বনদস্যুদের নির্যাতন থেকে বাঁচতে নদীতে ঝাঁপ দিয়ে জীবন বাঁচানোর মরিয়া চেষ্টা করে চার দিন পর মায়ের বুকে ফিরেছে ১৬ বছরের কিশোর মেহেদী হাসান। কিন্তু তার শরীরজুড়ে এখনও নির্যাতনের ক্ষত, চোখেমুখে ভয়াবহ দুঃসহ স্মৃতির ছাপ।
জীবিকার তাগিদে গত বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) সুন্দরবনের গহিন অরণ্যের একটি খালে কাঁকড়া ধরতে যায় কয়রা উপজেলার ৫ নম্বর কয়রা গ্রামের ভ্যানচালক মো. আব্দুল্লাহ সরদারের ছেলে মেহেদী হাসান। বন এলাকায় প্রবেশের কিছুক্ষণ পরই কুখ্যাত আফজাল বাহিনীর সদস্যরা তাকে অপহরণ করে।
অপহরণের পর দস্যুরা মেহেদীর পরিবারের কাছে ৪০ হাজার টাকা মুক্তিপণ দাবি করে। অসহায় বাবা ধারদেনা করে ২৫ হাজার টাকা জোগাড় করে দস্যুদের হাতে পৌঁছে দিলেও পুরো টাকা না পাওয়ায় তারা তাকে মুক্তি দেয়নি। বরং চলে অমানবিক নির্যাতন।
পরের দিন শুক্রবার (১৭ জুলাই) সকাল ৯টার দিকে প্রবল বৃষ্টির সুযোগে জীবন বাঁচানোর শেষ চেষ্টা হিসেবে দস্যুদের নৌকা থেকে নদীতে ঝাঁপ দেয় মেহেদী। এরপর নদীর স্রোত, বন আর অজানা আতঙ্কের মধ্যেই কেটে যায় বিভীষিকাময় কয়েকটি দিন। এ সময় পরিবারের কেউ জানত না—সে বেঁচে আছে, নাকি সুন্দরবনের অন্ধকারেই হারিয়ে গেছে।
মেহেদীর সন্ধানে গত রোববার শত শত গ্রামবাসী সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকায় দিনভর খোঁজাখুঁজি করে। কিন্তু কোনো সন্ধান না পেয়ে হতাশ হয়ে ফিরে আসে তারা। স্বজনদের কান্না আর উৎকণ্ঠায় ভারি হয়ে ওঠে পুরো গ্রাম।
অবশেষে রোববার (১৯ জুলাই) বেদকাশী এলাকার একটি নৌকার মাঝি সুন্দরবন থেকে মেহেদীকে উদ্ধার করে। খবর পেয়ে স্বজনরা ছুটে গিয়ে তাকে বাড়িতে নিয়ে আসে। দীর্ঘ অনাহার, বনদস্যুদের নির্যাতন এবং চার দিন বনে-নদীতে কাটানোর কারণে সে অসুস্থ হয়ে পড়েছে। প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে বাড়ি আনা হয়েছে তাকে।
স্থানীয়রা জানায়, আফজাল একসময় কুখ্যাত ‘দোলাভাই বাহিনী’র দ্বিতীয় শীর্ষ নেতা ছিল। গত ২৭ জুন কোস্ট গার্ডের অভিযানের পর দলটি ছত্রভঙ্গ হলে আফজালের নেতৃত্বে নতুন করে একটি বনদস্যুচক্র গড়ে ওঠে। এরপর থেকেই সুন্দরবনে জেলে ও বাওয়ালিদের অপহরণ, নির্যাতন এবং মুক্তিপণ আদায়ের ঘটনা বেড়েছে, যা উপকূলীয় জনপদে নতুন করে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে।
মেহেদীর চাচা আব্দুল বারী সরদার বলেন, মেহেদীসহ সমবয়সী পাঁচজন মিলে সুন্দরবনের গহিন অরণ্যের একটি খালে কাঁকড়া ধরতে গিয়েছিল। সেখান থেকে বনদস্যুরা তাকে জিম্মি করে মুক্তিপণ দাবি করে। কষ্ট করে ২৫ হাজার টাকা জোগাড় করে দিলে অন্য চার জনকে ছেড়ে দেয়। আর তাকে আটকে রেখে আরও টাকা দাবি করে। একপর্যায়ে সে নদীতে ঝাঁপ দেয়। আমরা ভেবেছিলাম ওকে আর কোনো দিন ফিরে পাব না। গ্রামের মানুষকে নিয়ে বনেও খুঁজতে গিয়েছিলাম। আল্লাহর অশেষ রহমতে তাকে জীবিত ফিরে পেয়েছি।
কাশিয়াবাদ ফরেস্ট স্টেশনের কর্মকর্তা নাসির উদ্দীন বলেন, কাঁকড়া ধরার বিষয়টি জানা ছিল না। ছেলেটি নিখোঁজ হওয়ার পরে তার স্বজনদের মাধ্যমে জানি। পরে উদ্ধারের জন্য তার স্বজনদের বনে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়।