আজ পহেলা বৈশাখ, ১৪৩৩। দেশজুড়ে উৎসবমুখর পরিবেশে বছরের প্রথম দিনকে বরণ করেছে বাঙালি সংস্কৃতিপ্রেমীরা। বৈশাখের তীব্র গরম উপেক্ষা করে লাল-সাদা শাড়ি-পাঞ্জাবিতে উৎসবে নেমে এসেছে ছোট-বড় সকলে। বিভিন্ন জেলায় জেলায় পালিত হয়েছে বৈশাখী শোভাযাত্রা। আর শহর থেকে গ্রাম সর্বত্র চলছে দিনব্যাপী বৈশাখী মেলা।
সিলেট
সিলেট সার্কিট হাউজ প্রাঙ্গণে পহেলা বৈশাখ ১৪৩৩ উপলক্ষ্যে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রার আয়োজন করে সিলেট জেলা প্রশাসন।
বর্ষবরণ উপলক্ষ্যে আয়োজিত শোভাযাত্রার প্রাক্কালে সিলেটের জেলা প্রশাসক মো.সারওয়ার আলম বলেন, বাংলা নববর্ষ বাঙালি সংস্কৃতির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। এ দিন সিলেটের সর্বস্তরের মানুষ জাতি, ধর্ম, বর্ণ, গোষ্ঠী ও গোত্র নির্বিশেষে এক মহামিলনমেলায় অংশগ্রহণ করেছে, যা জাতির ঐক্যের প্রতীক।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ সম্প্রীতির দেশ এবং সিলেট অঞ্চলের মানুষও সম্প্রীতির উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। এই মিলনমেলার মাধ্যমে সম্প্রীতি আরও সুদৃঢ় ও সমৃদ্ধ হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

পহেলা বৈশাখ উপলক্ষ্যে সিলেটে ছিল নানা আয়োজন। সারদা হল প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন আবৃত্তি, নৃত্য ও সংগীত পরিবেশন করে। এছাড়া ক্বিন ব্রিজের নিচে বৈশাখী মেলার আয়োজন করা হয়। সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগার, বিভিন্ন হাসপাতাল ও শিশু পরিবার (এতিমখানা)সমূহে ঐতিহ্যবাহী বাঙালি খাবার পরিবেশনের ব্যবস্থা করা হয়।
ময়মনসিংহ
ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসনের আয়োজনে নগরীর ময়মনসিংহ মহাবিদ্যালয়ের সামনে থেকে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন পার্কের বৈশাখী মঞ্চ-২ পর্যন্ত ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীসহ সকল জাতিগোষ্ঠীর অংশগ্রহণে নানা রঙের ভাস্কর্যসহ এক বর্ণিল শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়। ময়মনসিংহ-৪ সদর আসনের সংসদ সদস্য মো. আবু ওয়াহাব আকন্দ ওয়াহিদ, ময়মনসিংহ বিভাগীয় কমিশনার মিজ্ ফারাহ শাম্মী, এনডিসি, জেলা প্রশাসক মো. সাইফুর রহমান, ময়মনসিংহ জেলা পরিষদের প্রশাসক সৈয়দ এমরান সালেহসহ ময়মনসিংহ জেলার রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতৃবৃন্দ শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণ করেন।
শোভাযাত্রা শেষে বৈশাখী মঞ্চ-২ এ পহেলা বৈশাখকে সাদরে বরণ করে নিতে এক সংক্ষিপ্ত আলোচনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। আলোচনা সভায় নববর্ষকে স্বাগত জানিয়ে ময়মনসিংহ-৪ সদর আসনের জাতীয় সংসদ সদস্য বলেন, অনেক বছর পর আজ আমরা মন খুলে, প্রাণ খুলে নববর্ষের দিনটিকে পালন করতে পারছি। তিনি ময়মনসিংহ জেলা, ময়মনসিংহ বিভাগ, বৃহত্তর ময়মনসিংহসহ সকল দেশবাসীকে নববর্ষের শুভেচ্ছা জ্ঞাপন করেন। দেশিয় ভাষা, সংস্কৃতিকে সামনে রেখে, বিজাতীয় সংস্কৃতির কুপ্রভাবকে পাশ কাটিয়ে সকলের সহযোগিতায় দেশকে এগিয়ে নিতে সরকার সচেষ্ট বলে তিনি জানান।

শুভেচ্ছা বক্তব্যে ময়মনসিংহ বিভাগীয় কমিশনার বলেন, বাংলাদেশ বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর দেশ। বিভেদ ভুলে, সবার আগে বাংলাদেশকে সামনে রেখে, পালাগান যাত্রাগান, বৈশাখী মেলা, হালখাতা, দেশিয় সংস্কৃতির পরিচয়কে সামনে রেখেই এগিয়ে যেতে হবে। দিনশেষে আমরা সবাই বাংলাদেশি, সবাই বাংলাদেশের জন্যই কাজ করি। সম্মিলিতভাবেই দেশকে এগিয়ে নেব, সবার এই অঙ্গীকারই হোক।
ময়মনসিংহ জেলা পরিষদের প্রশাসক বলেন, এই দিনে সবাই এক হয়ে, নতুন অঙ্গীকার নিয়ে, অতীতের সব ব্যর্থতা ভুলে, ঐক্যবদ্ধ হয়ে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় নিতে হবে। ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসক জেলাবাসীকে নববর্ষের শুভেচ্ছা জানিয়ে বলেন, বাংলা নববর্ষ হাজার বছরের ঐতিহ্য। নতুন প্রজন্মকেও বাংলা সংস্কৃতির পরিচয়কে ধারণ করতে তিনি আহ্বান জানান। এছাড়া, ময়মনসিংহের অতিরিক্ত ডিআইজি মো. আবু বকর সিদ্দীক, পুলিশ সুপার মোহাম্মদ কামরুল হাসান জেলাবাসীকে নববর্ষের শুভেচ্ছা জানান।
গাইবান্ধা
জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে শহরের স্বাধীনতা প্রাঙ্গণ থেকে একটি বর্ণাঢ্য আনন্দ শোভাযাত্রা বের হয়। যেখানে বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক অঙ্গনের মানুষ ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারী এবং শিক্ষার্থীরা এতে যোগ দেয়। শোভাযাত্রাটি শহরের প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে পুনরায় একই স্থানে গিয়ে শেষ হয়।
এ শোভাযাত্রায় গাইবান্ধা সদর আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল করিম জেলা প্রশাসক মাসুদুর রহমান মোল্লা ও জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মাহমুন্নবী টিটুলসহ বিভিন্ন শ্রেণি পেশার সর্বস্তরের মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করেন।

শোভাযাত্রায় ফুটে ওঠে বাংলার ঐতিহ্যবাহী গ্রামীণ জীবনচিত্র। রঙিন ব্যানার, ঢেঁকি, ঢাক-ঢোল, ফেস্টুন, মুখোশ ও লোকজ সাজে অংশগ্রহণকারীদের উপস্থিতি শোভাযাত্রাকে করে তোলে আরও প্রাণবন্ত ও আকর্ষণীয়। শোভা যাত্রায় সম্মুখভাবে ব্যান্ডপার্টির সাথে দোতরা হাতে নাচের দৃশ্য আনন্দে ভিন্নমাত্রা যোগ করে।
শোভাযাত্রা শেষে স্বাধীনতা প্রাঙ্গণ চত্বরে অনুষ্ঠিত হয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এতে স্থানীয় শিল্পীরা গান, নৃত্য ও আবৃত্তির মাধ্যমে বাঙালির হাজার বছরের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য তুলে ধরেন। দর্শকদের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠানটি পরিণত হয় জমজমাট মিলনমেলায়।
এছাড়া জেলা শহরের স্বাধীনতা প্রাঙ্গনে দিনব্যাপী বৈশাখী মেলার আয়োজন করা হয়। মেলায় স্থান পায় নানা ধরনের গ্রামীণ পণ্য, হস্তশিল্প, খেলনা এবং ঐতিহ্যবাহী খাবার। ছোট-বড় সবার ভিড়ে মেলাপ্রাঙ্গণ হয়ে ওঠে প্রাণচঞ্চল।
সিরাজগঞ্জ
সিরাজগঞ্জ সরকারি কলেজ মাঠে জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মাধ্যমে শোভাযাত্রার আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়। প্রথমে কলেজ প্রাঙ্গণ থেকে একটি বনার্ঢ্য বৈশাখী শোভাযাত্রা বের করা হয়। শোভাযাত্রাটি শহরের এসএস রোড, বড়পুলসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে আবার কলেজ প্রাঙ্গণে এসে শেষ হয়।

সিরাজগঞ্জ জেলা প্রশাসনের আয়োজনে বাংলা পহেলা বৈখাশ ১৪৩৩ উপলক্ষ্যে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও পুরস্কার বিতরণের আয়োজন করা হয়। প্রথমে সকাল ১০ টায় জেলা প্রশাসন অফিসের সামনে থেকে একটি বনার্ঢ্য বৈশাখী শোভাযাত্রা বের করে। জেলা প্রশাসক মো: আমিনুল ইসলামের নেৃতৃত্বে শোভাযাত্রায় উপস্থিত ছিলেন, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক গন প্রতি রায়, পুলিশ সুপার মো: সাইফুল ইসলাম সানতুসহ জেলা প্রশাসনের বিভিন্ন কর্মকর্তা ও কর্মচারীগণ। বেলা ১১টায় জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সামনে বটতলায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়।
সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, পুলিশ সুপার মো: সাইফুল ইসলাম সানতু, জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সাইদুর রহমান বাচ্চু প্রমুখ। পরে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে বিভিন্ন সংগঠনসহ ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর অংশগ্রহণে পক্ষ থেকে সঙ্গিত পরিবেশন করা হয়।
লক্ষ্মীপুর
জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে সদর উপজেলা পরিষদ প্রাঙ্গণ থেকে একটি বর্ণাঢ্য আনন্দ শোভাযাত্রা বের করা হয়। শোভাযাত্রাটি শহরের প্রধান সড়কগুলো প্রদক্ষিণ করে জেলা প্রশাসক কার্যালয় প্রাঙ্গণ এসে শেষ হয়।
পরে সেখানে বেলুন উড়িয়ে বাংলা নববর্ষ এবং তিন দিনব্যাপী লোকজ মেলার উদ্বোধন করা হয়।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন, জেলা প্রশাসক এসএম মেহেদী হাসান। আরও উপস্থিত ছিলেন, পুলিশ সুপার মো. আবু তারেক, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মো. জসিম উদ্দিন ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) অভি দাশ। এ সময় বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ, শিক্ষার্থী ও সাংস্কৃতিক কর্মীরা অংশ নেন।
উদ্বোধনী পর্ব শেষে জেলা শিল্পকলা একাডেমির শিল্পীদের অংশগ্রহণে এক মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
রাজশাহী
‘নববর্ষের ঐক্যতান, গণতন্ত্রের পুনরুত্থান’- এই স্লোগানকে সামনে রেখে বর্ণাঢ্য আয়োজনের মধ্য দিয়ে রাজশাহীতে উদযাপিত হয়েছে পহেলা বৈশাখ-১৪৩৩। রাজশাহী জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে উৎসবমুখর পরিবেশে আয়োজন করা হয় এই বর্ষবরণ অনুষ্ঠান। এতে ছিল সর্বস্তরের মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি।
সকাল সাড়ে ৭টার দিকে রাজশাহী কেন্দ্রীয় উদ্যান ও চিড়িয়াখানার সামনে থেকে বের হয় বর্ণাঢ্য বৈশাখী শোভাযাত্রা। শোভাযাত্রাটি শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ করে শিশু একাডেমি প্রাঙ্গণে গিয়ে শেষ হয়।

শোভাযাত্রায় অংশ নিতে সকাল থেকেই নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ রঙিন পোশাক ও বৈশাখী সাজে সজ্জিত হয়ে জড়ো হন। ব্যানার-ফেস্টুন, মুখোশ, পাখা, ঢোলসহ বাঙালিয়ানা ঐতিহ্যের বিভিন্ন উপকরণে সাজানো শোভাযাত্রাটি সৃষ্টি করে এক প্রাণবন্ত ও উৎসবমুখর আবহ।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে অংশ নেন ভূমিমন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনু। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন- রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের (রাসিক) প্রশাসক মাহফুজুর রহমান রিটন, বিভাগীয় কমিশনার আ ন ম বজলুর রশিদ এবং জেলা প্রশাসক কাজী শহিদুল ইসলাম। এছাড়াও পুলিশ ও প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণ করেন।