চলচ্চিত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) জয়জয়কারের মাঝে এক ঐতিহাসিক ও কঠোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ চলচ্চিত্র পুরস্কার ‘অস্কার’। এখন থেকে অভিনয় এবং চিত্রনাট্য রচনার ক্ষেত্রে শুধুমাত্র মানুষের তৈরি কাজকেই পুরস্কারের জন্য বিবেচনা করা হবে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম বিবিসির বরাতে জানা গেছে, অস্কারের আয়োজক সংস্থা ‘একাডেমি অব মোশন পিকচার আর্টস অ্যান্ড সায়েন্সেস’ শুক্রবার এই নতুন নিয়ম ঘোষণা করেছে।
শুক্রবার, ১ মে, অ্যাকাডেমি অফ মোশন পিকচার আর্টস অ্যান্ড সায়েন্সেস-এর বোর্ড অফ গভর্নরস আগামী বছরের ৯৯তম বার্ষিক অনুষ্ঠানের আগে তাদের নিয়মকানুনে একটি নতুন সংযোজনের ঘোষণা দিয়েছে। এই পরিবর্তনগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো, সিনেমার সেরা পুরস্কারগুলোর জন্য শুধুমাত্র মানুষের তৈরি কাজই যেন যোগ্য বলে বিবেচিত হয়, তা নিশ্চিত করা।
অ্যাকাডেমির প্রেস রিলিজ অনুযায়ী, অভিনয় বিভাগে, “শুধুমাত্র সেইসব চরিত্রই যোগ্য বলে বিবেচিত হবে, যেগুলোর নাম সিনেমার আইনি বিলিং-এ উল্লেখ করা থাকবে এবং যা সুস্পষ্টভাবে মানুষের সম্মতিতে তাদের দ্বারা অভিনীত হয়েছে।”
চিত্রনাট্যের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম প্রযোজ্য: “লেখার বিভাগগুলোতে, নিয়ম অনুযায়ী যোগ্য হতে হলে চিত্রনাট্য অবশ্যই মানুষের লেখা হতে হবে।”
একাডেমি স্পষ্ট করে জানিয়েছে, যেসব অভিনয় সরাসরি মানুষের দ্বারা সম্পাদিত এবং যেসব চিত্রনাট্য মানুষের কলম থেকে এসেছে—একমাত্র সেগুলিই অস্কারের দৌড়ে শামিল হতে পারবে। নিয়মাবলীতে এই পরিবর্তনকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে, কারণ এর আগে প্রযুক্তির ব্যবহারের সীমা নিয়ে এত স্পষ্টভাবে কিছু বলা হয়নি। সম্প্রতি মৃত অভিনেতাদের ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে পর্দায় ফিরিয়ে আনা কিংবা এআই দিয়ে কৃত্রিম অভিনেতা ও চিত্রনাট্য তৈরির প্রবণতা বাড়ার প্রেক্ষাপটে এই সিদ্ধান্ত এল।
তবে নতুন এই নিয়মের মানে এই নয় যে চলচ্চিত্রে এআই-এর ব্যবহার পুরোপুরি নিষিদ্ধ। কারিগরি বা ভিজ্যুয়াল ইফেক্টের মতো অন্য ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার থাকলেও তা পুরস্কারের যোগ্যতা নষ্ট করবে না। একাডেমি কেবল সৃজনশীলতার মূল জায়গাগুলো অর্থাৎ অভিনয় ও লেখনীতে মানুষের একচ্ছত্র অধিকার নিশ্চিত করতে চায়। প্রতিটি চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে সৃজনশীলতার কেন্দ্রবিন্দু কতটা মানুষের নিয়ন্ত্রণে ছিল, সেটি এখন থেকে গভীরভাবে যাচাই করা হবে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, চিত্রনাট্য লেখকদের সাম্প্রতিক ধর্মঘট এবং প্রযুক্তির আগ্রাসনের মুখে মানুষের মৌলিক সৃজনশীলতাকে রক্ষা করতেই অস্কার কর্তৃপক্ষ এই পদক্ষেপ নিয়েছে। এর ফলে চলচ্চিত্র শিল্পে প্রযুক্তির ব্যবহার থাকলেও তার মূল প্রাণ হিসেবে মানুষই টিকে থাকবে।
অস্কারের এই কড়াকড়ি বিশ্বজুড়ে অন্যান্য চলচ্চিত্র পুরস্কারের ক্ষেত্রেও নতুন পথ দেখাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
নতুন নিয়ম অনুযায়ী, অভিনয় বিভাগে কেবল সেই চরিত্রই যোগ্য হবে, যা মানুষের সম্মতিতে ও প্রত্যক্ষ অভিনয়ের মাধ্যমে তৈরি এবং সিনেমার ক্রেডিটে স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকবে। একইভাবে চিত্রনাট্য বিভাগেও শর্ত দেওয়া হয়েছে—লেখা অবশ্যই মানুষের হতে হবে।
তবে একাডেমি জানিয়েছে, “জেনারেটিভ এআই” ব্যবহারের বিষয়টি তারা পর্যবেক্ষণে রাখবে এবং প্রয়োজনে নির্মাণ প্রক্রিয়া সম্পর্কে অতিরিক্ত তথ্য চাইতে পারবে।
চলচ্চিত্রে এআই প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়তে থাকায় অস্কারের এই সিদ্ধান্তকে ইন্ডাস্ট্রির জন্য গুরুত্বপূর্ণ নিয়ন্ত্রণমূলক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এসএন/পিডিকে