রোহিঙ্গা সংকট রাজনৈতিকভাবে সমাধান করতে হবে : শামা ওবায়েদ

রোহিঙ্গা সংকট একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল রাজনৈতিক সমস্যা এবং এটি রাজনৈতিকভাবেই সমাধান করতে হবে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম। তিনি বলেন, ‘ব্যাপারটা একেবারেই একটা পলিটিক্যাল প্রবলেম, এটা খুবই সংবেদনশীল একটা ব্যাপার এবং এই সমস্যাটা আমাদের পলিটিক্যালি সমাধান করার প্রয়োজন।’

আজ মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে শামা ওবায়েদ এসব কথা বলেন।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, গত ১০ বছরে রোহিঙ্গা সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে। বাংলাদেশ সরকার এ সমস্যা সমাধানে মিয়ানমারের বর্তমান সরকার, রাখাইন রাজ্য ও আরাকান আর্মিসহ সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগ এবং সংলাপ চালিয়ে যাচ্ছে।

শামা ওবায়েদ বলেন, ২০১৭ সালে রোহিঙ্গা সংকট শুরুর পর তৎকালীন সরকারের সমাধানে কোনো বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখতে পারেনি। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে যথাযথভাবে যুক্ত করতে পারলে হয়তো চার-পাঁচ বছরের মধ্যে সংকট সমাধানের দিকে যাওয়া যেত, কিন্তু তা হয়নি। ফলে বর্তমানে সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, মিয়ানমারে সম্প্রতি নির্বাচন হয়ে নতুন সরকার এসেছে। এর পাশাপাশি রাখাইন রাজ্যে আরাকান আর্মিসহ বিভিন্ন পক্ষ সক্রিয় রয়েছে। সব মিলিয়ে দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি এখন অনেক বেশি জটিল।

শামা ওবায়েদ বলেন, ‘আমাদের বর্ডারে অনেক সমস্যা হচ্ছে, সিকিউরিটি প্রবলেম হচ্ছে, বিভিন্ন ধরনের ক্রাইমের কথা শোনা যাচ্ছে—মানব পাচার, ড্রাগ ট্রাফিকিং এসব হচ্ছে।’

রোহিঙ্গার সংখ্যা ১৩ লাখের বেশি

বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের প্রকৃত সংখ্যা এখন সঠিকভাবে বলা কঠিন উল্লেখ করে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেন, প্রতিদিন কম-বেশি মানুষ আসছে এবং মিয়ানমারের শিবিরগুলোতে বছরে গড়ে প্রায় ৩০ হাজার শিশু জন্মগ্রহণ করছে।

‘তো সেই ক্ষেত্রে আমরা সংখ্যাটাও ঠিকমতো এখন জানি না, কিন্তু ডেফিনেটলি ১ দশমিক ৩ মিলিয়নের (১৩ লাখ) ওপর হবে’, বলেন শামা ওবায়েদ।

প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেন, রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে বাংলাদেশ সরকার রাখাইন রাজ্য, আরাকান ও মিয়ানমারের বর্তমান সরকারের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিকভাবে যোগাযোগ এবং সংলাপ চালিয়ে যাচ্ছে।

রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আরও বেশি সম্পৃক্ত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। তিনি আরও বলেন, মুসলিম বিশ্বের পক্ষ থেকেও মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টি করা যায় কি না, সেই বিষয়েও বাংলাদেশ কাজ করছে।

শামা ওবায়েদ বলেন, আগামী সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (ইউএনজি) প্রেসিডেন্সি সেশনে রোহিঙ্গাদের নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ উচ্চপর্যায়ের অধিবেশন অনুষ্ঠিত হবে। এতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান উপস্থিত থাকবেন। ওই অধিবেশন থেকে সংকট সমাধানে আরও কিছু দিকনির্দেশনা পাওয়া যাবে বলে আশা করছে বাংলাদেশ।

এমওইউ থেকে বেরিয়ে এসে লাভ নেই

২০১৭ সালে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে প্রত্যাবাসন নিয়ে সই হওয়া সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) পর্যালোচনা বা তা থেকে বেরিয়ে আসার সম্ভাবনা নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেন, এমওইউ থেকে বেরিয়ে আসলে খুব একটা লাভ হবে বলে তিনি মনে করেন না।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘এমওইউ তো একটা হয়েছে। এটা থেকে বের হয়ে আসলে যে খুব একটা লাভ হবে, আমি ব্যক্তিগতভাবে সেটা মনে করি না।’

জাতিসংঘসহ অন্যান্য সংশ্লিষ্ট অংশীজনকে আরও বেশি সম্পৃক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশের জন্য একটি ‘অ্যাডেড বেনিফিট’ বা অতিরিক্ত সুবিধা তৈরি হয়েছে। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হওয়ায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের পক্ষে কথা বলার ক্ষেত্রে একটি বাড়তি সুযোগ তৈরি হয়েছে।

শামা ওবায়েদ বলেন, ‘সেই জায়গাটা থেকে আমরা মনে করি যে অ্যাট লিস্ট (অন্ততপক্ষে) আগামী এক বছর আমরা এই সক্ষমতাটাকে একটু ভালোমত ব্যবহার করতে পারব।’

চীনসহ সব অংশীজনকে আরও গুরুত্ব দিয়ে কথা বলছে বাংলাদেশ

রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে চীন-বাংলাদেশ-মিয়ানমার ত্রিপক্ষীয় উদ্যোগ এবং চীনের প্রস্তাবিত করিডর এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেন, আগের সরকারের সময় ত্রিপক্ষীয় উদ্যোগে বাংলাদেশ কাঙ্ক্ষিতভাবে এগোতে পারেনি।

প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেন, তৎকালীন সরকার রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে যথেষ্ট সচেষ্ট ছিল না। জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার না হওয়ায় চীনের ওপর প্রয়োজনীয় চাপ সৃষ্টির সক্ষমতাও তাদের ছিল না।

তবে বর্তমান সরকারের পররাষ্ট্রনীতিতে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে উল্লেখ করে শামা ওবায়েদ বলেন, প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত জোরালোভাবে সব দেশের সঙ্গে সমঅধিকার ও সম্মানের ভিত্তিতে বাংলাদেশের স্বার্থ বজায় রেখে কথা বলছেন।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত জোরালোভাবে সবার সঙ্গে সম-অধিকার নিয়ে এবং সম্মানের সঙ্গে নিজেদের স্বার্থ বজায় রেখে যখন কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে মেরুদণ্ড সোজা করে কথা বলছেন, তখন চীনসহ অন্যান্য সকল স্টেকহোল্ডার (অংশীদার) আরও মনোযোগের সঙ্গে, আরও সিরিয়াসলি আমাদের কথাগুলো শুনছে।’

বর্তমান প্রেক্ষাপট আগের চেয়ে ভিন্ন জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেন, বাংলাদেশে এখন একটি নির্বাচিত সরকার এসেছে। এ কারণে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নেগোসিয়েশনের (দর-কষাকষি) ক্ষেত্রে দেশের অবস্থান আরও শক্ত হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *