প্রচণ্ড সামরিক শক্তি দিয়েও ইরানকে কাবু করতে পারছেন না ট্রাম্প

সামরিক দিক থেকে প্রচণ্ড শক্তি থাকা সত্ত্বেও ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জনে যুক্তরাষ্ট্র ব্যর্থ হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন কাতারের জর্জটাউন ইউনিভার্সিটির রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সহযোগী অধ্যাপক পল মাসগ্রেভ। তাঁর মতে, মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত এখন দুই পক্ষের ধৈর্য ও সহ্যক্ষমতার এক কঠিন পরীক্ষায় রূপ নিয়েছে, যেখানে মূল প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে- কে আগে পিছু হটবে।

বিশ্লেষক পল মাসগ্রেভ জানান, ওয়াশিংটন বা তেহরান কতদিন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষতি সহ্য করতে পারে, তার ওপরই নির্ভর করছে চুক্তির দরকষাকষির মূল শক্তি। তিনি বলেন, ইরানের কট্টরপন্থিরা নিজেদের দুর্বল হিসেবে তুলে ধরতে একেবারেই নারাজ। বরং বিশেষ করে সামনে মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনকে ঘিরে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে কূটনৈতিকভাবে যতটা সম্ভব ব্যাকফুটে ফেলা ও অপমানিত করাই এখন তাদের অন্যতম লক্ষ্য।

মাসগ্রেভ আরও বলেন, এই যুদ্ধে দ্রুত বা সহজ জয় পাওয়ার যে আশা ট্রাম্প করেছিলেন, বাস্তব পরিস্থিতি তার চেয়ে অনেক বেশি জটিল প্রমাণিত হয়েছে। মার্কিন বিমান শক্তি, অত্যাধুনিক সামরিক সরঞ্জাম কিংবা ওয়াশিংটনের বলপ্রয়োগের কৌশল- কোনোটিই এখন পর্যন্ত ট্রাম্পের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনে কাজ করেনি। ফলে ইরানের সামরিক ও কৌশলগত প্রতিরোধের সামনে মার্কিন যুদ্ধকৌশল বড় ধরনের অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।

আন্তর্জাতিক আলোচনার টেবিলে সমঝোতার মেয়াদ ফুরিয়ে আসতে থাকলেও ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের টানাপোড়েন থামছে না। ওয়াশিংটন এবং তেহরানের মধ্যে ১৭ জুন স্বাক্ষরিত ১৪-দফা সমঝোতা স্মারকের (এমওইউ) ৬০ দিনের মেয়াদ আগামী সপ্তাহে শেষ হতে যাচ্ছে। সংঘাত থামিয়ে স্থায়ী শান্তি ও যুদ্ধের অবসানের লক্ষ্যে দুই পক্ষ এই যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে সই করলেও অস্পষ্ট ধারা ও শর্তের কারণে তা বাস্তবায়নে শুরু থেকেই দেখা দিয়েছে তীব্র জটিলতা।

এমওইউ-এর মাধ্যমে সাময়িকভাবে শত্রুতার অবসান ও বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত ঘোষণা করা হলেও বিতর্কিত কয়েকটি অনুচ্ছেদ নিয়ে দুই দেশের সরকারের মধ্যে তুমুল বাকবিতণ্ডা চলছে। চুক্তির ৫ নম্বর ধারায় অবাধ নৌ-চলাচলের কথা বলা হলেও তা নিয়ে দুই পক্ষের ব্যাখ্যা সম্পূর্ণ ভিন্ন। তেহরানের দাবি, এর মাধ্যমে কৌশলগত এই জলপথে ইরানের পূর্ণ কর্তৃত্বকে মেনে নেওয়া হয়েছে ও কেবল দুই মাসের জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সেখানে টোল মওকুফ করতে সম্মত হয়েছিল। অন্যদিকে ওয়াশিংটন এই দাবি পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করে জানিয়েছে, ইরান কোনো ধরনের জোরজুলুম বা বাড়তি মাশুল আরোপ না করে প্রণালি দিয়ে নিরাপদ ও অবাধ যাতায়াত নিশ্চিত করবে- এটাই ছিল চুক্তির আসল উদ্দেশ্য।

এ ছাড়া চুক্তির ১০ ও ১১ নম্বর অনুচ্ছেদে ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল ও অর্থনৈতিক ছাড় দেওয়ার কিছু প্রাথমিক সিদ্ধান্ত হয়েছিল। শর্ত অনুযায়ী, ওয়াশিংটন ইরানকে অপরিশোধিত তেল, পেট্রোলিয়াম পণ্য এবং আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং, বীমা ও জাহাজ চলাচল সহায়তাসহ সংশ্লিষ্ট সেবা রপ্তানির ক্ষেত্রে ছাড়পত্র দিতে সম্মত হয়েছিল। পাশাপাশি বিদেশে আটকে থাকা ইরানের জব্দকৃত তহবিল ও সম্পদ যাতে তারা ব্যবহার করতে পারে, আলোচনার মাধ্যমে তার উপায় নির্ধারণের কথা ছিল। তবে সরাসরি কূটনৈতিক অগ্রগতি না থাকায় আগামী ১৬ আগস্ট ৬০ দিনের নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হওয়ার পর এই অঞ্চলের রাজনৈতিক ও কৌশলগত পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেবে, তা নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *