ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে ‘৩৬ জুলাই’ (২০২৪ সালের ৫ আগস্ট) স্বৈরাচার আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয় এবং দেশ ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যান শেখ হাসিনা। ক্ষমতার অপব্যবহারে বাংলাদেশের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো সরকারপ্রধান দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হন।
শেখ হাসিনার পলায়নের পরে অনেক কিছুর সঙ্গে পরিবর্তন হয় দেশের আদালতের দৃশ্যপটও।
আওয়ামী লীগের ১৫ বছরের শাসনামলে বিএনপি-জামায়াতসহ বিরোধী দলীয় নেতা-কর্মীদের জামিন পাওয়ার প্রক্রিয়া ছিল অত্যন্ত কঠিন। ছাত্র আন্দোলনের নেতাকর্মীরাও আইনি হেনস্থার শিকার হতেন। নানা অজুহাতে রিমান্ডে নেওয়া হতো। রিমান্ডে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের একের পর এক অভিযোগ সামনে আসতে থাকে। এছাড়া আদালতের কার্যক্রমে রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ উঠত প্রায়ই।
৫ আগস্টের আগে জামিন ছিল অকল্পনীয়
আদালত ছিল সংকুচিত এবং রাজনৈতিকভাবে নিয়ন্ত্রিত। তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের কঠোর অবস্থানের কারণে আন্দোলনকারী ও বিরোধী দলগুলোর নেতাদের আইনি সুযোগ পাওয়া প্রায় অসম্ভব ছিল। নিম্ন ও উচ্চ আদালত থেকে জামিন পেলেও পুনরায় নতুন মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে আটক রাখা হতো। ফলে দিনের পরে দিন কারাগারে কাটাতো হতো নেতা-কর্মীদের।
রিমান্ডের হিড়িক
কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে চব্বিশের জুলাইয়ের মাঝামাঝি থেকে শুরু হওয়া দেশব্যাপী সহিংসতার অভিযোগে বিএনপি ও জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের গণহারে গ্রেপ্তার করা হয়। আদালতে জামিন আবেদন করা হলে তা প্রায় প্রতিবারই নামঞ্জুর হতো। উল্টো আদালত বিরোধীদলীয় রাজনৈতিক নেতাদের দফায় দফায় বিভিন্ন মেয়াদের রিমান্ডের আদেশ দিতেন।
শ্যোন অ্যারেস্ট আতঙ্ক
’৩৬ জুলাই’য়ের (২০২৪ সালের ৫ আগস্ট) আগে বিরোধীদলীয় নেতাকর্মী ও বৈষম্যবিরোধী নেতাকর্মীরা উচ্চ ও নিম্ন আদালত থেকে জামিন পেলেও শ্যোন অ্যারেস্ট ছিল বড় আতঙ্ক। শ্যোন অ্যারেস্টের কারণে বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীরা কারাগার থেকে মুক্তি পেতেন না।
গায়েবি মামলা
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বড় সমালোচনার জায়গা ছিল গায়েবি মামলা। মৃত ব্যক্তিদেরও এই মামলায় আসামি করা হয়। ব্যাপক সমালোচনার পরেও গায়েবি মামলায় বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার করে কারাগারে রাখা হয়।
৫ আগস্টের পর পরিবর্তন হয় দৃশ্যপট
চব্বিশের ৫ আগস্টের পরে আদালতের দৃশ্যপটে ব্যাপক পরিবর্তন আসে। স্বৈরাচার সরকারের পতনের পরদিনই অর্থাৎ ৬ আগস্ট থেকে বিরোধীদলীয় রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের ঢালাওভাবে জামিন দেওয়া হয়। যা ৫ আগস্টের আগে ছিল অকল্পনীয়।
জামিন পাওয়া ব্যক্তিদেরমধ্যে ছিলেন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী ও জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, বিএনপি চেয়ারপারসনের বিশেষ সহকারী শামসুর রহমান ওরফে শিমুল বিশ্বাস, ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির আহ্বায়ক সাইফুল আলম নীরব, দক্ষিণের আহ্বায়ক রফিকুল ইসলাম মজনু, ১২ দলের সমন্বয়ক সৈয়দ এহসানুল হুদা, বিএনপির প্রচার সম্পাদক সুলতান সালাউদ্দিন টুকু, ঢাকা মহানগর উত্তরের সদস্য সচিব আমিনুল হক, বাগেরহাট জেলা বিএনপির আহ্বায়ক এমএ সালাম ও বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি।
একদিনে জামিন পান ২২০০ নেতাকর্মী
২০২৪ সালের ৬ আগস্ট কোটা সংস্কার আন্দোলনের নামে নাশকতার মামলায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীসহ বিএনপি-জামায়াতের দুই হাজার ২০০ নেতাকর্মীর জামিন পান।
নিম্ন আদালতে বিএনপিপন্থী আইনজীবীদের আনন্দ মিছিল
৫ আগস্টের আগে বিএনপিপন্থী আইনজীবীদের রাজনৈতিক কোনো কার্যকলাপে অংশ নিতে দেয়নি তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার। উল্টো বিএনপি সমর্থিত আইনজীবীদের চেম্বারে ভাঙচুর করা হয়। ৫ আগস্টের পরে বিএনপিপন্থী আইনজীবীরা আদালতে বিজয় উল্লাস করেন। এরপর প্রত্যেকটি আদালতের ভেতরে দেয়ালে টাঙানো শেখ মুজিবুর রহমান ও শেখ হাসিনার ছবি নামিয়ে তাতে আগুন দেন।
ঢাকা আইনজীবী সমিতির সভাপতি-সেক্রেটারির কার্যালয় ভাঙচুর
শেখ হাসিনার পতনের পর ঢাকার নিম্ন আদালতে বিএনপিপন্থী আইনজীবীরা আনন্দ মিছিল করে। ৬ আগস্ট সকালে ঢাকা আইনজীবী সমিতির সভাপতি আবদুর রহমান হাওলাদার, সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার শাহাদাতের কার্যালয়ে ও আওয়ামীপন্থী আইনজীবীদের চেম্বারে ভাঙচুর করা হয়।
মুক্তি পান বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া
৫ আগস্টের পরে বিএনপি চেয়ারপারসন ও তিনবারের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে মুক্তি দেওয়া হয়। ৬ আগস্ট এক আদেশে তাকে মুক্তি দেওয়া হয়। দুর্নীতি মামলায় ৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ সালে খালেদা জিয়াকে কারাগারে পাঠানো হয়েছিল। পরে বাসায় থেকে চিকিৎসা ও বিদেশে না যাওয়ার শর্তসাপেক্ষে ছয় মাসের জন্য কারাগার থেকে মুক্তি দেওয়া হয়। পরে কয়েক দফায় সেই মেয়াদ বাড়ানো হয়।
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের ছয় মাসের সাজা বাতিল
শ্রম আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে করা মামলায় নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে দেওয়া ছয় মাসের সাজা বাতিল করেন কাকরাইলের শ্রম আপিল ট্রাইব্যুনাল। ২০২৪ সালের ৭ আগস্ট বিকেলে শ্রম আপিল ট্রাইব্যুনালের বিচারক এম এ আউয়াল এ আদেশ দেন। আদালতে ড. ইউনূসের পক্ষে শুনানি করেন ব্যারিস্টার আবদুল্লাহ আল মামুন।
২০২৪ সালের ১ জানুয়ারি শ্রম আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে করা মামলায় ড. মুহাম্মদ ইউনূসসহ চারজনকে ছয় মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছিলেন আদালত। একইসঙ্গে প্রত্যেককে ৩০ হাজার টাকা করে জরিমানাও করা হয়।