সোহেলের জবানবন্দিতে রামিসা হত্যার নৃশংস বর্ণনা

শিশু রামিসাকে ধর্ষণের পরে হত্যা মামলায় আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্নার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের আদেশ দিয়েছেন আদালত। আজ সোমবার (১ জুন) ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন এই আদেশ দেন।

এদিন আদালতে এই মামলায় অভিযোগ গঠনের দিন ধার্য ছিল। সকালে কড়া নিরাপত্তায় আসামিকে আদালতে তোলা হয়। এরপর তার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের শুনানি হয়। অভিযোগ গঠনের ফলে এ মামলায় আনুষ্ঠানিক বিচার শুরু হলো। এদিন সোহেল রানা তার স্ত্রীকে নির্দোষ দাবি করেন।

এদিকে আসামিদের পক্ষে আদালতে কোনো আইনজীবী ছিলেন না। রাষ্ট্রীয় খরচে আসামিপক্ষের আইনজীবী হিসেবে ঢাকা বারের সদস্য অ্যাডভোকেট মুসা কালিমুল্যাহকে নিয়োগ দেয় আইন মন্ত্রণালয়। তিনি আদালতে উপস্থিত ছিলেন। তিনি আদালতে আসামিদের অব্যাহতির দাবি করেন।

অ্যাডভোকেট মুসা কালিমুল্যাহ বলেন, এ মামলায় কোনো প্রত্যক্ষদর্শী নেই। ভিকটিমের শরীরে আসামি সোহেলের শুক্রাণু নেই।

এরপরে রাষ্ট্রপক্ষ অভিযোগ গঠনের শুনানি করে বলেন, আসামি ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছে। তার ডিএনএ প্রোফাইল মিলেছে। অভিযোগ গঠনের আদেশ চাচ্ছি। শুনানি শেষে বিচারক অভিযোগ গঠনের আদেশ দেন। এ মামলায় আগামী ২ জুন সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য দিন ধার্য রয়েছে।

এদিন শুনানি শেষে কড়া নিরাপত্তার সোহেলকে কারাগারের উদ্দেশ্যে নিয়ে যাওয়া হয়। এই সময় সোহেল বলেন, তিনি একা নন, বরং ঘটনার পেছনে ‘ডলার’ নামে এক ব্যক্তির ভূমিকা রয়েছে। তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তার কোনোভাবেই জড়িত নন এবং তাকে ভুলভাবে আসামি করা হয়েছে।

সোহেল আরও বলেন, ‘আমি ধর্ষণ করছি, মারছে ডলার। ডলার দুই লাখ টাকা দিছে।’

সোহেল অভিযোগ করে আরও বলেন, ‘ডিএনএ পরীক্ষা সঠিকভাবে না করে অটোমেটিকভাবে লেখা হয়েছে।’

ডলারের পরিচয় সাংবাদিকরা জানতে চাইলে সোহেল রানা বলেন, ‘মিরপুর ১১ নম্বর এলাকার অনেক টাকাওয়ালা একজন ব্যক্তি। সে-ই রামিসাকে হত্যা করেছে। মেইন আসামি সে-তাকে ধরেন।’

এদিকে সোহেল আদালতে ডলার নামের এক আসামির নাম তোলায় মামলায় নতুন চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে। সোহেলের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে ডলারের বিষয়ে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায় নি। এমনকি পুলিশ অভিযোগপত্রে ডলারের কোনো নাম বা তথ্য আনেনি।

এর আগে গত ২৪ মে মামলার আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্নার বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করে পুলিশ। এরপরে সিএমএম আদালত অভিযোগপত্র গ্রহণ করে মামলাটি বিচারের জন্য ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালে বদলির আদেশ দেন।

পুলিশের দেওয়া অভিযোগপত্রে সোহেলের স্বীকারোক্তির বিষয়ে উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগপত্রে আসামি সোহেলের বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও হত্যার অভিযোগ এবং তার স্ত্রী স্বপ্নার বিরুদ্ধে হত্যায় সহযোগিতার অভিযোগ আনা হয়েছে। অভিযোগপত্রে ১৫ জনকে সাক্ষী করা হয়েছে।

সোহেল স্বীকারোক্তিতে বলেন, সাবলেটের অন্য সদস্যরা প্রতিদিন কাজে বেরিয়ে যাওয়ার পর তিনি নিয়মিত মাদক সেবন করতেন। ঘটনার দিন ১৯ মে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে পাশের বাসার শিশু রামিসাকে দেখতে পেয়ে তিনি তাকে নিজের কক্ষে ডেকে নেন। পরে শিশুটিকে বাথরুমে নিয়ে যান। সেখানে রামিসা চিৎকার শুরু করলে তিনি তার মুখ চেপে ধরেন এবং মুখে কাপড় গুঁজে দেন। এরপর তাকে ধর্ষণ করেন । একপর্যায়ে শিশুটি জ্ঞান হারিয়ে ফেললে তিনি তাকে মৃত মনে করেন। পরে অপরাধের আলামত নষ্ট করার উদ্দেশ্যে একটি ধারালো অস্ত্র ব্যবহার করে মরদেহ বিকৃত করার চেষ্টা করেন।

জবানবন্দিতে আরও বলেন, সকাল সাড়ে ১০টার দিকে এলাকার লোকজন ও পরিবারের সদস্যরা রামিসাকে খুঁজতে শুরু করেন। একপর্যায়ে শিশুটির মা তার কক্ষের সামনে রামিসার জুতো দেখতে পান এবং তাকে ডাকাডাকি শুরু করেন। কোনো সাড়া না পেয়ে আশপাশের লোকজন তার কক্ষের দরজায় ধাক্কা দিতে থাকেন। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তার তাকে পালিয়ে যেতে বলেন। এরপর তিনি একটি রেঞ্জ (যন্ত্রপাতি) ব্যবহার করে জানালার গ্রিল ভেঙে ফেলেন। জবানবন্দিদে তিনি বলেন, বাইরে লোকজন যখন দরজায় ক্রমাগত ধাক্কা দিচ্ছিল, তখন তার স্ত্রী দরজা আটকে রেখে তাকে পালিয়ে যেতে সহায়তা করেন। সোহেল পালিয়ে যাওয়ার পর স্বপ্না দরজা খুলে দেন।

মামলার এজাহার থেকে জানা গেছে, রামিসা পপুলার মডেল হাই স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী ছিল। গত মঙ্গলবার (১৯ মে) সকাল সাড়ে ৯টার দিকে ঘর থেকে বের হলে স্বপ্না তাকে কৌশলে নিজেদের ফ্ল্যাটের ভেতরে নেয়। ওইদিন সকাল সাড়ে ১০টার দিকে রামিসাকে স্কুলে যাওয়ার জন্য খোঁজাখুঁজি করতে থাকেন তার মা। একপর্যায়ে আসামির ফ্ল্যাটের সামনে শিশুটির জুতা দেখতে পান তিনি। ডাকাডাকির পর কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে রামিসার বাবা-মা এবং অন্যান্য ফ্ল্যাটের লোকজন দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে আসামির শয়নকক্ষের মেঝেতে রামিসার মস্তকবিহীন মরদেহ এবং রুমের ভেতরে একটি বড় বালতির মধ্যে তার মাথা দেখতে পান। জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ এর মাধ্যমে কল পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে স্বপ্নাকে হেফাজতে নেয়। তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় নারায়ণগঞ্জ জেলার ফতুল্লা থানার সামনে থেকে সোহেল রানাকে গ্রেপ্তারে সক্ষম হয় পুলিশ।

এ ঘটনায় পরের দিন বুধবার ভুক্তভোগীর বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা বাদী হয়ে পল্লবী থানায় মামলা করেন। আসামি সোহেল রানা ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেয়। মাদক সেবন করে বিকৃত যৌনকর্মে লিপ্ত হওয়া এই আসামি আদালতকে জানায়, ভুক্তভোগীর পরিবারের সঙ্গে তার পূর্ব শত্রুতা ছিল না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *