ইতিহাসের সিঁড়িতে কেইন, সামনে শুধুই মেসি

ডিআর কঙ্গোর বিপক্ষে ম্যাচের ৭৪ মিনিট পর্যন্ত ইংল্যান্ডের বিশ্বকাপ অভিযান ঝুলে ছিল অনিশ্চয়তায়! কিন্তু শেষ বাঁশি বাজার সময় যখন ঘনিয়ে এল, তখন দৃশ্যপটে হাজির হলেন হ্যারি কেইন। মাত্র ১১ মিনিটের ব্যবধানে করা দুটি গোল শুধু ইংল্যান্ডকে শেষ ষোলোয় তুলেনি, আরও একবার আলোচনার কেন্দ্রে এনে দিয়েছে তার অবিশ্বাস্য গোল করার ক্ষমতাকে। এই দুই গোল যেন আরেকটি বড় সত্য সামনে এনে দিল-চলতি মৌসুমে ইউরোপীয় ফুটবলে হ্যারি কেইনের ধারেকাছেও খুব কম খেলোয়াড় আছেন।

ক্লাব ও জাতীয় দল মিলিয়ে মাত্র ৬২ ম্যাচে ৭২ গোল-এমন পরিসংখ্যান আধুনিক ফুটবলে খুব কম খেলোয়াড়ই ছুঁতে পেরেছেন। এই গোলসংখ্যা তাঁকে এক মৌসুমে সর্বোচ্চ গোলদাতাদের তালিকায় নিয়ে গেছে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর ওপরে। এখন তার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন কেবল একজন-লিওনেল মেসি।

কঙ্গোর বিপক্ষে বিশ্বকাপের শেষ বত্রিশের ম্যাচে হ্যারি কেইন যেন আবারও প্রমাণ করলেন, কেন তাকে বিশ্বের অন্যতম সেরা স্ট্রাইকার বলা হয়। ৭৪ মিনিট পর্যন্ত পিছিয়ে থাকা ইংল্যান্ড যখন বিদায়ের দ্বারপ্রান্তে, তখন অধিনায়ক নিজের কাঁধেই তুলে নেন পুরো দলের দায়িত্ব। শেষ ১৫ মিনিটে করেন জোড়া গোল, আর সেই দুই গোলেই ২-১ ব্যবধানে জয় তুলে নিয়ে শেষ ষোলো নিশ্চিত করে থ্রি লায়ন্স।

বিশেষ করে ৮৬তম মিনিটের জয়সূচক গোলটি ছিল অসাধারণ। বক্সের বাইরে বল পেয়ে মুহূর্তের মধ্যে জায়গা তৈরি করে ডান পায়ের শক্তিশালী শটে বল পাঠিয়ে দেন জালের ওপরের কোণায়। গোলটি হওয়ার আগেই উদযাপন শুরু করেছিলেন তার সতীর্থ অ্যান্থনি গর্ডন। ম্যাচ শেষে সেই মুহূর্তের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে গর্ডন বলেন, কেইন শট নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তিনি বুঝে গিয়েছিলেন বল জালেই যাবে। তার মতামত, অনেক খেলোয়াড়ই এমন গোল করতে পারেন, কিন্তু কেইনের বিশেষত্ব হলো তিনি নিয়মিতই এমন মানের ফিনিশিং উপহার দেন।

গর্ডনের প্রশংসা এখানেই থেমে থাকেনি। তার মতে, কেইন এমন একটি মৌসুম কাটাচ্ছেন, যা একমাত্র লিওনেল মেসিই অতিক্রম করতে পেরেছেন। এই মন্তব্যের পেছনে অবশ্য যথেষ্ট যুক্তিও রয়েছে। ২০১১-১২ মৌসুমে ক্লাব ও জাতীয় দল মিলিয়ে ৬৯ ম্যাচে ৯১ গোল করেছিলেন মেসি, যা এখনো ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম অবিশ্বাস্য কীর্তি। সেই রেকর্ডের কাছাকাছি না পৌঁছালেও ৬২ ম্যাচে ৭২ গোল করে ইতিহাসের অন্যতম সেরা মৌসুম উপহার দিচ্ছেন ইংল্যান্ড অধিনায়ক।

এই ৭২ গোলের মধ্যে ৬১টি এসেছে বায়ার্ন মিউনিখের জার্সিতে, আর বাকি ১১টি ইংল্যান্ডের হয়ে। ক্লাব ও জাতীয় দল-দুই জায়গাতেই ধারাবাহিক পারফরম্যান্স দেখিয়ে এটি নিজের ক্যারিয়ারের সেরা মৌসুমে পরিণত করেছেন কেইন।

কঙ্গোর বিপক্ষে জোড়া গোলে ব্যক্তিগত অর্জনের তালিকাও আরও সমৃদ্ধ করেছেন তিনি। বিশ্বকাপে তার মোট গোলসংখ্যা এখন ১৩। এর মাধ্যমে পেছনে ফেলেছেন ব্রাজিল কিংবদন্তি পেলেকে, যার নামের পাশে ছিল ১২ গোল। বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতাদের তালিকায় এখন কেইনের সামনে রয়েছেন কেবল লিওনেল মেসি (১৯), কিলিয়ান এমবাপে (১৮), মিরোস্লাভ ক্লোজে (১৬), রোনালদো নাজারিও (১৫) ও গার্ড মুলার (১৪)। পাশাপাশি ১৩ গোল নিয়ে তিনি ছুঁয়ে ফেলেছেন ফরাসি কিংবদন্তি জাস্ট ফনটেইনকেও।

শুধু সামগ্রিক গোলসংখ্যাই নয়, নকআউট পর্বেও নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছেন ইংল্যান্ড অধিনায়ক। বিশ্বকাপের নকআউটে এটি তার চতুর্থ গোল, যা ইংল্যান্ডের কিংবদন্তি স্যার জিওফ হার্স্টের রেকর্ডের সমান। এই তালিকায় এখন তাঁর ওপরে রয়েছেন শুধু গ্যারি লিনেকার, যার নকআউট গোল সংখ্যা ছয়।

চলতি বিশ্বকাপে কেইনের গোল এখন পাঁচটি। ফলে গোল্ডেন বুটের লড়াইটাও জমে উঠেছে। এই মুহূর্তে ছয়টি করে গোল নিয়ে যৌথভাবে শীর্ষে আছেন মেসি ও কিলিয়ান এমবাপে। তাদের ঠিক পেছনেই পাঁচ গোল নিয়ে রয়েছেন কেইন ও আর্লিং হলান্ড। নকআউট পর্বে সামনে আরও ম্যাচ থাকায় শীর্ষে ওঠার সুযোগও যথেষ্ট রয়েছে ইংল্যান্ড অধিনায়কের!

এসএন/পিডিকে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *