ভারতের জালে ব্রাজিলের একহালি, তবুও উচ্ছ্বসিত কলকাতা

ভারতের দর্শকদের উচ্ছ্বাস যেন সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ছিল তিনটি মুহূর্তে। ভারতের কোনো ইন্টারসেপশন, ভারতের কোনো ফরোয়ার্ড পাস, আর ভিনিসিয়াস জুনিয়রের বলে যেকোনো ধরনের স্পর্শে। গ্যালারির প্রতিক্রিয়ায় বারবারই বোঝা যাচ্ছিল, এই ম্যাচটি শুধু একটি আন্তর্জাতিক ফুটবল ম্যাচ নয়। কলকাতার দর্শকদের কাছে এটি ছিল বিশ্বমানের ফুটবলারদের একেবারে সামনে থেকে দেখার বিরল সুযোগ।

যে ম্যাচে জয়-পরাজয়ের হিসাবের চেয়েও বড় হয়ে ওঠে মাঠের ফুটবল উপভোগ করা, সেখানে এমন উচ্ছ্বাস খুব একটা অস্বাভাবিক নয়। একদিকে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল, অন্যদিকে ভারতের মাটিতে সেই দলের তারকাদের উপস্থিতি। তার ওপর সময়ের অন্যতম আলোচিত ফরোয়ার্ড ভিনিসিয়াস জুনিয়র বল পায়ে মাঠে ছুটছেন। এমন দৃশ্য ভারতের ফুটবলপ্রেমীদের জন্য যে বিশেষ কিছু, তা ম্যাচের শুরু থেকেই গ্যালারির প্রতিক্রিয়ায় স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল।

কলকাতার যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে তাই ফলাফলের চেয়ে অনেক দর্শকের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল এই ঐতিহাসিক ফুটবল অভিজ্ঞতা। ব্রাজিলের প্রতিটি আক্রমণ, প্রতিটি পাস, প্রতিপক্ষের বক্সের কাছে বলের প্রতিটি স্পর্শ এবং ভিনিসিয়াসের প্রতিটি মুহূর্তই গ্যালারিতে তৈরি করছিল বাড়তি উন্মাদনা। ভারতের কোনো খেলোয়াড় ব্রাজিলের আক্রমণ থামিয়ে বল কেড়ে নিলেও গ্যালারি থেকে পাওয়া যাচ্ছিল উচ্ছ্বাস। আবার ভারত সামান্য এগিয়ে গিয়ে আক্রমণের চেষ্টা করলেই সেটিও পরিণত হচ্ছিল হাততালি আর সমর্থনের মুহূর্তে।

তবে মাঠের হিসাব ছিল একেবারেই আলাদা। ম্যাচে যে দলকে এগিয়ে থাকার কথা ছিল, শেষ পর্যন্ত জয়ও পেয়েছে তারাই। ৯০ মিনিটের লড়াই শেষে ভারতকে ৪-০ গোলে হারিয়েছে ব্রাজিল।

ম্যাচের শুরু থেকেই বলের দখল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখে ব্রাজিল। ভিনিসিয়াস জুনিয়র, এস্তেভাও ও পেদ্রোকে সামনে রেখে ভারতের রক্ষণভাগের ওপর একের পর এক আক্রমণ তৈরি করতে থাকে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। বল নিজেদের পায়ে রেখে ছোট ছোট পাসে ভারতের রক্ষণ ভাঙার চেষ্টা করছিল তারা। অন্যদিকে, ভারতও পুরোপুরি রক্ষণাত্মক হয়ে থাকেনি। সুযোগ পেলেই দ্রুত পাল্টা আক্রমণে ওঠার চেষ্টা করেছে স্বাগতিক দল।

ব্রাজিলের ধারাবাহিক চাপের ফল আসে ২৮তম মিনিটে। আক্রমণ থেকে পাওয়া সুযোগ কাজে লাগিয়ে গোল করেন এস্তেভাও। তার গোলেই প্রথমবারের মতো ভারতের রক্ষণভাগ ভেদ করে ব্রাজিল। ১-০ গোলে এগিয়ে যায় সফরকারীরা।

গোল পাওয়ার পরও আক্রমণের ধার কমায়নি ব্রাজিল। বরং প্রথমার্ধের শেষ দিকে ভারতের ওপর চাপ আরও বাড়তে থাকে। একের পর এক আক্রমণে ব্যস্ত রাখতে থাকে স্বাগতিক রক্ষণকে। ৩৬তম মিনিটে ব্যবধান দ্বিগুণ করার খুব কাছাকাছি চলে গিয়েছিল ব্রাজিল। পেদ্রোর হেড পোস্টে লেগে ফিরে আসায় তখন স্বস্তি পেয়েছিল ভারত।

তবে সেই স্বস্তি বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। ৪২তম মিনিটে আবারও ভারতের রক্ষণে তৈরি হয় বিপদ। এস্তেভাওর তৈরি করে দেওয়া সুযোগ কাজে লাগিয়ে এবার গোল করেন পেদ্রো। তার গোলে ব্রাজিলের ব্যবধান দাঁড়ায় ২-০। প্রথমার্ধের বাকি সময়ে আর কোনো গোল না হওয়ায় দুই গোলের লিড নিয়েই বিরতিতে যায় ব্রাজিল।

দ্বিতীয়ার্ধে অবশ্য কিছুটা ভিন্ন চেহারায় দেখা যায় ভারতকে। বিরতির পর আক্রমণে আরও বেশি মনোযোগ দেয় স্বাগতিকরা। নিজেদের অর্ধ থেকে দ্রুত বল বের করে ব্রাজিলের রক্ষণে চাপ তৈরির চেষ্টা করতে থাকে তারা। ম্যাচে ফেরার জন্য ভারতের খেলোয়াড়দের মধ্যে সেই সময় কিছুটা বেশি আগ্রাসনও দেখা যায়।

ম্যাচের ৫৩তম মিনিটে গোলের দারুণ একটি সুযোগ তৈরি করেছিল ভারত। কিন্তু শেষ মুহূর্তে সেই সুযোগ কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি। এর কয়েক মিনিট পর আবারও গোলের কাছাকাছি চলে যায় স্বাগতিক দল। তবে ব্রাজিলের রক্ষণভাগের দৃঢ়তায় সেই আক্রমণও গোলের মুখ দেখতে পারেনি।

ভারত যখন ম্যাচে ফেরার জন্য মরিয়া হয়ে আক্রমণ চালাচ্ছিল, ঠিক তখনই পাল্টা আক্রমণের সুযোগ পেয়ে যায় ব্রাজিল। ৫৮তম মিনিটে দ্রুত আক্রমণে উঠে ভারতের রক্ষণভাগের ফাঁক কাজে লাগান স্যামুয়েল লিনো। ডান পায়ের জোরালো শটে তিনি বল জালে পাঠিয়ে ব্রাজিলের ব্যবধান বাড়িয়ে দেন।

তৃতীয় গোলের পর ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ আরও দৃঢ়ভাবে নিজেদের হাতে নিয়ে নেয় ব্রাজিল। ভারত শেষ পর্যন্ত চেষ্টা চালিয়ে যায় অন্তত ব্যবধান কমানোর। কয়েকবার আক্রমণও তৈরি করে স্বাগতিকরা। কিন্তু ব্রাজিলের রক্ষণভাগের দৃঢ়তা এবং আক্রমণভাগের ধার, দুইয়ের সামনে কাঙ্ক্ষিত গোলটি আর পায়নি ভারত।

ম্যাচের শেষদিকে আবারও ব্রাজিলের আক্রমণ দেখা যায়। অতিরিক্ত যোগ করা সময়ে স্যামুয়েল লিনো আবারও ডান পায়ের জোরালো শটে গোল করে ব্যবধান আরও বাড়িয়ে দেন। ফলে ব্রাজিলের লিড দাঁড়ায় ৪-০। এই স্কোর লাইন নিয়েই মাঠ ছাড়ে দুই দল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *