বিশ্ববাজারে বড় ধস, আগের দামে ফিরছে স্বর্ণ

আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দামে বড় ধস নেমেছে। মার্কিন ডলারের অভূতপূর্ব উত্থান ও ফেডারেল রিজার্ভ কর্তৃক সুদের হার বৃদ্ধির জোরালো পূর্বাভাসের জেরে বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দাম কমে গত দুই সপ্তাহের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে চলে এসেছে।

বৈশ্বিক বাজারের প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের বাজারেও। আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করে দেশের বাজারে সব ধরনের স্বর্ণের দাম এক ধাক্কায় ভরিতে সর্বোচ্চ ৫ হাজার ৪৮২ টাকা পর্যন্ত কমিয়েছে বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস)। আজ বুধবার (২৪ জুন) সকাল ১০টা থেকে নতুন এই দাম কার্যকর করা হয়েছে। 

বাজার বিশ্লেষকেরা বলছেন, ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা ও মার্কিন-ইরান শান্তি চুক্তি নিয়ে ধোঁয়াশার কারণে বিনিয়োগকারীরা নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে স্বর্ণের চেয়ে ডলারকে বেশি বেছে নিচ্ছেন। ফলে স্বর্ণের দাম কমছে। এই ধারা অব্যাহত থাকলে স্বর্ণের দাম আগের স্বাভাবিক স্তরে ফিরে যেতে পারে।

বিশ্ববাজারের সর্বশেষ চিত্র

আজ আন্তর্জাতিক স্পট মার্কেটে প্রতি আউন্স (৩১ দশমিক ১০৩ গ্রাম) স্বর্ণের দাম ১ শতাংশ কমে ৪ হাজার ৮৮.৯৭ মার্কিন ডলারে নেমে এসেছে। গত ১১ জুনের পর আন্তর্জাতিক বাজারে এটিই স্বর্ণের সর্বনিম্ন দর। অপরদিকে, আগামী আগস্ট মাসে সরবরাহের চুক্তিতে মার্কিন স্বর্ণের ফিউচার প্রাইস ১ দশমিক ৬ শতাংশ কমে প্রতি আউন্স ৪ হাজার ১০০ দশমিক ৩০ ডলারে দাঁড়িয়েছে।

অর্থনীতি বিষয়ক বিশ্লেষকেরা জানিয়েছেন, বাজার যদি এই ধারা বজায় রাখে এবং স্বর্ণের দাম ৪ হাজার ডলারের মনস্তাত্ত্বিক স্তর ভেঙে নিচে নেমে যায়, তবে তা দ্রুত ৩ হাজার ৮০০ ডলার এবং পরবর্তীতে ৩ হাজার ৫০০ ডলারে গিয়ে ঠেকতে পারে। অর্থাৎ স্বর্ণের বাজারে যে রেকর্ড উল্লম্ফন ঘটেছিল, তা কেটে গিয়ে দাম আগের অবস্থানে ফিরতে পারে।

দেশীয় বাজারে বড় পতন

আন্তর্জাতিক বাজারে খাঁটি স্বর্ণের (তেজাবি স্বর্ণ) দাম কমায় দেশের বাজারেও এর প্রতিফলন দেখা গেছে। বাজুসের মূল্য নির্ধারণ ও মূল্য পর্যবেক্ষণ স্থায়ী কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ভ্যাটসহ এখন থেকে সবচেয়ে ভালো মানের অর্থাৎ ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি স্বর্ণ কিনতে ক্রেতাদের গুনতে হবে ২ লাখ ২৫ হাজার ২৯০ টাকা। এর আগে গত ২২ জুন এই মানের স্বর্ণের দাম ধরা হয়েছিল ২ লাখ ৩০ হাজার ৭৭২ টাকা। অর্থাৎ দুই দিনের ব্যবধানে ২২ ক্যারেট স্বর্ণের দাম ভরিতে কমেছে ৫ হাজার ৪৮২ টাকা।

একইভাবে কমেছে অন্যান্য মানের স্বর্ণের দামও। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২১ ক্যাটের প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম ৫ হাজার ২৪৯ টাকা কমিয়ে ২ লাখ ১৫ হাজার ১৪২ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। ১৮ ক্যারেটের ক্ষেত্রে প্রতি ভরিতে ৪ হাজার ৪৯০ টাকা কমিয়ে নতুন দাম করা হয়েছে ১ লাখ ৮৪ হাজার ৭৫৮ টাকা। এছাড়া সনাতন পদ্ধতির প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম ৩ হাজার ৬৭৪ টাকা কমিয়ে ১ লাখ ৫০ হাজার ৯৩২ টাকা নির্ধারণ করেছে বাজুস।

স্বর্ণের পাশাপাশি দেশের বাজারে সব ধরনের রুপার দামও কমিয়েছে বাজুস। নতুন নিয়মে প্রতি ভরি ২২ ক্যারেট রুপার দাম ৪ হাজার ৮৪১ টাকা, ২১ ক্যারেট রুপা ৪ হাজার ৬০৭ টাকা, ১৮ ক্যারেট রুপা ৩ হাজার ৯৬৬ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির রুপার দাম ২ লাখ ৯৭৪ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

বাজুস জানিয়েছে, ২০২৬ সালে এ পর্যন্ত দেশের বাজারে সর্বমোট ৮০ বার স্বর্ণের দাম সমন্বয় করা হলো, যার মধ্যে ৪০ বার দাম বাড়ানো হয়েছে এবং ৪০ বার কমানো হয়েছে। 

আগের দামে ফেরার মূল কারণ

ডলারের শক্তিশালী অবস্থান : বিশ্ববাজারে মার্কিন ডলারের সূচক গত এক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ অবস্থানে পৌঁছেছে। ডলার শক্তিশালী হওয়ায় অন্যান্য মুদ্রার ক্রেতাদের জন্য স্বর্ণ কেনা অনেক বেশি ব্যয়বহুল হয়ে পড়েছে, যা স্বর্ণের চাহিদা ও দাম দুটোই কমিয়ে দিয়েছে।

সুদের হার বৃদ্ধির শঙ্কা : মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ চলতি বছর অন্তত তিনবার সুদের হার বাড়াতে পারে- এমন আভাসে বিনিয়োগকারীরা বন্ড ও ডলারের দিকে ঝুঁকছেন। স্বর্ণ থেকে সরাসরি কোনো নিয়মিত মুনাফা বা সুদ আসে না বলে উচ্চ সুদের হারের বাজারে এর আকর্ষণ কমে যায়।

মার্কিন-ইরান সংলাপের প্রভাব : মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা নিরসনে মার্কিন-ইরান শান্তি আলোচনা এবং হরমুজ প্রণালিতে অবরুদ্ধ তেলবাহী জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হতে শুরু করায় বৈশ্বিক বাজারে একধরনের স্থিতিশীলতা ফিরছে। যুদ্ধের আশঙ্কা কমে যাওয়ায় নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে স্বর্ণের ওপর যে বাড়তি চাপ ছিল, তা এখন কমতে শুরু করেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *