেই বিতর্কিত বিচারপতি আজ পলাতক।

অ্যাম্বুলেন্সে আত্মগোপন ও পালানোর গল্প

৫ আগস্ট দুপুরে শেখ হাসিনার দেশত্যাগের খবর প্রচারিত হওয়ার পর হেয়ার রোডের সরকারি বাসভবনে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন ওবায়দুল হাসান। পরবর্তীতে ছাত্র-জনতার ক্ষোভের ভয়ে তিনি কৌশলে নিজের বাসভবন ছাড়েন। দুপুর ২টায় নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অ্যাম্বুলেন্সে চেপে দ্রুত হেয়ার রোড থেকে বের হয়ে তিনি সংসদ সদস্যদের একটি ভবনে আশ্রয় নেন। পরবর্তীতে বিকেলে মিন্টো রোডের একটি ফ্ল্যাটে অবস্থানরত আরও তিন বিচারপতিসহ তাকে গোয়েন্দা সংস্থার সাদা পোশাকের সদস্যরা নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেন। রাজপথের আন্দোলনকে তুচ্ছজ্ঞান করা সেই সাবেক শীর্ষ বিচারক পদত্যাগপত্র পাঠানোর পর থেকে আজ পর্যন্ত আত্মগোপনে রয়েছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *