একটি ফুটবলের দাম কত হতে পারে? বাজারে থাকা একটি সাধারণ ফুটবলের দাম দিয়ে হয়তো প্রশ্নটির উত্তর দেওয়া যায়। কিন্তু সেটি যদি হয় ডিয়েগো ম্যারাডোনার ইতিহাস গড়া একটি ম্যাচের বল, তাহলে হিসাবটা বদলে যায়। এতটাই বদলে যায় যে, সেই বলের দাম উঠতে পারে ১ কোটি ডলার-বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১২৩ কোটি টাকা!
এই বিপুল অঙ্কের সম্ভাবনাই এখন আলোচনায় ম্যারাডোনার সেই বিখ্যাত বলকে ঘিরে। যে বল দিয়ে ১৯৮৬ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে মাত্র চার মিনিটের ব্যবধানে দুটি গোল করেছিলেন আর্জেন্টাইন কিংবদন্তি। একটি গোল ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বিতর্কিতগুলোর একটি, অন্যটি সম্ভবত সবচেয়ে প্রশংসিত।
যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে আগামী ২১ থেকে ২৩ আগস্ট হেরিটেজ অকশনসের নিলামে উঠবে বলটি। এর ভিত্তিমূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ২৫ লাখ ডলার, অর্থাৎ প্রায় ৩০ কোটি ৯৪ লাখ টাকা। কিন্তু নিলামকারী প্রতিষ্ঠানের আশা, শেষ পর্যন্ত দাম পৌঁছাতে পারে অন্তত ১ কোটি ডলারে।
মানে, প্রায় ৩১ কোটি টাকা দিয়ে নিলাম শুরু হলেও সেটি শেষ হতে পারে ১২৩ কোটি টাকায়। ব্যবধানটা প্রায় ৯২ কোটি টাকা।
এই বিপুল মূল্য কেবল একটি বলের নয়, বরং ফুটবলের ইতিহাসের এক অবিশ্বাস্য অধ্যায়ের।
১৯৮৬ সালের ২২ জুন মেক্সিকো সিটির আজতেকা স্টেডিয়ামে আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ডের কোয়ার্টার ফাইনাল। ম্যাচের ৫১ মিনিটে ম্যারাডোনা এমন এক গোল করলেন, যেটি দেখার পর মাঠে থাকা অনেকেই বুঝতেই পারেননি কীভাবে বল জালে গেল। পরে রিপ্লেতে পরিষ্কার হয়, মাথা দিয়ে নয়, হাত দিয়ে বল স্পর্শ করেছিলেন ম্যারাডোনা।
রেফারি গোলটি বৈধ ঘোষণা করলেন। আর জন্ম নিল ‘হ্যান্ড অব গড’। ম্যারাডোনা বলেছিলেন, ‘ম্যারাডোনার মাথার কিছুটা এবং কিছুটা ঈশ্বরের হাতে’ গোলটি হয়েছিল।
কিন্তু গল্পটা সেখানেই শেষ হয়নি। চার মিনিট পর একই বল আবার ম্যারাডোনার পায়ে। এবার কোনো হাতের কারসাজি নেই, কোনো বিতর্ক নেই। নিজেদের অর্ধ থেকে বল নিয়ে ছুটলেন তিনি। সামনে একের পর এক ইংলিশ ডিফেন্ডার। চারজনকে কাটিয়ে, টেরি বুচারকে দুবার এড়িয়ে, শেষ পর্যন্ত গোলকিপার পিটার শিলটনকেও পরাস্ত করলেন।
প্রায় ৬০ গজ দূর থেকে শুরু হওয়া সেই দৌড় শেষ হলো গোলের মাধ্যমে। পরে গোলটি পরিচিতি পেল ‘শতাব্দীর সেরা গোল’ হিসেবে।
অর্থাৎ যে বলটি নিলামে উঠছে, সেটি শুধু একটি বিতর্কিত গোলের স্মারক নয়। একই সঙ্গে সেটি ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে নান্দনিক গোলগুলোর একটিরও সাক্ষী।
এ কারণেই বলটির সম্ভাব্য দাম ১২৩ কোটি টাকা পর্যন্ত যাওয়ার আলোচনা এতটা তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ এর মূল্য নির্ধারিত হচ্ছে চামড়া, নির্মাণমান কিংবা ব্যবহারের বয়স দিয়ে নয়; নির্ধারিত হচ্ছে ইতিহাসে তার অবস্থান দিয়ে।
ম্যারাডোনার স্মারকের বাজারে এমন মূল্য আগে দেখা গেছে। ১৯৮৬ বিশ্বকাপের ওই ম্যাচে পরা তার জার্সি নিলামে বিক্রি হয়েছিল ৯৩ লাখ ডলারে। বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১১৫ কোটি টাকা। সেটিই ফুটবলে সবচেয়ে বেশি দামে বিক্রি হওয়া জার্সির রেকর্ড।
এবার সেই ১১৫ কোটি টাকার কাছাকাছি চলে আসতে পারে একটি ফুটবল। বরং নিলামকারীদের প্রত্যাশা অনুযায়ী দাম ১ কোটি ডলারে পৌঁছালে জার্সির সেই মূল্যকেও ছাড়িয়ে যাবে বলটি।
হেরিটেজ অকশনসের ক্রীড়া বিভাগের সহসভাপতি ড্যান ইমলার তাই বলটিকে সাধারণ কোনো স্মারক হিসেবে দেখছেন না। এএফপিকে তিনি বলেছেন, ‘আমার মনে হয় এটি ফুটবল বিশ্বের ইতিহাসে সবচেয়ে স্মরণীয় বল।’
কেন স্মরণীয়, তার উত্তর খুঁজতে খুব বেশি দূর যেতে হয় না। এই একটি বলের সঙ্গে জড়িয়ে আছে আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ডের ঐতিহাসিক দ্বৈরথ, ম্যারাডোনার বিতর্কিত হাত, তার অবিশ্বাস্য দৌড়, বিশ্বকাপের নকআউট ম্যাচ এবং শেষ পর্যন্ত আর্জেন্টিনার ২-১ গোলের জয়।
সেই বিশ্বকাপ শেষ পর্যন্ত আর্জেন্টিনাই জিতেছিল। ম্যারাডোনা হয়ে উঠেছিলেন টুর্নামেন্টের প্রাণকেন্দ্র। আর ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ওই ৯০ মিনিট তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে স্মরণীয় অধ্যায়গুলোর একটি হয়ে থাকে। এখন সেই অধ্যায়ের একটি অংশের দাম নির্ধারণ করবে নিলামের বাজার!
এসএন/পিডিকে