পশ্চিবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচন নিয়ে কী ভাবছে জেন-জি?

ভারতীয়রা গত দুই বছরে প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশ, নেপাল ও শ্রীলঙ্কায় জেন-জি বিপ্লবের ফলে রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তন দেখেছে। সম্প্রতি তিন দেশেই নির্বাচন হয়েছে আর তাতে নতুন প্রজন্মের ভোটারদের প্রভাব ব্যাপকভাবে লক্ষণীয়। পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনের প্রথম দফার ভোট ইতিমধ্যেই শেষ হয়েছে। বাকি রয়েছে শেষ বা দ্বিতীয় দফার ভোট।

নির্বাচন ঘিরে সড়ক, অলিগলি, দেয়াল- সবখানেই প্রার্থীদের সমর্থনে পোস্টার, ব্যানার, পতাকা। ‘ভোট দিন, ভোট দিন’- এই স্লোগানে মুখরিত সর্বত্র। প্রচারে প্রতিশ্রুতির ডালি সাজিয়ে দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন বিভিন্ন দলের প্রার্থীরা। কিন্তু তাদের ওপর তরুণ প্রজন্ম কতটা ভরসা রাখেন? 

রাজ্যটিতে চলমান বিধানসভার নির্বাচনে ‘জেন-জি’ বা তরুণ প্রজন্ম (১৮ থেকে ২৯ বছর বয়সী) একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হিসেবে আবির্ভূত হতে চলেছে- তা সে প্রত্যক্ষভাবেই হোক বা পরোক্ষভাবে।

নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, রাজ্যটিতে মোট ভোটারের সংখ্যা ৬ কোটি ৭৫ লাখের মতো। এর মধ্যে তরুণ প্রজন্মের ভোটার এক- পঞ্চমাংশ বা তার বেশি। ফলে নির্বাচনের ফলাফলে এসব ভোটারদের পছন্দ-অপছন্দ যথেষ্ট গুরুত্ব পাবে বলেই মনে করা হচ্ছে। 

তরুণ প্রজন্মের ভোটার সৌতক সরকারও জানান, “ভোটে অবশ্যই ‘জেন জি’ প্রভাব পড়বে। দুই দফার ভোটেই তরুণ প্রজন্মের ভোটার রয়েছে, তাদের মতামত ভোটের ফলাফলকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করতে পারে।” তিনি আরো জানান, “গত দুই-তিন বছরে প্রতিবেশী দেশগুলোতে আমরা জেন-জির নেতৃত্বে গণঅভ্যুত্থানের ঘটনা দেখেছি। কোথাও সেটা ভালো দিকে গেছে, কোথাও সেটা খারাপ দিকে গেছে। কিন্তু এই প্রজন্ম রাষ্ট্র ব্যবস্থাকে একটা ধাক্কা দিয়েছে। পশ্চিমবঙ্গেও দেখা যাচ্ছে যে, কম বয়সী ছেলে-মেয়েরা বিভিন্ন ইস্যুতে রাস্তায় নামছে এবং এই একই ধারা আগামীদিনে বজায় থাকবে।” তার অভিমত, “বর্তমানে রাজ্যে ও কেন্দ্রে যে সরকার রয়েছে তারা কেউই শিক্ষা, কর্মসংস্থানের বিষয়গুলো নিয়ে নিয়ে কোনো কথা বলছে না। ফলে কম বয়সী ভোটাররা ব্যালটেই এর জবাব দেবে।” 

এবারের নির্বাচনে মূলত কর্মসংস্থান, উন্নত শিক্ষা, দুর্নীতিমুক্ত শাসন এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার মতো ইস্যুগুলোকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে ‘জেন-জি’। পশ্চিমবঙ্গে ‘যুবসাথী’ প্রকল্পে মাসিক ভাতার মতো উদ্যোগগুলো তরুণদের টানার চেষ্টা হলেও, তারা স্থায়ী কর্মসংস্থানকেই বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে। 

দেবমিত্রা ঘোষ রায় জানান, “আমরা চাই সবার জন্য শিক্ষা ও কর্মসংস্থান। সব বন্ধ কলকারখানার দরজা খুলে যাক। শিক্ষিত বেকার যুবকরা স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কাজ পাক। স্কুল ছুটেরা আবার স্কুলে ফিরে যাক।” 

‘জেন-জি’ কেবল ভোটার নয়, বরং নির্বাচনকে প্রভাবিত করার মতো একটি সচেতন রাজনৈতিক শক্তি হিসেবেও কাজ করছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে এই প্রজন্ম পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক সচেতনতা তৈরি, ভোটদান এবং ফলাফল নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখতে চলেছে বলে মনে করা হচ্ছে। 

২০২৪ সালের ৯ আগস্ট কলকাতার সরকারি আরজিকর মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে কর্তব্যরত অবস্থায় নৃশংসভাবে ধর্ষণ ও খুনের শিকার হন এক নারী ইন্টার্ন চিকিৎসক। এরপর পশ্চিমবঙ্গের গণ্ডি পেরিয়ে সেই আন্দোলনের ঢেউ ছড়িয়ে পড়ে পুরো ভারতে, যার নেতৃত্বে ছিল ‘জেন-জি’। 

এই প্রজন্মেরই আরেক সদস্য অমিত দাস জানান, “যে সমাজে নারী সুরক্ষা রয়েছে, ‘জেন-জি’ সেই সমাজই প্রত্যাশা করে।” তার দাবি,  ‘এ রাজ্যে শিল্প নেই, চাকরি নেই, কলকারখানা নেই, তাহলে কী করে নতুন প্রজন্ম সারভাইভ করবে?” অমিত জানান, “আমরা চাই এই সরকারের পরিবর্তন। গত ১৫ বছর ধরে এই সরকারকে দেখেছি। পরিবর্তনের পর নতুন সরকারও যদি কাজ না করে তাহলে তরুণ প্রজন্ম তাকেও সরিয়ে দেবে।” 

প্রবীর দাস বলেন, “কম বয়সী মানুষের একটা বড় জায়গা হলো ভারত। পশ্চিমবঙ্গ তার ব্যতিক্রম নয়। এই নতুন প্রজন্ম বিভিন্ন কারণে আশাহত। মেধাবী উচ্চশিক্ষিত তরুণ প্রজন্ম কর্মসংস্থানের জন্য অন্য রাজ্যে চলে যাচ্ছেন। ভাতা কখনো চাকরির বিকল্প হতে পারে না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম একটা প্রতিবাদের জায়গা। সেক্ষেত্রে শিক্ষিত বেকার যুবকরা যখন তাদের মতামত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানান, তখন তা দেখে বাকিরাও প্রভাবিত হয়।” 

কিন্নয় রায় চৌধুরী নামে আরেক যুবক জানান, “পশ্চিমবঙ্গে শিক্ষার অবকাঠামোই নেই, কর্মসংস্থান নেই। ফলে তরুণ প্রজন্মের ভোটাররা কেউ কর্মসংস্থানের জন্য বাইরে চলে যাচ্ছেন, কেউবা ভালো শিক্ষার অভাবে বাধ্য হয়ে কম বেতনের চাকরিতে যুক্ত হচ্ছেন। সেক্ষেত্রে তারুণ্যের ভোট এবার শিক্ষা, কাজের দাবিতে হবে।” 

সৈকত বৈরাগ্য জানান, “এই তরুণ প্রজন্মই আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। কিন্তু রাজ্যের বর্তমান সরকারের থেকে এই তরুণ প্রজন্ম কোনো সুযোগ সুবিধা পাচ্ছে না। ১ হাজার ৫০০ রুপি ভাতা দিয়ে তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যৎ নষ্ট করে দেওয়া হচ্ছে।”

পশ্চিমবঙ্গে দ্বিতীয় দফার নির্বাচন বাকি থাকলেও ভারতের আরো চার রাজ্যে বিধানসভার নির্বাচন ইতোমধ্যেই সম্পন্ন হয়েছে। এগুলো হলো- তামিলনাড়ু, কেরালা, আসাম এবং পুদুচেরি। প্রতিটি রাজ্যেই তরুণ ভোটারদের ক্রমবর্ধমান নির্বাচনি প্রভাবের বিষয়টি সামনে এসেছে। 

পাঁচ রাজ্যেই ভোটের ফলাফল জানা যাবে আগামী ৪ মে।

এসএন/পিডিকে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *