প্রথমার্ধের খেলা শেষে রেফারি যখন বাঁশি বাজালেন, ফরাসি অধিনায়ক কিলিয়ান এমবাপে আর উসমান দেম্বেলে প্রায় দৌড়েই টানেলের দিকে ছুটলেন। ড্রেসিংরুমে ফেরার এই তাড়া শুধু মাঠ ছাড়ার ছিলো না, ছিলো প্রথমার্ধের চরম হতাশা আর অগোছালো ফুটবল থেকে মুক্তি পাওয়ার। বর্তমান ব্যালন ডি’অর জয়ী এই তারকার জন্য সেনেগালের বিপক্ষে প্রথমার্ধটি ছিলো এক কথায়—বিপর্যয়।
বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচে সেনেগালের বিপক্ষে ফ্রান্সের ৩-১ ব্যবধানের জয়টি স্কোরবোর্ডে যতোটা সহজ দেখাচ্ছে, মাঠের চিত্র ছিলো ঠিক তার উল্টো। প্রথমার্ধের এক ঘণ্টা মনে হচ্ছিলো ২০১৮ সালের চ্যাম্পিয়ন ও ২০২২ সালের রানার্স-আপ দলটির আক্রমণভাগের চার খেলোয়াড় আগে কখনো একে অপরের সঙ্গে খেলেননি, এমনকি হয়তো কেউ কারও নামও জানতেন না! কিন্তু দলটির নাম যখন ফ্রান্স, আর দলে যখন এমবাপের মতো ত্রাতা থাকেন, তখন যেকোনো বিশৃঙ্খলা থেকেই রূপকথা তৈরি হতে পারে।
কোচ দিদিয়ে দেশাম্পসের অতি-রক্ষণাত্মক কৌশলের কারণে প্রথমার্ধে ফরাসি আক্রমণভাগকে সম্পূর্ণ দিশেহারা লেগেছে। মাইকেল ওলিসে ডান প্রান্ত ছেড়ে বলের খোঁজে অন্য প্রান্তে চলে যাচ্ছিলেন, বাম দিকে দেজিরে দুয়ে ছিলেন নিষ্প্রভ। আর এমবাপে ও দেম্বেলের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝির ঘটনাগুলো গ্যালারির দর্শকদের মধ্যে হাসির খোরাক জোগাচ্ছিল। ম্যাচের চতুর্থ মিনিটে আদ্রিয়েন রাবিও-র পাস থেকে এমবাপে সুযোগ পেলেও তা কাজে লাগাতে পারেননি।
উল্টো সুসংগঠিত সেনেগাল একের পর এক আক্রমণ চালিয়ে ফরাসি রক্ষণভাগকে কাঁপিয়ে দেয়। এমবাপে মাঝমাঠে বল হারানোর পর নিকোলাস জ্যাকসনের একটি শট পোস্টে লেগে ফিরে আসে। ফরাসি অধিনায়কের এমন একের পর এক ভুলে প্রেস বক্সে থাকা ফরাসি সাংবাদিকদের তখন হতাশায় মাথা কুটতে দেখা গেছে।
দিদিয়ে দেশাম্পস বলেন, মাঝে মাঝে এমন বাজে শুরু হতেই পারে। বিশ্বকাপে দলগুলোর ওপর প্রত্যাশার যে চাপ থাকে, তা পূরণ করা সবসময় সহজ নয়।
বিরতির পর কৌশল পরিবর্তন করেন দেশাম্পস। ওলিসেকে মাঝখানে এবং দেম্বেলেকে পুরোপুরি ডান প্রান্তে নিয়ে আসায় ম্যাচের তীব্রতা বাড়ে। সেনেগাল গোলরক্ষক এদুয়ার্দ মেন্ডি ওলিসে ও এমবাপের বেশ কয়েকটি শট রুখে দেন। এমনকি এমবাপের ওপর সাদিও মানের একটি নিশ্চিত ফাউল ভিএআর রিভিউতেও এড়িয়ে যান রেফারি আলিরেজা ফাগানি।
তবে ফরাসিদের আটকে রাখা যায়নি। ম্যাচের ৬৪ মিনিটে ওলিসের পাস থেকে এমবাপে সুযোগ হাতছাড়া করলেও, ঠিক দুই মিনিট পর এই জুটিই ডেডলক ভাঙে। ওলিসের নিখুঁত ডায়াগোনাল পাস থেকে মেন্ডিকে পরাস্ত করে বল জালে জড়ান এমবাপে (১-০)। এই গোলের মাধ্যমে অলিভিয়ের জিরুদের ফ্রান্সের হয়ে করা সর্বকালের ৫৭ গোলের ঐতিহাসিক রেকর্ড স্পর্শ করেন তিনি।
৮২তম মিনিটে রাবিও-র পাস থেকে বদলি খেলোয়াড় ব্র্যাডলি বারকোলা দারুণ এক চিপ শটে ব্যবধান দ্বিগুণ করেন (২-০)। ১৮ বছর বয়সী ইব্রাহিম এমবায়ে সেনেগালের হয়ে একটি গোল শোধ করে আফ্রিকান শিবিরে আশা জাগালেও, নিউ জার্সির ৮২ হাজার দর্শকের জন্য শেষ চমকটি বাকি রেখেছিলেন এমবাপেই।
খেলার একেবারে শেষ মুহূর্তে ওলিসের পাস থেকে বল পেয়ে ৩০ গজ দূর থেকে এমবাপে যা করলেন, তা কেবল তার পক্ষেই সম্ভব। কোনো প্রশ্ন বা অনুশোচনা ছাড়াই, সেনেগালের ডিফেন্ডারদের জটলা ভেদ করে নেওয়া তার সেই জাদুকরী শটটি যখন জালে জড়াল, তখন গ্যালারিতে শুধুই ফরাসি উল্লাস। এই পারফরম্যান্সই প্রমাণ করে কেন ফুটবল বিশ্ব এই মহাতারকার ওপর চোখ বুজে ভরসা করে।
এসএন/কে