শরীফুলকে নিয়ে স্বস্তি, বদলাবে বাংলাদেশের পেস পরিকল্পনা?

অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে বাংলাদেশের দুই টেস্টের সিরিজ শুরু হওয়ার আগে পেস আক্রমণে ধাক্কা এসেছিল শরীফুল ইসলামকে নিয়ে। হ্যামস্ট্রিংয়ের চোটে প্রথম টেস্টের দল থেকে ছিটকে গিয়েছিলেন বাঁহাতি এই পেসার। তার ওপর নাহিদ রানার চোটও বাংলাদেশের বোলিং পরিকল্পনাকে আরও কঠিন করে তুলেছিল।

কিন্তু শরীফুলকে ঘিরে এখন গল্পটা ধীরে ধীরে বদলাচ্ছে। চোট থেকে ফেরার প্রক্রিয়ায় প্রত্যাশার চেয়ে দ্রুত উন্নতি করছেন তিনি। ২৯ জুলাই থেকে নিয়মিত বোলিং শুরু করেছেন। ধাপে ধাপে বাড়ানো হচ্ছে ওয়ার্কলোড। বোলিংয়ের ইনটেনসিটিও এখন শতভাগ। কোনো শারীরিক সমস্যা দেখা দিচ্ছে না। ফলে প্রথম টেস্টে না হলেও দ্বিতীয় টেস্টে শরীফুলকে পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে। শরীফুলের জন্য এখন মূল পরীক্ষা শুধুই ‘ফিটনেস টেস্ট’ নয়। বরং টেস্ট ম্যাচের চাপ নেওয়ার মতো বোলিং ওয়ার্কলোড তিনি সামলাতে পারছেন কি না, সেটিই হয়ে উঠেছে আসল প্রশ্ন।

এই জায়গাটিই বাংলাদেশের জন্য স্বস্তির, আবার সতর্কতারও। বিসিবির ফিজিও মুজাদ্দেদ আলফা সানির বক্তব্য অনুযায়ী, চাইলে শরীফুল এখনই সাধারণ ফিটনেস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারেন। কিন্তু শুধু ফিটনেস পরীক্ষায় পাস করলেই একজন পেসারকে পাঁচ দিনের টেস্ট ম্যাচে নামিয়ে দেওয়া যায় না। বিশেষ করে অস্ট্রেলিয়ার মতো প্রতিপক্ষের বিপক্ষে, যেখানে একজন পেসারকে দীর্ঘ স্পেলে বারবার সর্বোচ্চ বা তার কাছাকাছি গতিতে বোলিং করতে হতে পারে।

সেখানেই ‘ওয়ার্কলোড’ শব্দটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। একজন পেসারের চোট থেকে ফেরার ক্ষেত্রে শরীরের ব্যথা চলে যাওয়া বা দৌড়াতে পারার সক্ষমতা ফিরে পাওয়া একটি ধাপ মাত্র। ম্যাচের জন্য প্রস্তুত হওয়ার শেষ ধাপ হলো বোলিংয়ের পরিমাণ ও তীব্রতা ধীরে ধীরে সেই পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া, যেখানে ম্যাচের বাস্তব চাপ সামলানো সম্ভব। শরীফুল এখন সেই জায়গাতেই পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই তার বোলিং ওয়ার্কলোড সর্বোচ্চ সীমায় পৌঁছানোর কথা। জাতীয় দলের ফিজিওর তৈরি করা পরিকল্পনা অনুযায়ী ১০ থেকে ১২ আগস্টের মধ্যে তিনি টেস্ট খেলার উপযোগী বোলিংয়ের পরিমাণে পৌঁছাতে পারেন। সে কারণেই পূর্বনির্ধারিত ফিটনেস পরীক্ষাও এগিয়ে আনার চিন্তা করছে বিসিবি।

এখানে সময়ের হিসাবটি বেশ গুরুত্বপূর্ণ। ডারউইনে প্রথম টেস্ট শুরু ১৩ আগস্ট। পরীক্ষার পর প্রথম টেস্টে খেলার সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য হাতে সময় খুব কম। আর দ্বিতীয় টেস্ট শুরু ২২ আগস্ট ম্যাকেতে। ফলে শরীফুলের জন্য দ্বিতীয় টেস্টের আগে প্রায় এক সপ্তাহের বেশি সময় পাওয়া যাবে।

এই ব্যবধানই হয়তো তার প্রত্যাবর্তনের সবচেয়ে বড় সুযোগ। প্রথম টেস্টে খেলতে হলে শরীফুলকে প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই সর্বোচ্চ প্রস্তুতির জায়গায় যেতে হতো। চোট থেকে ফিরে আসা একজন পেসারের ক্ষেত্রে সেটি অপ্রয়োজনীয় ঝুঁকি তৈরি করতে পারত। কিন্তু দ্বিতীয় টেস্টকে লক্ষ্য করলে পুনর্বাসনের শেষ ধাপটি আরও নিয়ন্ত্রিতভাবে শেষ করার সুযোগ থাকছে।

বাংলাদেশের জন্যও এটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ পেস আক্রমণে শরীফুলের ভূমিকা শুধু আরেকজন বোলার হিসেবে নয়। বাঁহাতি পেসারের উপস্থিতি প্রতিপক্ষের ব্যাটিং পরিকল্পনায় ভিন্ন মাত্রা যোগ করে। বিশেষ করে অস্ট্রেলিয়ার কন্ডিশনে বাঁহাতি পেসারের অ্যাঙ্গেল ও বলের মুভমেন্ট বাংলাদেশের বোলিং আক্রমণে বৈচিত্র্য তৈরি করতে পারে।

তবে সেই সুবিধা পেতে গিয়ে শরীফুলকে দ্রুত ফিরিয়ে আনার ঝুঁকি নেওয়ার কোনো কারণ নেই। চোট থেকে ফেরা পেসারের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বিপদ হলো-শরীর ম্যাচের চাপ নেওয়ার আগেই তাকে ম্যাচে নামিয়ে দেওয়া। অনুশীলনে শতভাগ ইনটেনসিটিতে বোলিং করা এবং টেস্ট ম্যাচে দীর্ঘ সময় বোলিং করা এক জিনিস নয়। ম্যাচে শুধু বল করার চাপ নয়, ফিল্ডিং, দৌড়, বারবার বোলিং মার্কে ফিরে যাওয়া এবং টানা কয়েক দিন শারীরিক চাপ সামলানোর বিষয়ও থাকে।

তাই বিসিবির ফিজিও যে ‘ওয়ার্কলোড’কে এত গুরুত্ব দিচ্ছেন, সেটিই আসলে আধুনিক ক্রিকেটে চোট ব্যবস্থাপনার মূল দর্শনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।শরীফুলের বর্তমান অগ্রগতি অবশ্য আশাব্যঞ্জক। বোলিংয়ে কোনো সমস্যা হচ্ছে না এবং ইনটেনসিটিও শতভাগ-এই তথ্য বাংলাদেশ দলের জন্য বড় স্বস্তি। কারণ এর অর্থ, পুনর্বাসনের গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়গুলো তিনি ভালোভাবেই পার করছেন।

কিন্তু এখানে আরেকটি বিষয় বিবেচনায় রাখতে হবে-সময়! ১৩ আগস্ট প্রথম টেস্ট। ২২ আগস্ট দ্বিতীয় টেস্ট। এই দুই ম্যাচের ব্যবধান খুব বেশি নয়। ফলে শরীফুলকে যদি দ্বিতীয় টেস্টে খেলানো হয়, তাহলে শুধু ম্যাচের দিন পর্যন্ত ফিট থাকা যথেষ্ট হবে না; তাকে এমন পর্যায়ে থাকতে হবে, যাতে ম্যাচ শেষে আবারও চোটের ঝুঁকি না বাড়ে।

এসএন/পিডিকে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *