পরিকল্পনাহীন কারিকুলামে বারবার হোঁচট খাচ্ছে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা। এতে দিশেহারা শিক্ষার্থী ও অভিভাবক। নতুন কারিকুলাম বাস্তবায়নে বিশেষজ্ঞ প্যানেলের দক্ষতা নিয়েই উঠেছে নানা প্রশ্ন। এমনকি খোদ শিক্ষামন্ত্রী বলছেন, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) এখন যেন কর্মকর্তাদের ‘ট্রানজিট পয়েন্ট’। কেউ কাজ বুঝে ওঠার আগেই শুরু হয় বদলির তোড়জোড়।
কখনো পরীক্ষা-কখনো গ্রেডিং আবার কখনোবা সিলেবাস ছাপিয়ে শিক্ষা কারিকুলামেও আসে নতুনত্ব। বৈশ্বিক দাবির নামে বারবার পরিবর্তনে গিনিপিগ হচ্ছে দেশের শিক্ষার্থীরা। এ নিয়ে ক্ষোভ আছে অভিভাবক ও শিক্ষকদের।
রুহিনি নামে এক অভিভাবক জানান, তার সন্তান চতুর্থ শ্রেণিতে নতুন কারিকুলাম পেয়েছে। পঞ্চম শ্রেণিতে উঠে নতুন কারিকুলামে পড়তে হচ্ছে তাকে। এতে পড়াতে সমস্যা হচ্ছে। বাচ্চার বুঝতে সমস্যা হচ্ছে। এখন ষষ্ঠ শ্রেণিতে পরিবর্তন এলে আবার নতুন কারিকুলাম পাবে।
রাফসান নামে এক শিক্ষক জানান, আগে ছিল কাঠামোবদ্ধ কারিকুলাম। এরপর সৃজনশীল শুরু হলো। যখন বাচ্চারা এতে মোটামুটি অভ্যস্ত হতে থাকলো তখনই নতুন কারিকুলাম এলো। ট্রেনিংয়ে কোনো প্রশ্ন করা যাবে না। যখন আমি কিছুই বুঝি না, তখন বাচ্চাকে কী বুঝাবো।
রাব্বানী নামে আরেক শিক্ষক বলেন, ‘শিক্ষাক্রম পরিবর্তনের কারণে অনেক সময় যথেষ্ট ট্রেনিং থাকে না। এরপরও ট্রেনিংয়ের মাধ্যমে একটা শিক্ষাক্রম স্টেবল হতে থাকলো, তখন আনা হয় পরিবর্তন। এতে শিক্ষার মানটা ঠিক থাকে না।’
জুলাই অভ্যুত্থানে বদলে যাওয়া বাংলাদেশে নতুন সরকারও আনতে যাচ্ছে কারিকুলামে পরিবর্তন। প্রযুক্তি নির্ভর শিক্ষা, দক্ষতাভিত্তিক পাঠদান ও হাতে কলমে শেখাকে দেয়া হচ্ছে গুরুত্ব। অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে ডিজিটাল কনটেন্ট, ইন্টারেক্টিভ লার্নিং এবং আধুনিক শিক্ষণ পদ্ধতি। সব মিলিয়ে এনসিটিবি পরিবর্তন আনতে চায় তিন ধাপে। ২০০ সদস্যের একটি বিশেষজ্ঞ প্যানেলও গঠন হতে পারে।
কিন্তু বাস্তবতা হলো-এনসিটিবি নিজেই এখন ধুঁকছে বিশেষজ্ঞ সংকটে। কাজ চালানো হচ্ছে ডেপুটেশনে বা প্রেষণে আসা শিক্ষকদের দিয়ে। যাদের অনেকেরই শিক্ষাক্রম প্রণয়নে নেই বিশেষায়িত জ্ঞান।
শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের সদস্য অধ্যাপক মাসুদুল হক বলেন, ‘কোনো কর্মকর্তার স্থায়িত্ব এ জায়গাটায় দীর্ঘকালীন না হলে কাজ বুঝতে বুঝতেই অন্য জায়গায় চলে যায়। যারা দ্বিতীয় শ্রেণির তারা প্রমোশন পেয়ে হয় প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তা। কিন্তু শিক্ষাক্রমের চিন্তাভাবনার সঙ্গে যারা জড়িত এদের বেশিরভাগই ডেপুটেশনের সঙ্গে আসতে হয়।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইইআর বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ নূরে আলম সিদ্দিকী বলেন, ‘এনসিটিবির কেউ কারিকুলাম সম্পর্কে কোনো ব্যাসিক ধারণাই রাখে না। এনসিটিবির উচিৎ হবে নিজস্ব জনমত তৈরি করা। যারা শিক্ষাক্রম বোঝেন বা যাদের এই খাতে সুনাম রয়েছে, তিনি অবসরে চলে গেলেও তাদের সঙ্গে রাখতে হবে। একাডেমিক জায়গাগুলোতে খুব বেশি কঠোর হওয়া যাবে না। কেউ একাডেমিকেলি খুবই ভালো বা কারিকুলাম বানানোর জন্য খুবই দক্ষ কিন্তু তার একটা মতাদর্শ রয়েছে- এই মতাদর্শ বিচার করে যদি না তাকে বাদ দেয়া হয়, তাহলে অনেক কিছু হারাতে হবে।’
বিশেষজ্ঞ ঘাটতির কথা স্বীকার করেছেন খোদ শিক্ষামন্ত্রী ড. এহছানুল হক মিলনও। ক্ষোভ ঝারেলন এনসিটিবির ওপর।
তিনি বলেন, ‘অভিজ্ঞ কি না তা না জেনেই কর্মকর্তাদের এনসিটিবিতে আনা হচ্ছে। এটা হয় শুধু ঢাকা শহরে ডাম্পিং করা। কিন্তু এখানে অভিজ্ঞদের যোগদান করতে হবে। মূলত যারা শিক্ষাক্রমে অভিজ্ঞ তাদের এনসিটিবিতে আনা হয়নি। আমি চাচ্ছি তাদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কারিকুলামটাকে তৈরি করতে।’
শিক্ষামন্ত্রী আরও বলেন,‘এনসিটিবিতে রাজনৈতিকভাবে বদলি হয়েছে। ঢাকায় আসতে চেয়ছেন, ঢাকায় এসছেন। অন্তর্বর্তী সরকার এই এপয়েন্টমেন্ট দিয়েছিল।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শিক্ষাখাতের এই নৈরাজ্য থামাতে এনসিটিবিকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করতে হবে।