অন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে কুমিল্লার সাবেক সংসদ সদস্য হিরু ও বিএনপিনেতা পারভেজ গুম মামলার আসামি হরিণাকুণ্ডু থানার পরিদর্শক (তদন্ত) অসিত কুমার রায়কে ঝিনাইদহ পুলিশ লাইনসে ক্লোজড করা হয়েছে। পুলিশ সুপার কার্যালয় থেকে ১৩ আগস্ট আদেশ জারি করা হলেও ১৫ আগস্ট ঝিনাইদহ পুলিশ লাইনসে সংযুক্ত করা হয় তাকে।
এ খবর নিশ্চিত করেছেন হরিণাকুণ্ডু-শৈলকুপা সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) মো. আক্তারুজ্জামান। হরিণাকুণ্ডু থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) পদ শূন্য থাকায় ওসির দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন অসিত কুমার রায়।
অন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মামলা সূত্রে জানা যায়, ২০১৩ সালের ২৭ নভেম্বর লাগাতার অবরোধ কর্মসূচি চলাকালীন কুমিল্লা জেলার লাকসামে রাত অনুমান ৯টার দিকে পুলিশ-র্যাবের যৌথ বাহিনী সাবেক সংসদ সদস্য সাইফুল ইসলাম হিরুর মালিকানাধীন লাকসাম ফ্লাওয়ার মিলে অভিযান চালিয়ে নয়জনকে আটক করে। খবর পেয়ে সাইফুল ইসলাম হিরু, হুমায়ুন কবির পারভেজ ও সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক (বিএনপি) জসিম উদ্দিন একটি অ্যাম্বুলেন্সে করে কুমিল্লার দিকে রওনা হন। পথে কুমিল্লা-নোয়াখালী আঞ্চলিক মহাসড়কের লালমাই উপজেলার হরিশ্চর-আলীশ্বর এলাকায় র্যাব পরিচয়ে অ্যাম্বুলেন্সে গতি রোধ করা হয়। এরপর একটি সাদা মাইক্রোবাসে তুলে নিয়ে যাওয়া হয় তাদের। ওই সময় পুলিশের এসআই হিসেবে র্যাবে কর্মরত ছিলেন অসিত কুমার রায় এবং অপহরণ টিমে ছিলেন তিনি। ওই দিন (২৭ নভেম্বর ২০১৩) মধ্যরাতে জসিম উদ্দিনসহ লাকসাম ফ্লাওয়ার মিল থেকে আটক নয়জনকে সংশ্লিষ্ট লাকসাম থানায় হস্তান্তর করা হয়। কিন্তু সাবেক সংসদ সদস্য সাইফুল ইসলাম হিরু ও হুমায়ুন কবির পারভেজকে থানায় হস্তান্তর করেনি র্যাব।
২০১৪ সালের ১৮ মে নিখোঁজ হুমায়ুন কবিরের বাবা রঙ্গু মিয়া বাদী হয়ে কুমিল্লা আদালতে র্যাব ১১-এর পাঁচ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অপহরণ ও গুমের পিটিশন মামলা করেন। অভিযোগে র্যাব ১১-এর তৎকালীন অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল তারেক সাঈদ মোহাম্মদ (নারায়ণগঞ্জের সাত খুন মামলায় মৃত্যুদণ্ডাদেশপ্রাপ্ত) কোম্পানির অধিনায়ক মেজর শাহেদ হাসান (রাজিব), শাহজাহান আলী (ডিএডি), এসআই কাজী সুলতান আহমেদ এসআই অসিত কুমার রায়কে (বর্তমান পরিদর্শক) আসামি করা হয়।
২০১৪ সালের ৩১ আগস্ট পিটিশন মামলার মূল বাদী রঙ্গু মিয়া মারা যান। কিন্ত প্রায় এক যুগ পেরিয়ে গেলেও পুলিশ, সিআইডি এবং পিবিআই কার্যত নিরপেক্ষ প্রতিবেদন আদালতে জমা দেয়নি। বর্তমানে মামলাটি পরিচালনা করছেন রঙ্গু মিয়া ছোট ছেলে গোলাম ফারুক। সম্প্রতি ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর গুম সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনে যাবতীয় তথ্য-উপাত্ত জমা দিয়ে ন্যায়বিচার প্রার্থনা করেন তিনি।
স্বজনরা অভিযোগ করেছেন সেসময় রাজনৈতিক প্রতিহিংসার মেটাতে বিএনপির এই শীর্ষ দুই নেতাকে (সাবেক সংসদ সদস্য সাইফুল ইসলাম হিরু ও হুমায়ুন কবির পারভেজ) গুম করা হয়েছিল।
তবে পুলিশ সুপার মিয়া মোহাম্মদ আশীষ বিন হাছান এনটিভি অনলাইনকে জানান কোনো অভিযোগের ভিত্তিতে পরিদর্শক অসিত কুমার রায়কে ক্লোজড করা হয়নি। হরিণাকুণ্ডু থানায় নতুন ওসি যোগদান করায় পুলিশ লাইনসে সংযুক্তি হিসেবে রাখা হয়েছে। তবে তিনি স্বীকার করেন, পরিদর্শক অসিত কুমার রায়ের বিরুদ্ধে অন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে হত্যাসহ গুমের অভিযোগ করা হয়েছে বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমে খবর প্রকাশ পেয়েছে। কিন্তু পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স থেকে এখনও কোনো নির্দেশ পাননি তিনি।
এ বিষয়ে জানতে অসিত কুমার রায়ের ব্যক্তিগত মোবাইল ফোন নম্বরে যোগাযোগ করা হলে তিনি রিসিভ করেননি।
হরিণাকুণ্ডু থানার নবাগত ওসি জুলফিকার আলী বলেন, অসিত রায় ১৫ আগস্ট থানা থেকে বিদায় নিয়েছেন। তাকে পুলিশ লাইনসে সংযুক্ত করা হয়েছে। তবে তিনি বিএনপিনেতা গুম ও হত্যা মামলার আসামি কি না তা জানি না।
অসিত কুমার রায় ২০০৮ সালে উপপরিদর্শক (এসআই) পদে শিক্ষানবিশ হিসেবে যোগদান করেন। তার বাড়ি খুলনায়। হরিণাকুণ্ডু থানায় যোগদানের আগে তিনি মাগুরায় গোয়েন্দা (ডিবি) ইউনিট থেকে ঝিনাইদহ জেলার শৈলকুপা সার্কেল অফিসে এবং ২০২৫ সালের ৭ ডিসেম্বর হরিণাকুণ্ডু থানায় যোগদান করেন।