ভারত-যুক্তরাষ্ট্রের খনিজ চুক্তি স্বাক্ষর : এতে কী আছে, কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ?

ভবিষ্যতের প্রযুক্তি, সেমিকন্ডাক্টর ও সামরিক সরঞ্জামের মূল উপাদান হিসেবে পরিচিত ‘গুরুত্বপূর্ণ খনিজ’ এবং ‘দুর্লভ মৃত্তিকা’র সরবরাহ নিশ্চিত করতে একটি বড় ধরনের কাঠামো চুক্তি স্বাক্ষর করেছে ভারত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। চীনের একচেটিয়া আধিপত্যের বাজারে বড় ধাক্কা দিতে ও সংবেদনশীল প্রযুক্তি পণ্যের সরবরাহ শৃঙ্খল সুরক্ষিত করতে এই কৌশলগত পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। খবর আল জাজিরার।

আজ মঙ্গলবার (২৬ মে) নয়াদিল্লিতে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর এবং চার দিনের সফরে ভারতে অবস্থানরত মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর মধ্যে এক দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে চুক্তিটি চূড়ান্ত হয়।

গুরুত্বপূর্ণ খনিজ কী এবং কেন এগুলো এত প্রয়োজনীয়?

গুরুত্বপূর্ণ খনিজ হলো জ্বালানি-বহির্ভূত এমন কিছু বিশেষ খনিজ ও মৌল (যেমন : নিকেল, কোবাল্ট, লিথিয়াম, অ্যালুমিনিয়াম এবং জিঙ্ক), যা বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যাটারি, ঘড়ি, সামরিক সরঞ্জাম, সেমিকন্ডাক্টর, রোবোটিক্স এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির হার্ডওয়্যার তৈরিতে ব্যবহৃত হয়।

যুক্তরাষ্ট্র এই খনিজগুলোকে তাদের অর্থনৈতিক ও জাতীয় নিরাপত্তার জন্য ‘অপরিহার্য’ মনে করে। বর্তমানে ১২টি গুরুত্বপূর্ণ খনিজের জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সম্পূর্ণরূপে এবং অতিরিক্ত ২৯টির জন্য অন্তত অর্ধেক আমদানির ওপর নির্ভরশীল। এছাড়া পর্যায় সারণির ১৫টি ল্যান্থানাইড, স্ক্যান্ডিয়াম ও ইট্রিয়ামসহ ১৭টি বিরল মৃত্তিকা মৌল রয়েছে, যা উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন চুম্বক এবং উন্নত চিকিৎসা যন্ত্রপাতির জন্য অত্যন্ত জরুরি।

খনিজ বাজারে চীনের একচেটিয়া আধিপত্য ও মার্কিন কৌশল

বর্তমানে বিশ্বের বিরল মৃত্তিকা খনিজের সরবরাহের সিংহভাগই চীনের নিয়ন্ত্রণে। বিশ্বের মোট খনিজ মজুতের ৬০ শতাংশ একাই চীনে অবস্থিত ও বিশ্বের মোট সরবরাহের ৯০ শতাংশ চীন একাই প্রক্রিয়াজাত করে। এই খনিজগুলো উত্তোলনের প্রক্রিয়া অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং এতে বিষাক্ত রাসায়নিক বর্জ্য তৈরি হয়। বিশেষ করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমলে, ওয়াশিংটন চীনের ওপর এই অতি-নির্ভরশীলতা কমাতে বিকল্প ও বৈচিত্র্যময় খনিজ উৎস খোঁজার জন্য তীব্র চাপ দিয়ে আসছে।

ভারত-যুক্তরাষ্ট্র খনিজ কাঠামোর মূল লক্ষ্য

ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এই চুক্তির মূল লক্ষ্য হলো খনির কাজ, প্রক্রিয়াকরণ, পুনর্ব্যবহার এবং সংশ্লিষ্ট বিনিয়োগসহ জরুরি খনিজ ও বিরল মৃত্তিকার পুরো সরবরাহ শৃঙ্খল জুড়ে দুই দেশের সহযোগিতা আরও গভীর করা। এর আগে ফেব্রুয়ারি মাসে ভারত নিরাপদ সেমিকন্ডাক্টর এবং এআই সরবরাহ শৃঙ্খলের জন্য মার্কিন নেতৃত্বাধীন ‘প্যাক্স সিলিকা’ উদ্যোগে যোগ দিয়েছিল।

মার্কিন দূতাবাস এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ‘এই কাঠামোর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত জবরদস্তিমূলক বাজার কার্যকলাপ থেকে সংবেদনশীল সরবরাহ শৃঙ্খলকে রক্ষা করতে এবং একক-উৎস একচেটিয়া আধিপত্যের (চীনের দিকে ইঙ্গিত করে) প্রতি যৌথ দুর্বলতা কমাতে আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টায় যুক্ত হবে।’

২০২৩ সালের জুলাই মাসে ভারত সরকার ৩০টি খনিজের একটি তালিকা প্রকাশ করে সেগুলোকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে ঘোষণা করেছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ভারতে ১৩ দশমিক ১৫ মিলিয়ন টন মোনাজাইট রয়েছে, যাতে ৭ দশমিক ২৩ মিলিয়ন টন রেয়ার আর্থ অক্সাইড (আরইও) আছে। তবে ইউএস জিওলজিক্যাল সার্ভের তথ্যমতে, চীনের মজুদে ৪৪ মিলিয়ন টন আরইও রয়েছে, যা বিশ্বের মোট মজুতের অর্ধেক।

ইউএস ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (আইটিএ) সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, উপযুক্ত অবকাঠামো ও আধুনিক প্রক্রিয়াকরণ প্রযুক্তির অভাবে ভারত বর্তমানে মাত্র ৪টি গুরুত্বপূর্ণ খনিজ (তামা, গ্রাফাইট, ফসফরাস ও টাইটানিয়াম) উৎপাদন করতে পারছে। তবে নতুন বাজেটে (২০২৬-২০২৭ অর্থবছর) ভারত সরকার ওড়িশা, কেরালা, অন্ধ্রপ্রদেশ এবং তামিলনাড়ুতে ‘বিরল মৃত্তিকা করিডোর’ তৈরির জন্য নতুন নীতি গ্রহণ করেছে, যা বৈদ্যুতিক গাড়ি ও উন্নত প্রযুক্তির জন্য খনিজ প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্র হিসেবে কাজ করবে।

কোয়াড -এর ২০ বিলিয়ন ডলারের বড় উদ্যোগ

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও আজ মঙ্গলবার নয়াদিল্লিতে অনানুষ্ঠানিক নিরাপত্তা ফোরাম ‘কোয়াড’ (যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, অস্ট্রেলিয়া ও ভারত)-এর পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে অংশ নেওয়ার আগে এই দ্বিপাক্ষিক চুক্তি করেন। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আজ কোয়াড দেশগুলোর মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ খনিজ কাঠামো ঘোষণা করেছে।

নথি অনুযায়ী, কোয়াড সরকার ও বেসরকারি সংস্থাগুলো ঋণ, গ্যারান্টি, ভর্তুকি এবং দীর্ঘমেয়াদি ক্রয় চুক্তির মাধ্যমে এই খনিজ খাতের উন্নয়নে ২০ বিলিয়ন ডলার (২০০০ কোটি ডলার) পর্যন্ত তহবিল সংগ্রহের পরিকল্পনা করছে। এই অর্থ নির্দিষ্ট কিছু দেশের (চীন) ওপর নির্ভরতা কমাতে খনিজ উত্তোলন, প্রক্রিয়াকরণ এবং সমমনা দেশগুলোর মধ্যে পুনর্ব্যবহার প্রকল্পে ব্যবহার করা হবে।

অন্যান্য দেশের সঙ্গে মার্কিন খনিজ চুক্তি

চীনের প্রভাব রুখতে বিশ্বজুড়ে মার্কিন প্রশাসন খনিজ চুক্তি বাড়াচ্ছে :

পাকিস্তান : গত ডিসেম্বরে পাকিস্তানের বেলুচিস্তানের রেকো ডিক-এ গুরুত্বপূর্ণ খনিজ উত্তোলনে ১.২৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের ঘোষণা দেয় যুক্তরাষ্ট্র।

অন্যান্য দেশ : গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র আর্জেন্টিনা, ইকুয়েডর, গিনি, মরক্কো, পেরু, ফিলিপাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও যুক্তরাজ্যসহ ১১টি দেশের সাথে খনিজ কাঠামো চুক্তি স্বাক্ষর করেছে।

দক্ষিণ আফ্রিকা : গত এপ্রিলে ফালাবোরওয়া রেয়ার আর্থস প্রকল্পে ৫০ মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে মার্কিন প্রশাসন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *