যুক্তরাষ্ট্রে এসে রাজনৈতিক আশ্রয় চেয়েছেন বা আবেদন করার প্রক্রিয়ায় আছেন- এমন বিদেশি নাগরিকদের অ-অভিবাসী (নন-ইমিগ্রেন্ট) ভিসা বাতিল করার পরিকল্পনা করছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সিদ্ধান্তটি বাস্তবায়িত হলে এটিই হবে মার্কিন ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ভিসা বাতিলের ঘটনা। খবর আল জাজিরার।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর (ডিপার্টমেন্ট অব স্টেট) ২০১৬ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে ইস্যু করা সেইসব বি-১ এবং বি-২ ভিসা বাতিল করবে, যাদের ধারণকারীরা পূর্বে আশ্রয় চেয়েছেন বা বর্তমানে আশ্রয় চাইছেন। ব্যবসায়িক ও পর্যটন ভ্রমণের জন্য এই বি-১ এবং বি-২ ভিসা দেওয়া হয়ে থাকে।
স্থানীয় সময় সোমবার (২৪ আগস্ট) পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র টমি পিগট বলেছেন, এই পদক্ষেপটির লক্ষ্য হলো- যেসব বিদেশি স্বল্পমেয়াদি দর্শনার্থী হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে এসে স্থায়ীভাবে থাকার জন্য আশ্রয়ের আবেদন করেন, তাদের চিহ্নিত করা।
পিগট প্রক্রিয়াটিতে ঠিক কতসংখ্যক ভিসা বাতিল করা হবে তা নির্দিষ্ট করে না বললেও, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি) পররাষ্ট্র দপ্তরের নথি ও দুই মার্কিন কর্মকর্তার বরাতে জানিয়েছে, এতে প্রায় দুই লাখের মতো মানুষ প্রভাবিত হতে পারেন।
কেন এই কঠোর পদক্ষেপ?
ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে তার অভিবাসনবিরোধী অবস্থান আরও জোরদার হয়েছে। তার এজেন্ডায় ভিসা ও গ্রিন কার্ড বাতিলের পাশাপাশি কড়া বহিষ্কার অভিযান রয়েছে। এর অংশ হিসেবে মার্কিন ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (আইসিই) সহ বিভিন্ন ফেডারেল সংস্থা অভিবাসী সম্প্রদায় ও কর্মস্থলে সামরিক কায়দায় অভিযান চালাচ্ছে, যা বাকস্বাধীনতা ও যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার অধিকার লঙ্ঘন করছে বলে অধিকার রক্ষা সংস্থাগুলো সতর্ক করেছে। এ বছর মিনিয়াপোলিসে অভিযানের সময় বিক্ষোভের ঘটনায় বিক্ষোভকারীরা এজেন্টদের হাতে নিহত হন।
এছাড়া ট্রাম্প প্রশাসন জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব (বার্থরাইট সিটিজেনশিপ) প্রাপ্তির সুযোগ সীমিত করার পদক্ষেপ নিয়েছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে দ্বিতীয় মেয়াদের শুরুতে ট্রাম্প স্বাক্ষরিত একটি নির্বাহী আদেশে বলা হয়, যদি কোনো শিশুর জন্মকালে এক অভিভাবক বেআইনিভাবে যুক্তরাষ্ট্রে থাকেন এবং অন্যজন নাগরিক বা স্থায়ী বাসিন্দা না হন, তবে সেই শিশু জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব পাবে না। এছাড়া পর্যটক, শিক্ষার্থী বা কাজের ভিসায় থাকা সাময়িক বাসিন্দাদের সন্তানদের ক্ষেত্রেও এটি প্রযোজ্য হবে না।
যদিও চলতি বছরের জুলাই মাসে মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট এই আদেশ বাতিল করে দেন, তবে এ মাসেই ট্রাম্প ‘বার্থ ট্যুরিজম’ বন্ধ ও অযোগ্যতার ক্যাটাগরি বাড়িয়ে নতুন নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষর করেন। যার বিরুদ্ধে অধিকার রক্ষা সংস্থাগুলো নিউ হ্যাম্পশায়ার অঙ্গরাজ্যে আইনি চ্যালেঞ্জ দায়ের করেছে।
চলতি মাসের শুরুতে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড, ভিসা লঙ্ঘন, জালিয়াতি ও সহিংস উসকানির মতো অভিযোগে ১৭৫,০০০ এরও বেশি পররাষ্ট্র ভিসা বাতিল করা হয়। এছাড়া ৭৫টি দেশের নাগরিকদের নতুন ভিসা প্রদান স্থগিত করার নীতি বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হলেও গত সপ্তাহে এক ফেডারেল বিচারক এটিকে জাতীয়তার ভিত্তিতে বৈষম্যমূলক উল্লেখ করে বাতিল করেন।
কেন বি-১ ও বি-২ ভিসাকে লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে?
সাধারণত বি-১ বা বি-২ ভিসার আবেদনকারীদের নিশ্চিত করতে হয় যে তারা আশ্রয়ের আবেদন করবেন না এবং দেশে ফেরার প্রমাণ দেখাতে হয়। তবে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের পর অনেকে আশ্রয়ের দাবি করেন।
ডেপুটি সেক্রেটারি অব স্টেট ক্রিস্টোফার ল্যান্ডাউ এ ধরনের প্রবণতার সমালোচনা করে এক্স (টুইটার)-এ লিখেছেন, ভুয়া আশ্রয়ের দাবিতে মানুষ অতিষ্ঠ। ইমিগ্রেশন আইন এড়ানোর ফাঁকফোকর হিসেবে আশ্রয় প্রক্রিয়া ব্যবহার করা উচিত নয়। আগের এক লাখ ৭৫ হাজার ভিসা বাতিলের ঘটনার মতো এটি কোনো অপরাধমূলক কাজের কারণে নয়, বরং নিয়ম সংক্রান্ত কারণে নেওয়া হচ্ছে।
কী প্রভাব পড়বে?
রে জুয়ান কার্লোস ইউনিভার্সিটির গবেষক রুথ বারমেজো কাসাদো উল্লেখ করেন, ভিসা বাতিল হওয়ার অর্থই আশ্রয় আবেদন বাতিল হওয়া নয়।
ভিসা বাতিল হলে তারা সাময়িক দর্শনার্থীর মর্যাদা হারাবেন, তবে তাৎক্ষণিকভাবে তাদের ফেরত পাঠানো যাবে না। আশ্রয় আবেদনের নিস্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত তাদের অবস্থান বহাল থাকবে। তবে আবেদন বাতিল হলে তাদের আর অবস্থান করার কোনো আইনি সুযোগ থাকবে না।
আশ্রয় চাওয়ার অধিকারকে ক্ষুণ্ণ করা হচ্ছে কি না- এ নিয়ে আদালতে প্রশাসনিক ও যথাযথ প্রক্রিয়ার চ্যালেঞ্জ তৈরি হতে পারে। এটি ভবিষ্যতে ভিসা নিয়ে এসে আশ্রয়ের আবেদন করার প্রবণতা কমাবে ও এটি তাৎক্ষণিক বহিষ্কারের চেয়ে রাজনৈতিক বার্তা হিসেবে কাজ করবে।
বারমেজো কাসাদো আরও জানান, এই নীতি বাস্তবায়ন করতে পররাষ্ট্র দপ্তর, হোমল্যান্ড সিকিউরিটি ও ইমিগ্রেশন আদালতের তথ্যের বিশাল মিলন ঘটাতে হবে, যা বড় ধরনের প্রশাসনিক চাপ তৈরি করবে।
কোন দেশের নাগরিকরা বেশি প্রভাবিত হবেন?
পররাষ্ট্র দপ্তর সুনির্দিষ্ট দেশের তথ্য প্রকাশ করেনি। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোর আশ্রয়ের আবেদনের ওপর ভিত্তি করে বারমেজো কাসাদো ধারণা করছেন, ভেনেজুয়েলা, এল সালভাদোর, গুয়াতেমালা, হন্ডুরাস এবং চীন, রাশিয়া, তুরস্ক ও মিসরের নাগরিকরা এতে বেশি প্রভাবিত হতে পারেন। অপরদিকে নথি অনুযায়ী হাইতি, ভারত, কিউবা ও মেক্সিকোর আবেদনগুলো বেশিরভাগ ক্ষেত্রে প্রত্যাখ্যাত হয়েছে।
তবে যেসব দেশের নাগরিকরা ভিসা ছাড়াই সীমান্ত অতিক্রম করে আশ্রয় চেয়েছেন, তাদের ক্ষেত্রে এই ভিসা বাতিলের প্রভাব অপেক্ষাকৃত কম পড়বে।