খরা সহনশীলতা জোরদারে আঞ্চলিক সহযোগিতা, ন্যায্য পানি বণ্টন ও প্রযুক্তি হস্তান্তরের আহ্বান জানিয়েছেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক মন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু।
আজ মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) মঙ্গোলিয়ার উলানবাটরে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের মরুকরণ প্রতিরোধ কনভেনশনের ১৭তম কনফারেন্স অব দ্য পার্টিজ (কপ-১৭) এর ‘খরা সহনশীলতা জোরদার’ শীর্ষক মন্ত্রী পর্যায়ের সংলাপে আবদুল আউয়াল মিন্টু এ আহ্বান জানান।
পরিবেশমন্ত্রী খরা মোকাবিলায় কার্যকর আঞ্চলিক সহযোগিতা, ন্যায্য পানি বণ্টন, টেকসই পানি ব্যবস্থাপনা এবং উন্নত প্রযুক্তি হস্তান্তরের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশে খরা ও ভূমি অবক্ষয় পরস্পর সম্পর্কিত। দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে নিয়মিতভাবে খরা ও ভূগর্ভস্থ পানির স্তর হ্রাস পাচ্ছে। অন্যদিকে উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ততার অনুপ্রবেশ কৃষিজমি ও মিঠাপানির উৎসের ক্ষতি করছে। বন্যা ও নদীভাঙনের প্রভাব এ সংকটকে আরও জটিল করে তুলছে।
আবদুল আউয়াল মিন্টু জানান, দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে প্রায় ৫ দশমিক ৪৬ মিলিয়ন হেক্টর জমি খরাপ্রবণ। সেখানে প্রায় ১৬ হাজার গভীর নলকূপ দিয়ে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের ফলে অনেক এলাকায় পানির স্তর দ্রুত নিচে নেমে যাচ্ছে। এসব এলাকায় নতুন সেচ কার্যক্রম সীমিত করা হয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ অ্যাগ্রো-মেটিওরোলজিক্যাল ইনফরমেশন সিস্টেমস (বিএএমআইএস) এর মাধ্যমে খরার সূচক পর্যবেক্ষণ করে কৃষকদের এসএমএস, ভয়েস কল ও মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে ফসলভিত্তিক পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
পরিবেশমন্ত্রী আরও বলেন, ন্যাশনাল গ্রিন মিশনের আওতায় সারা দেশে ২৫ কোটি গাছের চারা রোপণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি প্রকৃতিনির্ভর খরা মোকাবিলার অংশ হিসেবে আগামী পাঁচ বছরে প্রায় ২০ হাজার কিলোমিটার খাল, নদী ও জলাশয় খনন ও পুনঃখননের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর ফলে ভূপৃষ্ঠের পানির প্রাপ্যতা বাড়বে এবং ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমবে। বাংলাদেশ এই অভিজ্ঞতা অন্যান্য পানিসংকটপ্রবণ দেশের কাজে লাগবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
উপকূলীয় অঞ্চলের পরিস্থিতি তুলে ধরে মন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু বলেন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং শুষ্ক মৌসুমে নদীর প্রবাহ কমে যাওয়ার ফলে লবণাক্ত পানি কৃষিজমি ও খাবার পানির উৎসে প্রবেশ করছে, যা লাখো মানুষের জীবিকা হুমকির মুখে ফেলছে। এ সংকট মোকাবিলায় ন্যাশনাল গ্রিন মিশনের আওতায় উপকূলীয় ম্যানগ্রোভ বন সম্প্রসারণ কার্যক্রমও এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
পরিবেশমন্ত্রী গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা অববাহিকায় কার্যকর পানি ব্যবস্থাপনা ও প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতার ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, শুষ্ক মৌসুমে পর্যাপ্ত পানিপ্রবাহ নিশ্চিত করা ভূমি অবক্ষয় মোকাবিলারও একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায়। খরা সহনশীলতা গড়ে তুলতে অববাহিকাভিত্তিক সহযোগিতা ও ন্যায্য পানি বণ্টনকে মূল স্তম্ভ হিসেবে বিবেচনা করার আহ্বান জানান তিনি।
মন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনায় ২০৫০ সাল পর্যন্ত খরা মোকাবিলার অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা হয়েছে। তিনি আন্তর্জাতিক খরা সহনশীলতা পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র চালুর উদ্যোগকে স্বাগত জানান এবং বাংলাদেশের বিএএমআইএসের তথ্য এ ব্যবস্থার সঙ্গে সংযুক্ত করার প্রস্তাব দেন। একই সঙ্গে খরা ও লবণাক্ততা সহনশীল ফসলের জাত উন্নয়ন ও সম্প্রসারণে প্রযুক্তি হস্তান্তর আরও জোরদারের আহ্বান জানান।
আবদুল আউয়াল মিন্টু বলেন, বাংলাদেশ খরা ও ভূমি অবক্ষয়ের তীব্র ঝুঁকির মুখোমুখি। তিনি একটি আগাম প্রস্তুতিমূলক, পর্যাপ্ত অর্থায়নসমৃদ্ধ এবং কার্যকর আঞ্চলিক সহযোগিতাভিত্তিক আন্তর্জাতিক খরা সহনশীলতা কাঠামো গড়ে তুলতে ইউএনসিসিডির সদস্য রাষ্ট্রগুলোর প্রতি আহ্বান জানান।
সভায় বাংলাদেশ ছাড়াও বিভিন্ন দেশের মন্ত্রী, উপমন্ত্রী, প্রতিনিধি দলের প্রধানরা অংশ নেন। এ ছাড়া এফএও, ইএসসিএপি, আইওএম, ইউনিসেফ, ইউএনডিআরআর, ইউএনডিপি, আইএফএডি, এআইআইবি, আফ্রিকান ইউনিয়নসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক সংস্থার প্রতিনিধিরাও পর্যবেক্ষক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন।