মেসি যখন উড়ছেন, থেমে যাচ্ছেন রোনালদো?

বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে আলোচিত দুই নামের একজন আলো ছড়াচ্ছেন, অন্যজন প্রশ্নের মুখে! লিওনেল মেসি যখন হ্যাটট্রিক করে বিশ্বকাপ মাতাচ্ছেন, তখন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোকে ঘিরে উঠছে অস্বস্তিকর এক প্রশ্ন-মহাতারকার সময় কি সত্যিই ফুরিয়ে আসছে?

বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার আগে পর্তুগালকে ঘিরে ছিল অনেক স্বপ্ন। ইউরোপের অন্যতম শক্তিশালী দল, দলে তারকার ছড়াছড়ি, বেঞ্চেও মানসম্পন্ন ফুটবলার। সেই দলের নেতৃত্বে ছিলেন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো, যার নামই একসময় প্রতিপক্ষের জন্য আতঙ্ক হয়ে উঠত। কিন্তু ডিআর কঙ্গোর বিপক্ষে প্রথম ম্যাচ শেষে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পর্তুগালের ১-১ গোলে ড্র নয়, বরং রোনালদোর নিস্তেজ উপস্থিতি!

টেক্সাসে অনুষ্ঠিত ম্যাচটিতে শুরুটা অবশ্য স্বপ্নের মতোই হয়েছিল পর্তুগালের। মাত্র ছয় মিনিটে জোয়াও নেভেসের গোলে এগিয়ে যায় রবার্তো মার্তিনেসের দল। মনে হচ্ছিল, ফেবারিটদের জন্য এটি হতে যাচ্ছে সহজ এক সন্ধ্যা। কিন্তু প্রথমার্ধের অতিরিক্ত সময়ে ইয়োয়ান উইসার গোলে সমতায় ফেরে ডিআর কঙ্গো। এরপর যত সময় গড়িয়েছে, ততই বাড়তে থাকে পর্তুগালের অস্থিরতা।

ম্যাচে পুরো ৯০ মিনিট মাঠে ছিলেন রোনালদো। কিন্তু ম্যাচ শেষে পরিসংখ্যানের পাতায় তাঁর উপস্থিতি ছিল প্রায় অদৃশ্য। সুযোগ পেয়েও গোল করতে পারেননি, আক্রমণে কাঙ্ক্ষিত প্রভাব রাখতে পারেননি, এমনকি ম্যাচের অনেক সময় তাঁকে যেন খুঁজেই পাওয়া যাচ্ছিল না। একসময় যিনি একা হাতে ম্যাচের গতিপথ বদলে দিতেন, সেই রোনালদোকে এবার অনেকটাই বিচ্ছিন্ন মনে হয়েছে। আর এখানেই সামনে চলে এসেছে আরেকটি কঠিন বাস্তবতা-গোলখরা!

বড় আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে পর্তুগালের হয়ে রোনালদোর শেষ গোলটি এসেছে প্রায় চার বছর আগে। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে ঘানার বিপক্ষে পেনাল্টি থেকে করা সেই গোলের পর বিশ্বকাপ ও ইউরো মিলিয়ে টানা ১০ ম্যাচে গোলশূন্য তিনি। উরুগুয়ে, দক্ষিণ কোরিয়া, সুইজারল্যান্ড, মরক্কো, চেক প্রজাতন্ত্র, তুরস্ক, জর্জিয়া, স্লোভেনিয়া, ফ্রান্স এবং সর্বশেষ ডিআর কঙ্গো-কেউই তাঁর দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটাতে পারেনি।

পরিসংখ্যানটি আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে কারণ এটি রোনালদোর ক্যারিয়ারের সঙ্গে যায় না। প্রায় দুই দশক ধরে ফুটবলের সর্বোচ্চ পর্যায়ে ধারাবাহিকতা ধরে রাখা এই তারকা বড় মঞ্চে গোল করেই নিজের পরিচয় গড়েছেন। ইউরো, বিশ্বকাপ, চ্যাম্পিয়ন্স লিগ-যেখানেই চাপ, সেখানেই রোনালদো। কিন্তু এখন সেই পরিচিত ছবিটি যেন বদলে যাচ্ছে।

বয়সও আলোচনায় চলে এসেছে স্বাভাবিকভাবেই। চার দশকের গণ্ডি পেরিয়ে যাওয়া রোনালদো এখনও ফিটনেসে অনেক তরুণকে টেক্কা দিতে পারেন। কিন্তু আন্তর্জাতিক ফুটবলের গতি, ছন্দ ও কৌশলগত চাহিদা আগের চেয়ে অনেক বেশি কঠিন। ফলে প্রশ্ন উঠছে, পর্তুগালের আক্রমণভাগ কি এখনও তাঁর চারপাশে গড়ে তোলা উচিত, নাকি সময় এসেছে নতুন কাউকে কেন্দ্র করে পরিকল্পনা সাজানোর?

এই বিতর্ককে আরও জোরালো করছে পর্তুগালের বর্তমান স্কোয়াড। ব্রুনো ফের্নান্দেস, বের্নার্দো সিলভা, রুবেন দিয়াস, রুবেন নেভেস, রাফায়েল লেয়াও-ইউরোপিয়ান ফুটবলের অন্যতম সেরা কয়েকজন খেলোয়াড় রয়েছেন দলে। কাগজে-কলমে বিশ্বকাপ জয়ের মতো সামর্থ্যও আছে। কিন্তু প্রথম ম্যাচেই তুলনামূলক দুর্বল ডিআর কঙ্গোর বিপক্ষে পয়েন্ট হারানো দলটির আত্মবিশ্বাসে ধাক্কা দিয়েছে।

বিশেষ করে ৫২ বছর পর বিশ্বকাপের মঞ্চে ফেরা কঙ্গোর বিপক্ষে জয় না পাওয়াকে অনেকেই পর্তুগালের জন্য ব্যর্থতা হিসেবেই দেখছেন। কারণ এই ম্যাচে পূর্ণ তিন পয়েন্ট পাওয়ার ব্যাপারে পর্তুগিজ সমর্থকদের প্রায় কোনো সন্দেহই ছিল না। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন গল্প লিখেছে।

তবু রোনালদো এখনও হাল ছাড়ার মানুষ নন। সমালোচনার ঝড়ের মাঝেও তিনি সতীর্থদের উদ্দেশে আশাবাদের বার্তা দিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি লিখেছেন, ‘এটা মোটেও সেই শুরু নয়, যা আমরা চেয়েছিলাম। তবে সবকিছু এখনো শেষ হয়ে যায়নি। মাথা উঁচু রেখেই পরের ম্যাচে পুরো মনোযোগ দিতে হবে।’

এই বার্তায় যেমন হতাশার ছাপ আছে, তেমনি আছে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকারও। কারণ রোনালদোর ক্যারিয়ারই গড়ে উঠেছে প্রতিকূলতাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে।!

ম্যাচ শেষে যখন খেলোয়াড়দের নিবেদন নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, তখনও রক্ষণাত্মক অবস্থান নেননি তিনি। বরং সরাসরি জবাব দিয়েছেন, ‘কিসের কমতি?’ কোনো কিছুরই কমতি ছিল না আমাদের। ফুটবল এমনই। আমরা জিততেও পারত, আবার হারতেও পারত। ম্যাচটা যে কোনো দিকেই যেতে পারত।’

তার এই কথার মধ্যে আত্মবিশ্বাস যেমন আছে, তেমনি বাস্তবতার স্বীকৃতিও রয়েছে। কিন্তু ফুটবল বিশ্ব এখন আর শুধু বক্তব্য শুনতে চায় না। তারা দেখতে চায় গোল, দেখতে চায় ম্যাচজয়ী মুহূর্ত, দেখতে চায় সেই পুরোনো রোনালদোকে।

বিশ্বকাপ এখনও অনেক বাকি। একটি ম্যাচ দিয়েই কোনো কিংবদন্তির গল্পের শেষ লেখা যায় না। তবে এটাও সত্য, সময় কারও জন্য অপেক্ষা করে না। আর তাই পর্তুগালের পরবর্তী ম্যাচগুলো শুধু দলের জন্য নয়, রোনালদোর জন্যও হয়ে উঠেছে এক ধরনের পরীক্ষা!

এসএন/কে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *